নতুন বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বোচ্চ ২০% মহার্ঘ ভাতার প্রস্তাব করা হচ্ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বিবেচনায় রেখে তাদের এই সুবিধা দেওয়া হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষ কীভাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে টিকে থাকবে?
২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দের খাতওয়ারি চূড়ান্ত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই মহার্ঘ ভাতার প্রস্তাব তুলে ধরার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন সংগঠনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই মহার্ঘ ভাতার ব্যাপারে একমত নীতি নির্ধারকরা। তারা বলছেন, ২০১৫ সালে নতুন পে স্কেল ঘোষণার হয়। এর পাঁচ বছর পর আবার পে স্কেল হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। আট বছর হয়ে গেছে। সেই কারণেই এই মহার্ঘ ভাতার প্রস্তাব। তবে তারা এই সময়ে প্রতি বছর শতকরা পাঁচ ভাগ হারে ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশে সরকারি চাকরিজীবী প্রায় ১৪ লাখ। তবে বিভিন্ন কর্পোরেশন এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকসহ এই সংখ্যা প্রায় ২২ লাখ। চলতি অর্থবছরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা খাতে ৭৩,১৭৩ কোটি টাকা লাগছে। আগামী অর্থবছরে বেতন-ভাতা বাবদ ৭৭,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের খসড়া তৈরি করেছে অর্থ বিভাগ। মহার্ঘ ভাতা দেওয়া হলে এর পরিমাণ আরও ২০% বাড়বে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাবদ মোট বাজেটের ২২-২৮% ব্যয় হয়। আর গত এক দশকে তাদের বেতন ভাতা বাবদ সরকারের খরচ বেড়েছে ২২১%।
সর্বশেষ জনশুমারি বলছে, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। সেই হিসেবে সরকারি চাকরিজীবীরা দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১.৫%-এরও কম।
এপ্রিল মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৩৩%। এই বছরই মূল্যস্ফীতি রেকর্ড ছাড়িয়েছে। আর খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি আরও বেশি। সিপিডির জরিপ বলছে, ঢাকায় চার সদস্যের পরিবারের জন্য মাসে সাধারণ খাদ্য খরচই এখন ২২,০০০ টাকা। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারকে এখন তাদের মোট আয়ের ৬০% খরচ করতে হয় সাধারণ খাবারের পেছনে। তবে মাছ-মাংস খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দিলে মাসে খরচ দাঁড়ায় ৭,১৩১ টাকা।
আর এই সময়ে বিবিএসের দুইটি জরিপ দেশে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী, তা প্রকাশ করছে। বিবিএস বলছে দেশে দারিদ্র্য কমলেও আয় বৈষম্য বাড়ছে। সম্পদ কিছু মানুষের হাতে চলে যাচ্ছে।
আর ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব-এর ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট ২০২২ অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশের মোট জাতীয় আয়ের ১৬.৩% ছিল কেবল ১% লোকের হাতে। দারিদ্র্যসীমার নিচের অর্ধেকের হাতে ছিল মাত্র ১৭%।
বেকারত্ব বাড়ছে
বিবিএস বলছে, বাংলাদেশে মাত্র তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) বেকারত্ব বেড়েছে দুই লাখ ৭০ হাজার। বিবিএস এই ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ প্রকাশ করে ২ এপ্রিল।
এ বছরের মার্চ মাস শেষে দেশে মোট বেকার ছিলেন ২৫ লাখ ৯০ হাজার। আর গত বছরের ডিসেম্বর শেষে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৩ লাখ ২০ হাজার।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন বলেন, ‘‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সব শ্রেণি বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষকে সবচেয়ে বেশি চাপে রেখেছে। সরকারি চাকরিজীবিরা মহার্ঘ ভাতা পাবেন এটা নিয়ে বলার কিছু নাই। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষ যাতে দ্রব্যমূল্যের চাপের মুখে উপকৃত হয় সরকারের সেই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সরকার এই পরিস্থিতিতে সবাইকে সাশ্রয়ী হতে বলছেন। সেটাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। সাশ্রয় যেন সবার জন্য হয়।”
তার মতে, ‘‘ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য বাড়াতে সবসময় অজুহাত খোঁজেন। এখন সরকারি চাকুরেদের মহার্ঘ ভাতা দিলে তাদের বেতন বাড়বে। এই অজুহাত দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা আরও এক দফা দাম না বাড়িয়ে দেয়। সেটা হলে চাপ সাধারণ মানুষকেই নিতে হবে। সরকারের এটাও খেয়াল রাখা দরকার।”
‘‘আসলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাজারকে যৌক্তিভাবে মনিটরিং করা। সেটা সরকার করছে না। করলে দেশের সব মানুষ উপকৃত হতো,” মনে করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অর্থনীতির অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘‘সরকারি কর্মচারীদের এই মহার্ঘ ভাতা পাওনা হয়ে গেছে। কারণ পাঁচ বছর পরপর তাদের নতুন পে স্কেল পাওয়ার কথা থাকলেও তা তারা পাননি। কিন্তু কোভিড মহামারি এবং তারপরে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে এখন দ্রব্যমূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি তার প্রভাব শুধু সরকারি কর্মচারী নয়, দেশের সব শ্রেণির মানুষের ওপর পড়ছে।”
তার কথা, ‘‘নিম্নবিত্ত এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ কষ্টে আছে। তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যে সাপোর্ট, যে সামাজিক নিরাপত্তা পাওয়ার কথা ছিল তারা সেটা পাচ্ছে না। এজন্য যে পরিমাণ কর আদায় করা দরকার ছিল রাজস্ব বোর্ড সেটা পারছে না। কর আদায়ে তাদের অদক্ষতা আছে। আবার কাদের সহায়তা প্রয়োজন তার জরিপও করতে পারেনি বিবিএস। প্রধানমন্ত্রী যখন ৫০ লাখ মানুষকে অর্থ সহায়তা দিতে চাইলেন তখন ৩৫ লাখের বেশি মানুষ পাওয়া যায়নি।”
তার কথা, ‘‘দারিদ্র্য কাঙ্ক্ষিত হারে কমছে না। বেকারত্ব কমছে না। আয় বৈষম্য বাড়ছে। সব মিলিয়ে একটি খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীরা মহার্ঘ ভাতা পেলেও তাতে দেশের অধিকাংশ মানুষের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।”
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘মূল্যস্ফীতির অনেক কারণ আছে। তার মধ্যে একটি অংশের আয় বেড়ে গেলেও দ্রব্যমূল্য বেড়ে যেতে পারে।”
আগামী ১ জুন ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের বাজেট পেশ করা হবে। এবার বাজেটের আকার হবে ৭ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকার। চলতি বাজেট ছয় লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার।



