Sunday, November 08, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

টঙ্গীতে মাদক কারবারি চক্রের হাতে জিম্মি ঢাকা ট্রিবিউন’র ৩ সাংবাদিক

মাদক ব্যবসার অনুসন্ধানে গিয়ে তিন ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতনের শিকার, অস্ত্রের মুখে স্বীকারোক্তির ভিডিও ধারণ

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২০ পিএম

গাজীপুরের টঙ্গীতে মাদক কারবারের অনুসন্ধান করতে গিয়ে ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন’র তিন সাংবাদিককে প্রায় তিন ঘণ্টা জিম্মি করে রাখা, অস্ত্রের মুখে নির্যাতন ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরপর সাংবাদিকদের ওপর এমন হামলার ঘটনায় এলাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন হাজীর মাজার বস্তি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এর আগে একই এলাকায় গত ২৬ অক্টোবর দৈনিক কালবেলার গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি মহিন উদ্দিন রিপনকে অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে।

নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগী সাংবাদিকেরা হলেন ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন’র প্রতিবেদক রাবিউল হাসান, আসিফুল ইসলাম রিফাত এবং ফটো সাংবাদিক আবির আহমেদ সুপ্ত। আহত সাংবাদিকরা প্রথমে টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁদের অন্যত্র পাঠানো হয়। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় রাবিউল হাসান গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপির) টঙ্গী পশ্চিম থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন ২০ থেকে ২৫ জনের একটি সশস্ত্র দল এলাকায় তথ্য সংগ্রহের সময় তাদের ওপর হামলা চালায়।

অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা সাংবাদিকদের জোর করে ঘুমের ওষুধ মেশানো তরল পান করায়। পরে তাদের সামনে মাদক ও টাকা রেখে মাদকসেবী ও কারবারি হিসেবে মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করে ভিডিও ধারণ করা হয়। ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যে এসব ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল বলে ধারণা করছেন ভুক্তভোগীরা। এ সময় তাদের ক্যামেরা, মোবাইল ফোন, টাকা ও পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ওই এলাকায় অপরাধ ও মাদক কারবার নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাদের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হত্যার হুমকি দেন। ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীর ক্ষতবিক্ষত করার ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক কাছাকাছি একটি স্থানে নিয়ে যান। সেখানে প্রায় তিন ঘণ্টা আটকে রেখে বারবার মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে তাদের জোর করে ঘুমের ওষুধ মেশানো তরল পান করানো হয়। পরে সামনে মাদক ও টাকা রেখে মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করে ভিডিও ধারণ করা হয়। সাংবাদিকদের ধারণা, তাদের ভয় দেখানো এবং ভবিষ্যতে মাদকবিরোধী প্রতিবেদন প্রকাশ থেকে বিরত রাখতেই এসব করা হয়েছে।

‘তারা আমাদের হত্যার পরিকল্পনা করেছিল’

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নির্যাতনের শিকার ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন’র প্রতিবেদক রাবিউল হাসান জানান, তারা প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে ওই এলাকায় মাদক কেনাবেচার তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করছিলেন। এ সময় তাদের বাধা দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, “আমার মোবাইল ফোনে মাদক কারবারিদের স্পষ্ট ছবি ও ভিডিও ছিল। বিভিন্ন মাদক সরবরাহ কেন্দ্রের ভিডিওচিত্রও ছিল। হামলাকারীরা সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল এবং তাদেরকে ডেকে নিয়ে মোবাইল ফোনের তথ্য দেখতে চেয়েছিল। তিনি ফোন দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধর করা হয়। পরে অস্ত্রের মুখে ফোন ছিনিয়ে নিয়ে সব তথ্য মুছে ফেলা হয়।”

রাবিউল বলেন, “হামলাকারীরা বারবার আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে তাদের আঘাত করে এবং গুলি করার হুমকি দেয়। তাদের সংগ্রহ করা তথ্য-প্রমাণ দেখার পর সন্ধ্যা পর্যন্ত আটকে রাখা হয়। এ সময় হামলাকারীরা তাদের হত্যার পরিকল্পনা করেছিল এবং রিভলবার দিয়ে আঘাত করার পাশাপাশি গুলি করার চেষ্টাও করে।”

