দেশের বন্যপ্রাণীর অবৈধ ব্যবসা দিন দিন বড় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পাচারকারীচক্রের কাছে বন্যপ্রাণীর অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
দেশের বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া বন্যপ্রাণীদের একটি বড়অংশের উৎস সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা। পাচার হওয়া বন্যপ্রাণীদের তালিকায় রয়েছে বাঘ, কুমির, হরিণ, সাপ, তক্ষক, কচ্ছপ, ও হাঙ্গর। চীন ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চাহিদা রয়েছে। ফলে চোরা চালানকারীদের বেশ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া এ সুন্দরবন থেকে বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বন্যপ্রাণী পাচারের ঝুঁকি বাড়ছে।
১৯৬০ সাল থেকে এ পর্যন্ত অবৈধভাবে সুন্দরবনে প্রায় ২০০টি বাঘ হত্যার খবর রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতসংখ্যা এ সংখ্যা আরও বেশি বলে বনজীবীদের অভিমত। এ সময় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসহ প্রায় শতাধিত বাঘের চামড়া আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয়। কিন্তু এর গডফাদাররা কখনও ধরা পড়েনি। বনবিভাগের কাছেও এ ব্যাপারে কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। বাঘের বিপন্নতা নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে বিশ্বজুড়ে ২৯ জুলাই বাঘ দিবস পালন করা হয়।
বাংলাদেশের বাঘ সংরক্ষণে যারা কাজ করছেন তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে বাংলাদেশে বাঘের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক আবাসস্থল সুন্দরবন নিজেই এখন হুমকিতে। পোচিং অর্থাৎ অবৈধ শিকারের কারণে বাংলাদেশের বাঘ এখনও বড় ধরনের ঝুঁকিতে। দীর্ঘদিন ধরে চোরাশিকারিরা শিকার করে চামড়া, হাড়সহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার করে আসছে। এখনো পর্যন্ত বাঘ সংরক্ষণের মূল চ্যালেঞ্জই বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার রোধ।
সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাঘের চামড়া, হাড়, দাঁতসহ অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সে কারণে চোরাশিকারিরা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের বাঘ শিকার করছে। বনদস্যুরাও এখন সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীও শিকার করছে। সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রকৃতি বাঘের টিকে থাকার জন্য খুবই কঠিন।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল বলেন, এখনও সুন্দরবনের বাঘের প্রধান হুমকি তিনটি-বাঘ হত্যা, বাঘের শিকার প্রাণী-হরিণ হত্যা এবং বাঘের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বাঘের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক আবাসস্থল সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণে গত ক’বছর সরকারি উদ্যোগে বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষণাপত্র থেকে জানা গেছে, পৃথিবীতে বাঘের মোট নয়টি উপপ্রজাতি ছিল। গত শতাব্দীতে তিনটি উপপ্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাকিগুলোর মধ্যে সুন্দরবনের বাঘ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের। ২ হাজার ৬০০ বছর ধরে এই বাঘ সুন্দরবনসহ বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলীয় এলাকায় টিকে আছে।
র্যাব, পুলিশ, বন বিভাগ ও বনজীবী সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের বাঘ হত্যায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়। চোরাশিকারিরা সুন্দরবনে বিভিন্নভাবে বাঘ হত্যা করে। “গডফাদার” ও “মহাজন”-এর কাছ থেকে অগ্রিম “দাদন” নিয়ে ছদ্মবেশে বনে ঢোকে একশ্রেণির শিকারী। কখনও গুলি করে, আবার কখনও ফাঁদে আটকে বাঘ শিকার করে তারা। ছাগল বা হরিণ মেরে সেগুলোর শরীরে বিষ মেখে বাঘের খাবার হিসেবে বনে ফেলে রাখা হয়। বাঘ এসব বিষমাখা মৃতপ্রাণী খেয়ে বিষের প্রতিক্রিয়ায় মারা যায়, আর তা না হলে মুমূর্ষু হয়ে পড়ে। তখন সহজে হত্যা করা হয়।
মৃত বাঘের শরীর থেকে চোরা শিকারীরা চামড়া, মাংস, চর্বির তেল মাথার খুলি, দাঁত, পুরুষাঙ্গ, হাড়সহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহ করে। এরপর আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের কাছে এসব চড়া দামে বিক্রি করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কালোবাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
বিশ্ববাঘ সম্মেলনের তথ্য অনুযায়ী, বাঘের শুকনো মাংস ও হাড়চুর্ণ কাজে লাগছে বুড়ো কোটিপতিদের। তাদের বিশ্বাস, এসব সেবনে নাকি হারানো পৌরুষ ফিরে পাবে তারা!
