Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদনে বাড়বে দেশের শুঁটকির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রোদে শুকানোর পরিবর্তে শুঁটকি উৎপাদনে ড্রায়ার প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করছে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৩, ১২:৩০ পিএম

খাদ্য হিসেবে মাছ খুবই জনপ্রিয় হলেও এটি দ্রুত পচনশীল। তাই মাছের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার নিশ্চিতের জন্য সংরক্ষণ করা জরুরি। এক্ষেত্রে শুঁটকি হিসেবে মাছ সংরক্ষণ বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি। রোদে শুকানো এই শুঁটকি ভোক্তারা অমৌসুমেও ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া শুঁটকি এই জনপদের রান্নাঘরের ঐতিহ্যবাহী রেসিপি।

তবে, স্বাস্থ্য এবং পরিচ্ছন্নতার প্রশ্নে শুঁটকি উৎপাদনের প্রচলিত প্রক্রিয়াটি বেশ ক্ষতিকরই বলা যায়। প্রচলিত পদ্ধতিতে মাছ সূর্যের তাপে শুকানো হয়, এর ফলে জীবাণুর আক্রমণ  ও পরিবেশে দূষণের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া এই পদ্ধতিতে শুঁটকি মাছকে মাছি ও অন্যান্য পোকামাকড় থেকে রক্ষা করার জন্য প্রায়ই ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহার করা হয়।

এক্ষেত্রে আশার আলো দেখিয়েছে সায়েন্স ল্যাবরেটরি নামে পরিচিত বাংলাদেশ বৈজ্ঞানিক ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)। প্রতিষ্ঠানটি মাছ শুকানোর জন্য প্রযুক্তি নির্ভর একটি পদ্ধতি সহজলভ্য করেছে, যার ফলে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে শুঁটকি উৎপাদন সম্ভব।

ছবি: রিয়াজ আহমেদ/ঢাকা ট্রিবিউন

বর্তমানে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৬ লাখ টন সামুদ্রিক তাজা মাছ ধরা হলেও তার মাত্র ২০% শুঁটকি হিসেবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়, যার বেশিরভাগই দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটায়। এছাড়া বছরে শুঁটকি রপ্তানি থেকে ২৫ লাখ মার্কিন ডলার দেশের অর্থনীতিতে যোগ হয়, যদিও তা চাহিদা এবং সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম।

শুঁটকি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ফিশ ড্রায়ার প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ভিয়েতনাম, ইকুয়েডর ও ভারতের মতো শুঁটকি রপ্তানিকারকদের শীর্ষ তালিকায় বাংলাদেশের নামও দেখা যাবে বলে আশা বিসিএসআইআর বিজ্ঞানীদের।

রোদে মাছ শুকানোর প্রধান সমস্যা হলো- এক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়াটি এবং পণ্যের গুণগত মান প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। পর্যাপ্ত পরিমাণ রোদ না পেলে সংরক্ষিত শুঁটকিতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। প্রতিকূল আবহাওয়ায় (বৃষ্টি, মেঘলা আবহাওয়া, সূর্যালোকের অভাব, ইত্যাদি) মাছ শুকানোর জন্য বেশ কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়, যা পণ্যের গুণগত মানকে প্রভাবিত করে। এছাড়া ধুলোবালি ও পোকামাকড়ের সংক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আর সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- উচ্চহারে কীটনাশক প্রয়োগ। অনেক শুঁটকি চাষি পোকামাকড়ের উপদ্রব এড়াতে কীটনাশক ব্যবহার করেন, যা পণ্যের গুণমান নষ্ট করে এবং মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।

বিসিএসআইআর এর ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ট্রান্সফার অ্যান্ড ইনোভেশন (আইটিটিআই) বিভাগের প্রধান মো. রেজাউল করিম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিসিএসআইআর যে প্রযুক্তি ব্যবহারে শুঁটকি চাষিদের উৎসাহিত করেছে, সেটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে শুঁটকি উৎপাদন সম্ভব, যা রপ্তানি প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে অনেক এগিয়ে নেবে।”