তিনি আরও দাবি করেন, সাংবাদিকদের আটকে রাখার সময় আশপাশে প্রায় ২০০ মানুষ প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা করছিলেন। ঘটনাস্থলটি একটি মসজিদ থেকে প্রায় ২০ মিটার এবং একটি খেয়াঘাট থেকে প্রায় ৫০ মিটার দূরে। এত দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখার পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য সেখানে আসেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পরে অজ্ঞাত পরিচয় এক ব্যক্তি মাদক কারবারীদের মোবাইল ফোনে ভিডিও কলের মাধ্যমে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাকে মাদক কারবার ও এলাকার অপরাধ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রাণভয়ে সাংবাদিকেরা তাতে সম্মতি জানান। এরপর আরও হত্যার হুমকি দিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

শুক্রবারের ঘটনায় ঢাকা ট্রিবিউনের সাংবাদিকরা জানান, তাদের জিম্মি করে রাখার সময় হামলাকারীরা সাংবাদিক রিপনের নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও তাদের দেখায়। একই ধরনের কৌশল বারবার ব্যবহারের ঘটনায় টঙ্গীতে সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

একই এলাকায় নির্যাতনের শিকার আরেক সাংবাদিক

এর আগে গত ২৬ অক্টোবর একই এলাকায় অস্ত্রের মুখে অপহরণের শিকার হন দৈনিক কালবেলার গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি মহিন উদ্দিন রিপন। ওই ঘটনায় করা অভিযোগ অনুযায়ী তাকে মারধর ও নির্যাতন করে আটকে রাখা হয়। পরে তার কাছে এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয় এবং তাকে বিবস্ত্র করে এক নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করা হয়। যা ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি তুরাগ নদ থেকে সাবেক এক বিমান বাহিনী কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার এবং পরে মাজার বস্তি এলাকা থেকে তার মোটরসাইকেল উদ্ধারের ঘটনাও ওই এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে ওই মৃত্যুর সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর হামলার কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।

পুলিশও সেখানে যেতে ভয় পায়

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একজন কর্মকর্তা স্বীকার করেন, ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাজ করতে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তিনি বলেন, আমরা পুলিশও সেখানে যেতে ভয় পাই। মনে হয়, বাংলাদেশের ভেতরে এটি যেন আলাদা একটি রাষ্ট্র।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “আমরা দলবদ্ধভাবে গেলেও অনেক সময় কোনো কাজ করতে পারি না। একবার একজন সহকর্মীকে নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে সেখানে গিয়েছিলাম। কোনোমতে সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছি।”

এলাকার পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক উল্লেখ করে ওই পুলিশ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের সেখানে গিয়ে অপরাধের অনুসন্ধান না করার পরামর্শ দেন।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপির) টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান জানান, সাংবাদিকদের লিখিত অভিযোগ তদন্তের জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত দুই দিনে ওই এলাকা থেকে ছয়জন মাদকসেবী ও দুজন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ওসির ভাষ্য অনুযায়ী, মাজার বস্তিতে আগের উচ্ছেদ অভিযানের পর মাদক কারবারিরা তাদের কার্যক্রমের ধরন পরিবর্তন করেছেন। তারা তুরাগ নদ ও বিশ্ব ইজতেমা ময়দানসংলগ্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণভাবে মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। পুলিশ অভিযান চালাতে গেলে সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা প্রায়ই ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আওতাধীন এলাকায় পালিয়ে যান অথবা ইজতেমা ময়দানের ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়েন। এলাকায় বড় ধরনের অভিযান পরিচালনার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইতিমধ্যে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযানের আশ্বাস পুলিশের

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপির) কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার শনিবার দায়িত্ব ছাড়ার আগে ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টঙ্গীর মাজার বস্তি ও আশপাশের এলাকায় মাদক কারবারি ও অপরাধীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জন্য শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপির) নবনিযুক্ত কমিশনার আশিক সাঈদ জানান, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য এখনও সংগ্রহ করছেন।

তিনি বলেন, “আমি মাত্র দায়িত্ব নিয়েছি এবং ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে পেরেছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

   

About

Popular Links

x