Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সুন্দরবনে চোরা শিকারিদের ফাঁদে বিপর্যস্ত চিত্রল হরিণ

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, একাধিক চক্র বিভিন্ন কৌশলে হরিণ শিকার করে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাংস, চামড়া, মাথা বিদেশে পাচার করছে

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৬:৩৬ পিএম

সুন্দরবনে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চোরা শিকারি চক্র। চোরা শিকারির দল টার্গেট করছে মায়াবী চিত্রল হরিণ। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, একাধিক চক্র বিভিন্ন কৌশলে হরিণ শিকার করে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাংস, চামড়া, মাথা বিদেশে পাচার করছে। মাঝে মধ্যে বন বিভাগ, কোস্টগার্ড বা পুলিশের হাতে পাচারের সময় ধরাও পড়ছে।

অভিযোগ রয়েছে, হরিণ শিকারের জন্য চোরা শিকারিরা সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয়ের গরিব, লোভী জেলে ও অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহার করে। ফেব্রুয়ারি মাসের ৮ তারিখ থেকে ১৭ তারিখ পর্যন্ত কোস্টগার্ডের পৃথক তিনটি অভিযানে ধরা পড়েছে হরিণের মাংস, মাথা ও চামড়া।

কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার লেফটেন্যান্ট এম মামুনুর রহমান জানান, ১৭ ফেব্রুয়ারি কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের অভিযানে হরিণের মাথা, ভূরি, পা ও চামড়াসহ মাংস উদ্ধার করেছে।

তিনি জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খুলনা জেলার কয়রা থানার খাসিটানা খাল সংলগ্ন এলাকায় কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের অধীনে বিসিজি স্টেশন কয়ড়ার একটি টহল দল অভিযান চালায়। অভিযানে দুটি হরিণের মাথা, দুটি চামড়া, দুটি ভূরি, আটটি পা ও দুই কেজি হরিণের মাংস পরিত্যক্ত অবস্থায় জব্দ করে। অভিযানে হরিণ শিকারিরা কোস্টগার্ড সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যায়।

লেফটেন্যান্ট এম মামুনুর রহমান এর আগে জানান, ১৫ ফেব্রুয়ারি কয়রা থানা এলাকায় কোস্টগার্ডের অভিযানে ১২ কেজি হরিণের মাংসসহ অসিত কুমার সরদার (৫০) নামের একজন হরিণ শিকারিকে আটক করা হয়। আটক অসিত কুমার সরদার খুলনার কয়রা উপজেলার বড়আংটিয়ারা গ্রামের বাসিন্দা।

এর আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের অভিযানে ৪২ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়। ওইদিন ভোর ৫টায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মোংলা থানার ডাংমারি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪২ কেজি হরিণের মাংস জব্দ করা হয়। ওই অভিযানে হরিণ শিকারিরা কোস্ট গার্ড সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যায়। ফলে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে, ২০২১ সালের ১৪ নভেম্বর কোস্ট গার্ড বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৭টি হরিণের চামড়াসহ ১০ কেজি মাংস উদ্ধার করেছিল। কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের বিসিজি স্টেশন পাথরঘাটার চরলাঠিমারা হরিণঘাটা খাল সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব উদ্ধার করা হয়েছিল। এ অভিযানেও কোনো চোরা শিকারিকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবনে বালিরগাঙ এলাকা থেকে অভয়ারণ্যে অনুপ্রবেশ করে মাছ ধরার সময় মংলা থানার কানাইমারী গ্রামের আব্দুস সোবহান ও তার তিন ভাই রাসেল মাতব্বর, রাহুল মাতব্বর ও আলামিন মাতব্বরকে আটক করে স্মার্ট পেট্রোল টিমের সদস্যরা। এ সময় তাদের ব্যবহৃত একটি ট্রলার, জাল, দড়ি, দা, ড্রামসহ ১০০ কেজি মাছ জব্দ করে।

এর আগে ১২ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরা রেঞ্জ পশ্চিম সুন্দরবন বুড়িগোয়ালিনী বনস্টেশন অফিসের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ আহরণ নিষিদ্ধ পারশে মাছের পোনা আটক করে তা বিভিন্ন পুকুরে অবমুক্ত করে। ১০ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী বনস্টেশন অফিসের বিশেষ দলের অভিযানে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের সময় ১২ জেলেকে আটক করা হয়। জেলেদের ব্যবহৃত ৫টি নৌকা, ২০ কেজি মাছ ও ৮০ কেজি কাঁকড়া উদ্ধার করে আভিযানিক দলটি। পরবর্তীতে উদ্ধারকৃত কাঁকড়া নদীতে অবমুক্ত করা হয়।

সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার জেলেদের দেওয়া তথ্যমতে, সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জ সংলগ্ন গ্রামগুলোতে একাধিক সংঘবদ্ধ বাঘ ও হরিণ শিকারি চক্র রয়েছে। এদের অবস্থান বরগুনা জেলার পাথরঘাটার চরদুয়ানী, সুন্দরবন পূর্ব-বিভাগের বাগেরহাট জেলার শরণখোলা, রামপাল, মোংলা, মোরেলগঞ্জ, পশ্চিম বিভাগের সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি, শ্যামনগর, কালীগঞ্জ, খুলনা জেলার পাইকগাছা, দাকোপ ও কয়রা উপজেলায়।

সূত্রমতে, বাঘ ও হরিণ শিকারিরা জেলে সেজে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে বনে যায়। এরপর খাদ্যে বিষ মিশিয়ে, ফাঁদ পেতে, বন্দুক দিয়ে গুলি করে বাঘ ও হরিণ হত্যা করে। শিকারিরা বাঘ বা হরিণ হত্যার পর স্থানীয় পদ্ধতিতেই চামড়া সংরক্ষণ করে। পরে তা পাচারকারী চক্রের সাহায্যে বিদেশে পাঠায়। তবে স্থানীয়ভাবে একটি বাঘের চামড়ার জন্য শিকারিরা দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পেলেও বিদেশে একটি চামড়া ১০ লাখ টাকায় বিক্রি হয় বলে সূত্র জানায়।

জানা যায়, সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণ শিকারের অন্যতম সদস্য বেলায়েত তালুকদারের কাছ থেকে ২০০৪ সালে নয় ফুট এক ইঞ্চি লম্বা ও তিন ফুট চওড়া একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের চামড়া উদ্ধার করা হয়। চামড়াটিতে কমপক্ষে পাঁচটি গুলির দাগ ছিল। ওই বছরই পুলিশ সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের শরণখোলা উপজেলার রাজৈর গ্রাম থেকে বাঘ ও হরিণ পাচার চক্রের নেতা আব্দুল মতিন গাজীকে হরিণের শিং ও অন্যান্য প্রাণীর অঙ্গ প্রত্যঙ্গসহ আটক করেছিল। সে সময় দুটি বাঘ ও ১৩টি হরিণের চামড়াসহ তার সহযোগীরা পালিয়ে যায়।

সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে একটি প্রাপ্তবয়স্ক বাঘের রহস্যজনক মৃত্যু হলে জেলেদের মাধ্যমে খবর পেয়ে গতবছর ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় সাতক্ষীরা রেঞ্জের বন-কর্মীরা চুনকুড়ি রাজাখালী খালের পাশ থেকে বাঘটির মৃতদেহ উদ্ধার করে।

প্রত্যক্ষদর্শী জেলে সাইফুল ও মমতাজকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে বন বিভাগের কর্মীরা দাঁত ও নখ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বাঘের অর্ধগলিত মৃতদেহ পান। স্থানীয়দের ধারণা, হরিণ শিকারি চক্রের পাতা ফাঁদে বাঘটির মৃত্যু হয়।

সাইফুল ও মমতাজ জানান, মাছ শিকারের সময় দুর্গন্ধ পেয়ে জঙ্গলের গহিনে ঢুকে বাঘের মৃতদেহটি দেখতে পান। ধারণা করা হচ্ছে বাঘটিকে জালে আটকে হত্যার পর দাঁত ও নখ নিয়ে গেছে শিকারিরা।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক এমএ হাসান জানিয়েছিলেন, বাঘ সাধারণত ১৩ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে। বয়সের কারণে বাঘটির মৃত্যু হয় বলে তাদের ধারণা।

সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাবাসী জানান, শিকারিদের হাত থেকে প্রাণীদের রক্ষা করতে বনবিভাগের কর্মকর্তারা তৎপর থাকলেও চোরা শিকারিরা মাছ বা কাঁকড়ার পাস নিয়ে বনে ঢুকে। তারপর জাল পেতে স্প্রিং বসানো ফাঁদ, বিষটোপ, কলার মধ্যে বড়শি ঝুলিয়ে এবং চেতনানাশক ঔষধ দিয়ে বিপুল সংখ্যক হরিণ শিকার করে। শিকারিদের শিকার করা হরিণের মাংস, চামড়া পাচার হচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। আবার হরিণের দুই থেকে চার কেজি মাংস পাঠিয়ে করা হয় নানা কাজের তদবির। হরিণের চামড়ারও কদর রয়েছে। একটি চামড়া পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা বিক্রি হয়।

   

About

Popular Links

x