প্রকৃতিতে কাশ ফুলের নরম ছোয়া। শরতের স্নিগ্ধতা। নীল আকাশে সাদা ভেলা। মনোরম শরতে দিন-ক্ষণ গননা শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার।
মর্তে আসছেন দুর্গতি নাশিনী। দশভূজা দেবীর বিগ্রহ তৈরীতে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমা শিল্পীরা। দেবী দুর্গার অবয়ব ফুঁটিয়ে তুলতে কারিগররা দিন রাত কাজ করছেন। পাশাপাশি মণ্ডপের সাজসজ্জা ও আলোক সজ্জার ফ্রেমের কাজ চলছে পুরোদমে।
আসছে ১৫ অক্টোবর, দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে দুর্গোৎসবের মূল পর্ব। তার আগেই বেদী বন্দনার সব প্রস্তুতি শেষ করতে চাইছেন সবাই।
এ বছর গোপালগঞ্জ জেলায় ১,২৮৮ মণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হবে বলে জেলা প্রশাসন থেকে জানা গেছে। এর মধ্যে- গোপালগঞ্জ সদর উপজেলায় ৩৫০টি, কাশিয়ানী উপজেলায় ২২৬টি, কোটালীপাড়া উপজেলায় ৩১৫টি, মুকসুদপুর উপজেলায় ৩০৭টি ও টুঙ্গিপাড়া উপজেলায় ৯০টি মণ্ডপে পুরোদমে পূজার প্রস্তুতি চলছে।
আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হবে। এ বছর ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে মর্তে আসবেন মহিষী-মর্দিনী। এরপর ১৫ অক্টোবর দেবীকে বোধনের মধ্য দিয়ে আহ্বান করা হবে।
এবারে, ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী, ১৭ ও ১৮ অক্টোবর দুইদিন সপ্তমী, ১৯ অক্টোবর অষ্টমী, ২০ অক্টোবর নবমী ও ২১ অক্টোবর দশমী বিহিত পূজা অনুষ্ঠিত হবে। ২১ অক্টোবর সন্ধ্যায় বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শারদীয়া দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটবে। নৌকায় চেপে কৈলাশে ফিরবেন দেবী ।
গোপালগঞ্জ শহরের সিকদারপাড়ার বাজার যুব সংঘের দুর্গা মন্দিরের প্রতিমা তৈরী করছিলেন প্রকাশ দাসসহ তার সহকর্মীরা।
প্রহল্লাদ বিশ্বাস বলেন, ‘‘সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার ৫টি পূজা মণ্ডপে ৫টি প্রতিমা তৈরির কাজ পেয়েছি। একটি প্রতিমা তৈরিতে ১০ থেকে ১১ দিন সময় লাগে। আমিসহ ৬ জন কারিগর কাজ করছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিমা তৈরি শেষ করতে রাত জেগে হলেও কাজ করতে হচ্ছে।’’
তিনি জানান, প্রতিমা তৈরির পর এক একটি প্রতিমায় রংতুলির আঁচড় দিতে দুই দিন করে সময় লাগে। প্রতিমা না শুকিয়ে রংতুলির কাজ করলে তা সুন্দর হয় না। এ কারণে পূজা শুরু হওয়ার ৮-১০ দিন আগেই প্রতিমার গায়ে মাটি লাগানোর কাজ শেষ করতে হয়। যে প্রতিমা যত বেশি শুকানো হবে, সেটি তত বেশি সুন্দর দেখা যাবে।
প্রতিমা শিল্পী উত্তম পাল বলেন, ‘‘রং তুলিসহ অন্যান্য সামগ্রীর দাম বেড়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এ বাজারে কাজ করে, যা পাই তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর। তারপরও বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছি। ১৬ বছর ধরে মায়ের প্রতিমা তৈরি করে আসছি। এ পেশা আঁকড়েই বাঁচতে চাই।’’
বাজার যুব সংঘের পূজা মণ্ডপের পূজা উদযাপন কমিটির সদস্য দিলীপ কুমার সাহা দীপু বলেন, ‘‘প্রতিমা তৈরি হয়েছে। এখন সাজসজ্জা-আলোকসজ্জা ও দৃষ্টিনন্দন গেটের ফ্রেমের কাজ চলছে। আমরা ১২ অক্টোবরের মধ্যে পূজার যাবতীয় কাজ শেষ করব। আমরা ধর্মীয় ভাবগাম্বীর্যের মধ্যে দিয়ে ৫ দিন দেবীর আরাধনা করব।’’
গোপালগঞ্জ শহরের খাটরা কালিবাড়ি কমিটির সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল বিশ্বাস বলেন, ‘‘মায়ের পূজা করে আমরা দুর্গতি নাশ চাই, অসুরের বিনাশ চাই। শুভ বুদ্ধির উদয় চাই। আমাদের প্রস্তুতি ভালো। সবার সহযোগিতায় আমরা উৎসব মুখর পরিবেশে পূজা আয়োজন ও উদযাপন করতে পারব।’’
পূজা উদযাপন ফ্রন্টের গোপালগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক অশোক বিশ্বাস বলেন, ‘‘আমার পূজা মণ্ডপগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছি। তাদের সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পরামর্শ দিচ্ছি। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদযাপন করব।’’
গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো: আরিফ-উজ-জামান বলেন, ‘‘গোপালগঞ্জে এ বছর ১,২৮৮ মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে মণ্ড প্রতি ৬০০ কেজি চাল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। গোপালগঞ্জের আইনশৃংখলা পরিস্থিতি সমুন্নত রয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পূজা উদযাপন কমিটির সাথে যোগাযোগ রয়েছে। আগামী ৪ অক্টোবর তাদের সাথে মিটিং এর আয়োজন করা হয়েছে। তাদের পরামর্শ এ মিটিং এ গ্রহণ করা হবে। পূজায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। সেভাবেই প্রশাসন ও আইনশৃংখলা রক্ষা বাহিনী কাজ করছে। আশা করছি উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদযাপিত হবে।’’