আবার বার্ধক্যজনিত কারণে ও লবণাক্ত পানি পান করায় লিভার সিরোসিস রোগেও সুন্দরবনের অনেক বাঘ মারা যাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগেও বাঘের মৃত্যু হচ্ছে। খাদ্যসংকটসহ নানা কারণে লোকালয়ে চলে আসা বাঘ পিটিয়ে হত্যা করছে সুন্দরবন লাগোয়া গ্রামবাসী।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জোয়ারের সময় নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে। এর ফলে সুন্দরবনের বনভূমি ডুবে যাওয়ার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বাঘের বিচরণক্ষেত্র কমেছে। পাশাপাশি লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় মিষ্টি পানি না পাওয়ায় লবণাক্তপানি পান করে বাঘ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বার্ধক্যজনিত এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগও কিছু বাঘ মারা যাচ্ছে।”
অধ্যাপক হারুন বলেন, “নির্বিচারে গাছ কেটে উজাড় করা, খাদ্যসংকট, অপরিকল্পিত পর্যটন ও বনের মধ্য দিয়ে ভারী নৌযান চলাচলেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে সুন্দরবনের বাঘের ওপর। বাঘের বিচরণক্ষেত্রগুলোতে হরিণের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মাঝে মধ্যে বাঘের খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এ সময় বাঘ নদী-খাল পেরিয়ে লোকালয়ে চলে আসে। গ্রামবাসী তখন পিটিয়ে বাঘ হত্যা করে।”
অবশ্য সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেএম হাসানুর রহমান বলেন, “২০১৮ সালের পর থেকে কোনো বাঘ লোকালয়ে প্রবেশ করেনি। এখন আর পিটিয়ে বাঘ হত্যার খবর পাওয়া যায় না।”
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ২৩ মার্চ “সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প” শীর্ষক একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। যার ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫ কোটি ৯৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ প্রকল্পের দুটি অংশ ছিল। যার একটি ছিল বাঘ জরিপ ও অন্যটি বাঘ সংরক্ষণ। চলতি বছরের মার্চে প্রকল্পটি শেষ হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে মোট ৯ বার সুন্দরবনের বাঘ জরিপ করা হয়েছে। তবে ২০১৫ সালের আগের জরিপগুলোর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বন বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের সর্বশেষ বাঘ জরিপে বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ৯.৬৫ শতাংশ এবং ২০১৫ সালের তুলনায় ১৭.৯২% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই হিসাবের বাইরেও ২১টি বাঘের শাবক পাওয়া গেছে,
তবে কম বয়সী শাবকদের উচ্চ মৃত্যুহারের কারণে তাদেরকে মূল তালিকায় রাখা হয়নি।
২০০৪ সালে দেশে বাঘের সংখ্যা ছিলে ৪৪০টি, যার মধ্যে ১২১টি পুরুষ, ২৯৮টি স্ত্রী এবং ২১টি বাচ্চা ছিলে। ২০০৯ সালে ৩০০-৫০০ টির বাঘের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিলে বলে বন অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে ২০১০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেশে বাঘের সংখ্যা নির্ণয় হয় ২৫০টি। আর ২০১২ সালে ডব্লিউটিপির জরিপে, দেশে এক দশকে বাঘের সংখ্যা ৭০% কমে গেছে বলে জানানো হয়। এরপর ২০১৫ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা কমে দাড়ায় মাত্র ১০৬টি।
সুন্দরবন অঞ্চলের বনসংরক্ষক ইমরান আহমেদ দাবি করেন, গত পাঁচ-সাত বছরে সুন্দরবনের প্রাণীর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতিক সময়ে সন্দরবন ঘুরতে যাওয়া পর্যটনকরাও বাঘের চলাচল কিংবা নদী পাও হওয়ার চিত্র বেশি দেখতে পাচ্ছেন। পাশাপাশি বাঘ যেসব প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে সেগুলোর পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাঘ সুরক্ষায় বন অধিদপ্তর সর্বোচ্চ কার্যক্রম পরিচালনা করছে জানিয়ে বন সংরক্ষক বলেন, বন বিভাগ, পুলিশ, র্যাব, কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশ যৌথভাবে বাঘ শিকার প্রতিরোধেও কাজ করছে।



