Tuesday, May 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কেন শিশুশ্রমের অবারিত ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়

বিবিএস-এর এক সমীক্ষা বলছে, শ্রমে নিযুক্ত শিশুরা শিক্ষালাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশের প্রায় ১৮ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৩, ০৩:৫৭ পিএম

দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখার কথা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর। আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা এবং আইন মানার প্রবণতা তৈরির পাশাপাশি চর্চার প্রধান ক্ষেত্র হওয়ার কথা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলো। কিন্তু এ বিষয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।

বাংলাদেশের শিশু আইন-২০১৩ অনুসারে, অনুর্ধ্ব ১৮ (আঠার) বছর বয়স পর্যন্ত সবাই শিশু হিসেবে গণ্য হবে। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এ বলা হয়েছে, শিশুদের ন্যূনতম বয়স ১৪ বছর। এর কম বয়সীদের কাজে নিয়োগ করা যাবে না। শিশুর অভিভাবক কাজ করানোর জন্য কারও সঙ্গে কোনো প্রকার চুক্তি করতে পারবেন না।

কিন্তু এই আইনের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সেবাদাতা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সিংহভাগ কাজ করছে শিশুরা। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সামান্য ভ্রুক্ষেপও নেই। তারা বলছেন, এটি তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করে ১৩ বছর বয়সী শাহিন। ঢাউস একটা ফ্লাস্কে প্রতিদিন মায়ের বানানো চা নিয়ে সে ঘোরে আর হাঁক দেয়, “চা খাবেন...চাআআআ...”। মাদ্রাসায় ভর্তি হলেও দরিদ্র পরিবারের শিশুটির শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা করা হয়নি। এই দৃশ্য কোনো ব্যতিক্রম দৃশ্য নয়। নানা কাজের সঙ্গে শিশুরা যুক্ত হয়ে তাদের পড়ালেখার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

চা বিক্রেতা শিশু শাহিনের দৈনিক আয় ২০০ টাকার মতো। বিকেল হলে গুটি গুটি পায়ে তার মতো অনেককেই দেখা যায় ফ্লাস্ক নিয়ে ঘুরে বেড়াতে। জাবি ক্যাম্পাসে আরও অনেক শিশুকেই দেখা যায় বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের খাবারের দোকানগুলোতেও কাজ করে অনেক শিশু-কিশোর।

মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালীন সময় থেকেই শাহিন জাবিতে ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করত। মায়ের সঙ্গে ক্যাম্পাস সংলগ্ন আমবাগান এলাকায় থাকে সে। শাহিনের বাবা ময়মনসিংহে রিকশা চালান আর মা সাভারে গৃহকর্মীর কাজ করেন।

প্রতিদিনের উপার্জন মায়ের হাতে তুলে দেয় শাহিন। পড়াশোনার ইচ্ছা আছে কি-না জানতে চাইলে জানায়, কিছুদিন পর স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য সে বাবার কাছে চলে যাবে।

শিশুশ্রম/ঢাকা ট্রিবিউন

তেমনই আরেকজন হাওয়াই-মিঠাই বিক্রেতা পলাশ। ১৪ বছর বয়সী এই কিশোর পড়াশোনা ছেড়েছে বেশ আগেই। জানতে চাইলে পলাশের সরল উক্তি, “ক্লাশ সিক্স পর্যন্ত লেখাপড়া করেছি। এরপর আর ভালো লাগেনি।”

জাবিতে ব্যাটারিচালিত রিকশায় খাবার ডেলিভারির কাজ করে আরাফাত। ১৪ বছর বয়সী এই কিশোরের পড়াশোনা থেমে যায় পঞ্চম শ্রেণিতে। তারপর পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। কারণ জানতে চাইলে তার মুখে ছিল একরাশ নীরবতা।

১৮ বছর বয়সী শাকিব জানায়, সে একসময় ভেলপুরির দোকানে কাজ করত। এখন বাদাম বিক্রি করে। পড়াশোনার প্রসঙ্গে সে জানায়, সে কখনোই লেখাপড়া করেনি। তবে কিছুদিন মাদ্রাসায় গিয়েছিল। মারধরের কারণে ছেড়ে চলে আসে।

জাবি ক্যাম্পাস একটি উদাহরণমাত্র। দেশের প্রায় সবগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস কিংবা সংলগ্ন এলাকায় হরহামেশা চোখে পড়ে শিশুশ্রম। এ যেন এক অদ্ভুত-অলিখিত-বিস্ময়কর বৈষম্য। মানুষ গড়ার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠেই কিছু শিশু ব্যস্ত ভাগ্যান্বেষণে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক সমীক্ষা বলছে, শ্রমে নিযুক্ত শিশুরা শিক্ষালাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশের প্রায় ১৮ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত। এই শিশুরা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না।

শিশুশ্রম/ঢাকা ট্রিবিউন

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, “যারা ব্যবসা করে, কর্তৃপক্ষ তাদের অনুমোদন দেয়। তবে ব্যবসায়ীরা কাদের নিয়োগ দেবেন সেটা আমাদের বিষয় নয়। সুতরাং এখানে যারা কাজ করে তাদের তথ্য-উপাত্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে নেই। এছাড়া যেসব শিশু ক্যাম্পাসে বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করে তাদের সঙ্গেও আমাদের কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। তাই তারা কখন আসে, কখন যায় সে ব্যাপারেও আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। অনেকেই আছে কিছুদিন কাজ করে চলে যায়, আর ফিরে আসে না।”

তিনি আরও বলেন, “অনানুষ্ঠানিকভাবে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা অনেকেই এই শিশুদের বিনা খরচে পড়ায়। ‘তরী' নামের একটি সংগঠন অনেকদিন ধরেই ক্যাম্পাসে কাজ করে। আবার অনেক শিক্ষকই ব্যক্তিগতভাবে এসব কাজে সহযোগিতা করেন।”

“তরী”র সাধারণ সম্পাদক সাগর কুমার বর্মণ বলেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠানটি ২০০৮ সাল থেকে শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই এখানে পড়ায়। শিশুরা বেশ আনন্দের সাথে পড়াশোনা করে। বর্তমানে প্রায় ১০০ জন শিশুর নিবন্ধন করা হয়েছে এবং ৫০ জনের মতো প্রতিদিন উপস্থিত থাকে। তবে তাদের লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করাতে আমরা সর্বদা সচেষ্ট।”

জাবি কর্তৃপক্ষ মনে করে, পড়াশোনা বাদ দিয়ে শিশুদের কর্মজীবনে ঢুকে পড়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। তবে ক্যাম্পাসে এসব কাজ বন্ধে পদক্ষেপ নিলে তাদের জীবিকাও হুমকির মুখে পড়ে।

প্রক্টর বলেন, “আমাদের প্রথম আর প্রধান দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এসব শিশুরা অনেক সময় অপরাধে জড়ায়। তাদের কারণে আমাদের শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো বিপদে না পড়ে, সেটি নিয়েও আমরা উদ্বিগ্ন।”

About

Popular Links