ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সহপাঠী ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অশ্লীল ছবি ও ভিডিও তৈরি এবং কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চেয়ে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের চাপ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। অভিযুক্ত শিক্ষার্থী ঢাবির বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. মোফাজ্জল হোসেনের ছেলে বলে জানা গেছে।
ঘটনার তদন্তে স্কুল কর্তৃপক্ষ ঢাবির দুই সহকারী প্রক্টর একেএম নুর আলম সিদ্দিকী ও এনামুল হক সজীবকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে। তবে কমিটির ভূমিকা নিয়ে আপত্তি জানান আন্দোলনকারীরা। সেই আপত্তির মুখে দুই সহকারী প্রক্টর কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন এবং তাদের জায়গায় ঢাবির আরও দুজনকে যুক্ত করা হয়। বুধবার (৪ নভেম্বর) বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আরিফ রহমান এ তথ্য জানান।
এর আগে যৌন হয়রানির প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে আন্দোলন শুরু করেন। “মেয়েদের নিরাপত্তা চাই, হয়রানিমুক্ত স্কুল চাই” সহ নানা স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে তারা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অবস্থান নেন। আন্দোলনের সময় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাউকে সেখানে দেখা যায়নি।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রতিবাদ করায় উল্টো ১০ জন শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি স্থগিত করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। প্রথমে তাদের ক্লাস ও পরীক্ষা থেকে বিরত রাখা হলেও অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে আলাদা কক্ষে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে শ্রেণিকক্ষে অংশ নেওয়ার অনুমতি এখনো মেলেনি। শিক্ষার্থীদের দাবি, ঢাবির সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, প্রক্টর অফিস ও স্কুল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নানাভাবে তাদের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছে। আন্দোলন চালিয়ে গেলে টিসি দেওয়ার হুমকি এবং তদন্তের নামে অভিযুক্তকে অপহরণ ও মারধরের অভিযোগসংবলিত কাগজে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়ার কথাও তারা বলছেন। এ ছাড়া এক ভুক্তভোগীর বাসায় গিয়ে অভিযুক্তের পরিবারের সদস্যরা ভয়ভীতি দেখিয়েছেন বলেও অভিযোগ তাদের। আন্দোলনকারীদের দাবি, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী প্রভাবশালী শিক্ষকের সন্তান হওয়ায় বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রী বলেন, “আমরা অনেক দিন ধরে ওর (অভিযুক্ত) আচরণে আতঙ্কিত ও অস্বস্তিতে ছিলাম। এআই দিয়ে অশ্লীল ছবি ও ভিডিও বানিয়ে আমাদের ব্ল্যাকমেল ও হয়রানি করা হয়েছে। স্কুলে অভিযোগ দিয়েও বিচার পাইনি, উল্টো আমাদেরই শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছে।” আরেক ছাত্রী বলেন, “মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও এ ধরনের হয়রানি থেকে বাঁচতেই আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছি। অভিযুক্তের বাবা ঢাবির ডিন হওয়ায় অভিযোগের পর কিছুই করা হয়নি। পারিবারিক পরিচয় বিবেচনা না করে তাকে শাস্তি দিতে হবে।”
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যাপক মোফাজ্জল হোসেন দাবি করেন, গত ৭ অক্টোবর তার ছেলেকে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থী বের করে নিয়ে প্রথমে পলাশী মার্কেটের ছাদে এবং পরে আজিমপুরে দুটি ভবনের মাঝখানে মারধর করে। পরদিন তিনি অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। এরপর তার ছেলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগসংবলিত ফটো কার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয় বলে দাবি করেন তিনি। গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) এ বিষয়ে শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছেন। তার দাবি, তার ছেলের সঙ্গে অভিযোগকারী কয়েকজন শিক্ষার্থীর একসময় বন্ধুত্ব ছিল। পরে একটি ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডিতে লেখালেখিকে কেন্দ্র করে তাকে ভয়ভীতি দেখানো এবং টাকা নেওয়ার ঘটনা ঘটে। টাকা দেওয়া বন্ধ করে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরই তাকে মারধর করা হয় এবং এসব ছড়ানো হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. ইসরাফিল প্রাং বলেন, “আমরা এ বিষয়ে অ্যাসাইনড নই। স্কুল কর্তৃপক্ষই এসব বিষয় দেখবে। তবে সেখানে যাতে কোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সে জন্য সেদিন আমরা প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যদের পাঠিয়েছিলাম। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।”
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আরিফ রহমান জানান, এ ধরনের ঘটনা ঘটলে প্রথমে প্রধান হিসেবে তাকে জানানো উচিত ছিল, কিন্তু তাকে বিষয়টি জানানো হয়নি। তার দাবি, শিক্ষার্থীরা নিজেদের মা, শ্রেণিশিক্ষক বা কোনো নারী শিক্ষককে জানাতে পারত। তাকে না জানানোটা তাদের ভুল ছিল বলে শিক্ষার্থীরা স্বীকার করেছে বলেও দাবি করেন তিনি। অভিযুক্ত শিক্ষার্থী ঢাবির শিক্ষকের সন্তান হওয়ায় তদন্তে প্রভাব পড়ছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আগে পড়েনি, এখনো পড়ছে না।” কমিটির সদস্যদের ওপর স্কুল কর্তৃপক্ষের কেউ চাপ সৃষ্টি করেননি বলেও জানান তিনি। শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে তিনি জানান, তার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং কারও প্রতি অবিচার হবে না।



