Wednesday, October 21, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সূর্যাস্তের রক্তিম আভায় বিদায় মা দুর্গার, কক্সবাজার সৈকতে হাজারো মানুষের ঢল

জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতিমা এনে সমুদ্রে বিসর্জন দেওয়া হয়

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম

সন্ধ্যা নামার ঠিক আগমুহূর্তে পশ্চিম আকাশে অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ে বঙ্গোপসাগরের জলরাশিতে। ঢাকের শেষ তালে, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখর কক্সবাজারের লাবণী সৈকতে একে একে সাগরের জলে বিলীন হয় দেবী দুর্গার প্রতিমা। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মর্ত্যবাস শেষে কৈলাশে স্বামী মহাদেবের কাছে ফিরে যান মা দুর্গা। ভক্তদের কণ্ঠে তখন প্রতিধ্বনিত হয় চিরচেনা আহ্বান, ‘আসছে বছর আবার হবে’।

বিজয়া দশমী উপলক্ষে মঙ্গলবার বিকেলে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে অনুষ্ঠিত হয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠান। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় প্রতিমা এনে সমুদ্রে বিসর্জন দেওয়া হয়। কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় ৩০০টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সদর, রামু, ঈদগাঁও, উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া থেকে শত শত ভক্ত প্রতিমাসহ শোভাযাত্রায় অংশ নেন।

বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে লাবণী সৈকত পরিণত হয় জনসমুদ্রে। ঢাক, কাঁসর, শঙ্খধ্বনি ও ধর্মীয় সংগীতের তালে এগিয়ে আসে প্রতিমাবাহী ট্রাক, পিকআপ ও শোভাযাত্রা। ভক্তদের অনেকে দেবীর উদ্দেশে ফুল ছিটিয়ে, ধূপ জ্বালিয়ে ও প্রার্থনা করে বিদায় জানান। প্রতিমা সাগরের জলে নামানোর মুহূর্তে অনেকের চোখে ছিল অশ্রু, আবার মুখে ছিল আগামী বছর দেবীর ফিরে আসার আশাবাদ।

কক্সবাজারের এই বিসর্জন এখন শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়, পর্যটনের বড় আকর্ষণও। দুর্গাপূজার ছুটি কাটাতে আসা হাজারো পর্যটক এই বিরল আয়োজন উপভোগ করতে লাবণী সৈকতে ভিড় করেন। অনেকে পরিবার নিয়ে দীর্ঘ সময় সৈকতে অবস্থান করেন; কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও করেন, কেউ পেশাদার ক্যামেরায় সূর্যাস্তের আলোয় বিসর্জনের দৃশ্য ধারণ করেন। এদিন স্থানীয় হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও ছিল বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য।

অনুষ্ঠান ঘিরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল চিত্রও দেখা যায়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অনেক মানুষও অনুষ্ঠান দেখতে সৈকতে উপস্থিত হন।

বিপুল জনসমাগমের কারণে পুরো সৈকতজুড়ে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। জেলা প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে পুলিশ, পর্যটন পুলিশ, পৌরসভা, ফায়ার সার্ভিস, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবকেরা দায়িত্ব পালন করেন। সৈকতের বিভিন্ন স্থানে নজরদারি টাওয়ার, মেডিকেল টিম, উদ্ধারসামগ্রী ও জরুরি সেবা প্রস্তুত রাখা হয়। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন ছিল। সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বিসর্জন অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।

কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে লাবণী উন্মুক্ত মঞ্চে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠুর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ও বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি ও উখিয়া-টেকনাফ আসনের সংসদ সদস্য শাহাজাহান চৌধুরী, কক্সবাজার সদর-রামু আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না, জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান ও পুলিশ সুপার সাজেদুল ইসলাম। এ ছাড়া জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারাও বক্তব্য দেন।

বক্তারা বলেন, কক্সবাজারের সব পূজামণ্ডপে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পূজা ও বিসর্জন সফল করতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবক ও সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা ছিল আন্তরিক ও প্রশংসনীয়। তাঁদের মতে, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের কারণেই কক্সবাজারে ধর্মীয় উৎসব উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়ে আসছে।

সমুদ্রের বিশাল জলরাশি, সূর্যাস্তের সৌন্দর্য, ঢাকের ছন্দ আর হাজারো মানুষের উপস্থিতি মিলিয়ে লাবণী সৈকতের এই বিসর্জন এখন কক্সবাজারের অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক আয়োজনে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর এ আয়োজন ঘিরে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেবীর বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। ভক্তদের হৃদয়ে রয়ে গেল নতুন প্রত্যাশা, অশুভ শক্তির বিনাশ আর শুভ শক্তির বিজয়ের বার্তা নিয়ে আগামী বছর আবারও ফিরে আসবেন মা দুর্গা।

   

About

Popular Links

x