Wednesday, September 09, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

টাঙ্গাইলের যে সংগ্রহশালায় রয়েছে শতবর্ষী টেলিফোন ও জিনিসপত্র 

৭৩ বছর বয়সী ইসমাইল হোসেন সেলিম তার বাসভবনে এই সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন 

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০১ পিএম

টাঙ্গাইল শহরের ৭৩ বছর বয়সী ইসমাইল হোসেন সেলিম। স্কুলজীবনে ডাকটিকেট সংগ্রহের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল তার সংগ্রাহক জীবন। তবে তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় একটি অটোগ্রাফ। স্কুলজীবনে বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক ইব্রাহিম খাঁ। এক বড় ভাইয়ের অনুরোধে মঞ্চে উঠে তার অটোগ্রাফ সংগ্রহ করেন সেলিম আর সেই মুহূর্তই বদলে দেয় তার জীবনের পথচলা। 

সেলিমের সংগ্রহশালা
তার সংগ্রহের অন্যতম আকর্ষণ জিম্বাবুয়ের ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যাংক নোট। যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ মূল্যমানের ব্যাংক নোট হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। 

এছাড়াও তিন শতাধিক প্রাচীন টেলিফোন আর শতবর্ষী অ্যান্টিকস সবমিলিয়ে টাঙ্গাইলে গড়ে উঠেছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ব্যতিক্রমী সংগ্রহশালা। সেলিমের সংগ্রহশালাটি এখন জেলায় সাধারণ মানুষের কাছে কৌতূহলের বিষয়। তার এ সংগ্রহশালাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন টাঙ্গাইলবাসী। 

সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিরল মুদ্রা, অটোগ্রাফ, পুরোনো প্রযুক্তিপণ্য ও অ্যান্টিকস। অবশেষে নিজের বাসভবনের একটি কক্ষকে তিনি পরিণত করেছেন ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায়। সেখানে রয়েছে তিন শতাধিক টেলিফোন, ১৭২টি দেশের ব্যাংক নোটসহ সুলতানী এবং মোগল আমলের মুদ্রাও রয়েছে। এছাড়া ১১৭টি দেশের দিয়াশলাই আর সযত্নে সংরক্ষিত নানা ঐতিহাসিক স্মারক। শুধু টাকা-পয়সা নয়, এখানে রয়েছে শতবর্ষী টেলিফোন ও প্রযুক্তির বিবর্তনের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। 

১১৭ দেশের দিয়াশলাই
তার সংগ্রহে আছে ১১৭ দেশের বিভিন্ন সাইজের ও বিভিন্ন আকৃতির দিয়াশলাই। আছে ১৮৯৮ সালের এডিসন ফোনোগ্রাফের অরিজিনাল সিলিন্ডার রেকর্ড, ফোনোগ্রাফ রেপ্লিকা, ১৯৩৪ সালের ইংল্যান্ডের তৈরি এবং ১৯৪২ সালের এইচএমভি গ্রামোফোন, ১৯৪০ সালের ৮ মি.মি. সাইলেন্ট মুভি প্রজেক্টর, ১৯৬০ সালের জার্মানের তৈরি রীল টু রীল টেপ রেকর্ডার বিভিন্ন দেশের তৈরি হ্যাজাক, হারিকেন, টাইপরাইটারসহ নানা সামগ্রী।  

১৯২০-১৯৯০ দশকের টেলিফোন 
টেলিফোন সেটগুলো ১৯২০ থেকে ১৯৯০ সাল সময়ের। এর মধ্যে রয়েছে- প্রিন্স, ক্যান্ডেলস্টিক, মেরিন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল, রোটারি, মাইনিং, পিবিএক্সসহ বিভিন্ন ধরণের টেলিফোন। বাংলাদেশ টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস)-এর তৈরি টেলিফোন এবং পাকিস্তান, ভারত, মালয়েশিয়া, পোল্যান্ড, রাশিয়া, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, জাপান, জার্মানি, চায়না, কোরিয়া, হাঙ্গেরি সহ বিভিন্ন দেশের টেলিফোন। আর আছে প্রথম সময়ের মোবাইল ফোন। 