ছবি: রিয়াজ আহমেদ/ঢাকা ট্রিবিউন

এই প্রযুক্তিতে একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাছ শুকানো হয়। তাই রোদে শুকানোর ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা দেখা দেয়, সেগুলো এড়িয়ে পণ্যের পছন্দসই গুণমান বজায় রাখা সম্ভব হয়। এছাড়া, এই প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত শুঁটকি রোদে শুকানো শুঁটকির চেয়ে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়।

ড্রায়ার হলো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাছ শুকানোর যন্ত্র। এতে মাছ শুকানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের ড্রায়ার ব্যবহার করা হয় (ক্যাবিনেট ড্রায়ার, চু্ল্লী ড্রায়ার, টানেল ড্রায়ার, স্প্রে ড্রায়ার, সোলার টেন্ট ড্রায়ার ইত্যাদি)।

বিসিএসআইআর এর বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তিতে মাছ শুকানোর ক্ষেত্রে আল্ট্রা ভায়োলেট এক্সপোজার লাইটের প্রয়োগও দেখিয়েছেন, যার ফলে এসব মাছে রোগজীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। অন্যদিকে, রোদে শুকানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ও বাড়তি ওজনের জন্য চাষিরা প্রচুর পরিমাণে লবণ প্রয়োগ করেন, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

এখন পর্যন্ত এই প্রযুক্তি বিষয়ক প্রচারণার ফলাফল সম্পর্কে জানতে চাইলে মো. রেজাউল করিম বলেন, “চট্টগ্রামের কিছু শুঁটকি উৎপাদক ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে শুঁটকি উৎপাদনে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছেন। এছাড়া একজন উৎপাদক ড্রায়ার ও ইউভি লাইট স্থাপনের কাজ শুরু করেছেন।”

একটি আধুনিক ফিশ ড্রায়ার স্থাপনের জন্য ১৭ লাখ টাকা প্রয়োজন, তবে এই বিনিয়োগ বেশ লাভজনক। একজন চাষি বছরে ৩০ টন শুঁটকি উৎপাদন করতে পারেন। বিসিএসআইআর-এর বিজ্ঞানীরা বলছেন, রোদে শুকানোর পরিবর্তে ড্রায়ারের ব্যবহার করা হলে উৎপাদন খরচ অর্ধেকে নেমে আসবে। কারণ, এতে কম জনবল প্রয়োজন, কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় না। এছাড়া এই প্রক্রিয়াটি দ্রুত এবং স্বাস্থ্যসম্মত।

বাংলাদেশের কিছু নির্দিষ্ট উপকূলীয় এলাকায় এবং অভ্যন্তরীণ নিম্নভূমিতে মাছ শুকানো হয়, যেখানে আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা এবং পরিবহনের জন্য ভালো অবকাঠামো নেই। শুঁটকি উৎপাদনের ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রসিদ্ধ এলাকা হলো-সুন্দরবনের দুবলার চর, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, রাঙ্গাবালী, সোনাদিয়া দ্বীপ, মহেশখালী, কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সুনামগঞ্জের ইব্রাহিমপুর এবং জামালগঞ্জের যশোমন্তপুর।

বাংলাদেশে সাধারণত যেসব সামুদ্রিক ও স্বাদু পানির মাছ থেকে শুঁটকি উৎপাদন করা হয় তার মধ্যে রয়েছে লইট্টা (হারপোডন নেহেরিয়াস), ছুরি (লেপ্টুরাক্যান্থাস সাভালা), পুঁটি (পুনটিয়াস সারানা, পি. স্টিগমা), চাপিলা (গাদুসিয়া চাপরা), লাখুয়া (পলিনেমাস ইন্ডিকাস), রূপচাঁদা (পাম্পাস চিনেনসিস), এবং চিংড়ি (মেটাপেনিয়াস প্রজাতি এবং পেনিয়াস প্রজাতি)।

   

About

Popular Links

x