Saturday, August 22, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রেশমের নগরীতেই বিদেশি কাপড়ের দাপট, হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য

৭৬টি বেসরকারি রেশম কারখানার মধ্যে বর্তমানে ৭০টিই বন্ধ

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ১১:১০ পিএম

একসময় রাজশাহী মানেই ছিল ঝলমলে রেশমের শাড়ি, নরম-মসৃণ কাপড় আর ঐতিহ্যবাহী এক শিল্পের গৌরব। রাজশাহীর রেশম শুধু একটি শিল্প নয়, অঞ্চলের পরিচয়, সংস্কৃতি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

নগরীর পুরোনো সিল্ক শোরুমগুলোতে গেলেই বদলে যাওয়া চিত্র চোখে পড়ে। একসময় যেখানে রেশমের আধিপত্য ছিল, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে ভারতীয় শাড়ি, চীনা কাপড়, নন-সিল্ক থ্রি-পিস বিভিন্ন ধরনের তৈরি পোশাক। অর্থাৎ রেশমের নগরীতেই নিজস্ব রেশম ক্রমেই জায়গা হারাচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, “শুধু রেশমের ওপর নির্ভর করে এখন ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন। উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ। বিপরীতে ক্রেতাদের বড় অংশ তুলনামূলক কম দামের পোশাকের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে ব্যবসা ধরে রাখতে বাধ্য হয়ে দোকানে অন্যান্য পণ্য রাখতে হচ্ছে।“

সপুরা সিল্ক মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপক সাইদুর রহমান বলেন, “রেশমকেন্দ্রিক ব্যবসা পরিচালনা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে সেই অনুযায়ী দাম পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে নন-সিল্ক পণ্যও যুক্ত করতে হচ্ছে।“

একসময় রাজশাহীর রেশম শিল্প ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক চক্র। তুঁতচাষি, রেশম পোকার চাষি, কোকুন উৎপাদক, সুতা প্রস্তুতকারী, তাঁতি ব্যবসায়ী সবাই ছিলেন একই উৎপাদন ব্যবস্থার অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চক্রের প্রায় প্রতিটি ধাপই দুর্বল হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৪০০ টন রেশম সুতার চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় মাত্র ৪০ থেকে ৪২ টন। ফলে চাহিদার বড় অংশই বিদেশি সুতার ওপর নির্ভরশীল।

রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী ঊষা সিল্কের জেনারেল ম্যানেজার জহুরুল ইসলাম বলেন, “রেশম উন্নয়ন বোর্ড কার্যকরভাবে স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখতে পারেনি। ফলে চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে সুতা আমদানি করতে হচ্ছে।“

তিনি জানান, পাঁচ বছর আগে প্রতি কেজি রেশম সুতা থেকে হাজার টাকায় পাওয়া গেলেও বর্তমানে একই সুতা কিনতে প্রায় হাজার টাকা লাগে। এতে রেশম কাপড়ের উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

উৎপাদন ব্যয়ের প্রভাব পড়েছে বাজারেও। এক দশক আগে যে রেশম শাড়ি থেকে হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এখন একই মানের শাড়ির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় থেকে ১০ হাজার টাকা। ফলে মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের একটি বড় অংশ রেশম কেনা থেকে সরে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে সংকট দেখা দিয়েছে তুঁত চাষেও। একসময় উত্তরাঞ্চলের অনেক কৃষকের আয়ের অন্যতম উৎস ছিল তুঁত চাষ। কিন্তু কম লাভ, বেশি শ্রম এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে কৃষকরা ধীরে ধীরে চাষ থেকে সরে যাচ্ছেন।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে রাজশাহীতে তুঁত চাষের জমির পরিমাণ ছিল ১৪৮ দশমিক একর। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩৭ দশমিক ৬১ একরে।

চারঘাট উপজেলার তুঁতচাষি আব্দুল আওয়াল জানান, তার পূর্বপুরুষরাও তুঁত চাষ করতেন। কিন্তু লাভ কম হওয়া এবং সরকারি প্রণোদনার অভাবে তিনি এখন আগের তুলনায় অনেক কম জমিতে তুঁত চাষ করছেন।

বাংলাদেশ রেশম শিল্প মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিসিক শিল্প এলাকার ৭৬টি বেসরকারি রেশম কারখানার মধ্যে বর্তমানে ৭০টিই বন্ধ। সংশ্লিষ্টরা এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাঁচামালের সংকটকে চিহ্নিত করছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক . আমিনুজ্জমান সালেহ রেজা বলেন, “রাষ্ট্রীয় রেশম কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, আমদানি করা নিম্নমানের রেশমের প্রবেশ এবং স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থার দুর্বলতা শিল্পটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।“

তার মতে, রেশম শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে রেশম পোকার ডিম উৎপাদন থেকে শুরু করে কোকুন, সুতা, তুঁত চাষ বিপণন পুরো ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত মডেলের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক (অর্থ পরিকল্পনা) . এম মান্নান বলেন, “রেশম শিল্পের পুনর্জাগরণে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করলে হবে না; উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে।“

   

About

Popular Links

x