খ্যাতিমান ব্যক্তিদের অটোগ্রাফ
তার সংগ্রহে রয়েছে মাদার তেরেসা, নেলসন ম্যান্ডেলা, উডারল্যান্ড, রাদিচে, কফি আনান, বুট্রোস ঘালি, এডমন্ড হিলারি, ব্রজেন দাস, ভারতের বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী সুবীর সেনসহ দেশ বিদেশের খ্যাতিমান ব্যক্তিদের অটোগ্রাফ।

সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের কলেজ পাড়ায় তার বাসভবনের একটি রুমে এই সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন। দেয়ালের একটি ভবনে পুরাতন অনেক টেলিফোন, অন্যদিকে দেয়াল জুড়ে রয়েছে ডিসপ্লে বোর্ড এবং লম্বা টেবিল। শোকেস, টেবিল এবং ডিসপ্লে বোর্ডে সাজানো বিভিন্ন রকম ল্যান্ড লাইন ও মোবাইল টেলিফোন সেটগুলো রাখা আছে। এছাড়াও বিভিন্ন দেশের টাকার নোটও দেখা যায়। 

সেলিমের জন্ম টাঙ্গাইল শহরের কলেজপাড়া এলাকায় ১৯৫৫ সালে। বাবা গোলাম সরোয়ার ছিলেন টাঙ্গাইল পৌরসভার সচিব। সেলিম লেখাপড়া করেছেন শহরের বিন্দুবাসিনী বালক উচ্চ বিদ্যালয়, কাগমারীর মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ ও সরকারি সা’দত কলেজে। সরকারি সা’দত কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে স্নাতক পাশ করেন তিনি। 

কলেজ পাশ করে ১৯৭০ সালে স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি চাকরি ছেড়ে যোগ দেন টাঙ্গাইল পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে। পরে ২০১৩ সালে ওই পৌরসভার সচিব হিসেবে অবসর নেন। 

কবি ও লেখক অরণ্য ইমতিয়াজ বলেন, ‘‘ইসমাইল হোসেন সেলিম ডাকটিকিট, অটোগ্রাফ এবং পুরোনো বিভিন্ন স্মারক শতবর্ষী পুরোনো বই, সাময়িকী, চিঠিপত্র, কয়েন, পদক, পুরোনো প্রযুক্তির জিনিসপত্রসহ স্থানীয়  ইতিহাসের নানা দুর্লভ উপাদান সংগ্রহ করেছেন।’’ 

গীতিকার মাসুম ফেরদৌস বলেন, ‘‘সেলিমের এ সংগ্রহ শালাটি অসাধারণ। এটি অতীত এবং বর্তমানের সেতুবন্ধন বলে আমি মনে করি।’’ 

ইসমাইল হোসেন সেলিমের স্ত্রী জাহানারা বেগম বলেন, ‘‘আগে আমি এসব জিনিস পছন্দ করতাম না। আমি তাকে অনেক সময় পাগলও বলতাম। বর্তমানে আমার স্বামীর এ কার্যক্রমে আমি অনেক খুশি।’’  

এ ব্যাপারে ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘‘শখ থেকেই সংগ্রহ শুরু। দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন সামগ্রী, যা সময়ের কারণে বিলুপ্তীর পথে, সেগুলোই ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সংগ্রহ জরুরি মনে করে আমার এ সংগ্রহ। যাতে অতীত এবং বর্তমানের মধ্যে সেতু বন্ধন তৈরি করবে। আমার কাছে ১১৭ দেশের দিয়াশলাই এবং ১৭২ দেশের ব্যাংক নোট রয়েছে। সুলতানি, মোগল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানি আমলের মুদ্রা রয়েছে। স্মারক নোট এবং ব্যাংক নোট রয়েছে সংগ্রহ শালায়। এছাড়া বিভিন্ন দেশের হ্যাজাক এবং পিতলের হারিকেন রয়েছে।’’ 

এ ব্যাপারে সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহিন মিয়া বলেন, ‘‘এ জেলায় রয়েছে প্রাচীন ইতিহাস। সংরক্ষণের অভাবে অনেক ইতিহাস প্রায় বিলুপ্ত। ব্যক্তি উদ্যোগে ইসমাইল হোসেন সেলিম প্রাচীন সামগ্রী সংগ্রহ করেছেন। তার এ উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।’’ 

   

About

Popular Links

x