একপাশে লাঠিসোঁটা হাতে আন্দোলনকারী শ্রমিক, অন্য পাশে পুলিশ। চারদিকে টিয়ার গ্যাসের ঝাঁঝালো গন্ধ, সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দ আর উড়ে আসছে ইটপাটকেল। এমন পরিস্থিতিতে এক মা সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ছুটছেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। কাঁধে একটি ব্যাগ, এক হাতে সন্তানকে আগলে রেখে প্রাণপণে ছুটছেন তিনি।
গত ২ নভেম্বর রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের সময় এমনই একটি মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ফটোসাংবাদিক জাকির হোসেন।
সংবাদমাধ্যমটির ফেসবুক পেজে প্রকাশের পর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ছবিটি। সন্তানকে বুকে জড়িয়ে মায়ের এই ছুটে চলার দৃশ্য নাড়া দেয় অসংখ্য মানুষের মনে। ছবিটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হয় নানা প্রতিক্রিয়া।
অনেকেই ধারণা করেছিলেন, সন্তানকে স্কুল থেকে নিয়ে ফেরার পথে সংঘর্ষের মধ্যে পড়েছিলেন ঐ মা।
তবে খোঁজ মিলেছে ছবির সেই মা-ছেলের। মায়ের নাম শিমু সরকার, ছেলের শুভ সরকার। মাদারীপুর থেকে ছেলের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন তিনি।
শিমু সরকার জানান, তার ছেলের চোখে অ্যালার্জির সমস্যা। প্রায়ই চোখ লাল হয়ে যায়, পানি পড়ে এবং ফুলে ওঠে। গ্রামে কয়েকজন চিকিৎসক দেখিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। তাই উন্নত চিকিৎসার আশায় ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় আসেন তিনি।
আন্দোলনের বিষয়ে আগে থেকে কিছুই জানতেন না জানিয়ে শিমু বলেন, ‘‘সংঘর্ষের কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে মিরপুর-১০ নম্বরে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। কীভাবে হাসপাতালে পৌঁছাব, তা বুঝতে না পেরে গাড়ির খোঁজে হাঁটতে শুরু করি। একপর্যায়ে ঢুকে পড়ি সংঘর্ষের মধ্যে।’’
তিনি আরও জানান, চারপাশে সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে তার সন্তান। এদিক-সেদিক থেকে উড়ে আসছিল ইটপাটকেল। সন্তানের জীবন বাঁচাতে তাকে বুকে জড়িয়ে এক হাত দিয়ে মাথা ঢেকে দৌড়াতে শুরু করেন তিনি।
এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বোন ও ভাগ্নে। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠলে বোনকে উদ্দেশ করে শিমু বলেন, ‘‘বোন, দৌড় দিয়ে আগে এখান থেকে বের হই। নইলে তো আমরা সবাই মরে যাব।’’
সেদিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন শিমু সরকার। সংঘর্ষের এলাকা থেকে কোনোমতে বের হয়ে রাস্তায় পতিত দেবনাথ নামের এক অপরিচিত ব্যক্তির কাছে সাহায্য চান তিনি। আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘‘দাদা, আমার সন্তানকে বাঁচান।’’
পতিত দেবনাথ জানান, মা ও সন্তানকে বিপদের মধ্যে পড়তে দেখে এগিয়ে আসেন তিনি। শিশুটি ভয়ে জড়সড় হয়ে ছিল। পরে তাদের নিজের বাসায় আশ্রয় দেন তিনি।
এখনও সেই আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেনি সেই ছোট্ট শুভ। ভয়ে বাসা থেকে বের হতে চায় না সে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ছেলেকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে চান শিমু।
সন্তানের জন্য সবার কাছে আশীর্বাদ চেয়ে শিমু বলেন, ‘‘সবাই আমার সন্তানের জন্য একটু আশীর্বাদ করবেন, যেন কোনো বিপদে না পড়ে। আমি যেন সব বিপদ থেকে আমার সন্তানকে আগলে রাখতে পারি, রক্ষা করতে পারি।’’



