Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ঢাকার জলাবদ্ধতা: কোটি কোটি টাকা জলেই যাচ্ছে

বিশেষজ্ঞদের মতে নতুন প্রকল্প গ্রহণের চেয়ে ড্রেনগুলোর পয়ঃনিষ্কাশন ও রক্ষণাবেক্ষণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ
আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২১, ০৯:৫৭ পিএম

সরকারি তহবিল থেকে কোটি কোটি টাকা খরচের পরেও সমন্বয়হীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দুটি ড্রেন থাকার পরেও ২০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে এ বছরের শুরুতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের নিচে একটি নতুন ড্রেনেজ পাইপ বসায়। যা কর্তৃপক্ষের অকার্যকর পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম।

নতুন পাইপলাইনে বৃষ্টির পানি প্রথমে সাত মসজিদ রোডের নিচে থাকা প্রধান পাইপলাইনে যায়, পরে সেখান থেকে যায় কাটাসুর খালে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং ড্রেনে ফেলা আবর্জনার কারণে মূল লাইনের পথটি নিয়মিত আটকে থাকে। এ কারণে জলাবদ্ধতা সমস্যার কোনো সমাধান আসেনি।

গত বর্ষা মৌসুমে ডিএসসিসি ড্রেন পরিষ্কার করলেও ড্রেনের একটি অংশ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অধীনে রয়েছে। দুই সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে ওই অংশটি আটকে রয়েছে। এ কারণে নতুন স্থাপিত পাইপলাইনের কোনো সুফলই পায়নি এলাকাবাসী।

লালমাটিয়ার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম জানান, তিনি গত এক দশকে ৩ বার এই একই সড়কে ড্রেন নির্মাণের কাজ দেখেছেন। প্রতিবারই সমস্যার সমাধান হওয়ার কথা শুনলেও বর্ষার মৌসুমে জনদুর্ভোগ থেকেই যায়।

১৯৯১ সাল থেকে রাপা প্লাজা থেকে শংকরের মাঝের ১ কিলোমিটার এলাকায় তিনটি পাইপলাইন নির্মাণে  ঢাকা ওয়াসা এবং তৎকালীন অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ৫০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয় করে।

ঢাকা ওয়াসার পরিচালক প্রকৌশলী একেএম শহীদ উদ্দিন বলেন, “নতুন পাইপলাইনগুলো বসানোর পর সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করা হলে কোনো সমাধান আসবে না। ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি একই সঙ্গে ড্রেনগুলো ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না করলে জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকে মানুষ মুক্তি পাবে না।”

ঢাকা ওয়াসা জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কাছে সরকার ড্রেন ও খাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব হস্তান্তর করে।

বিখ্যাত স্থপতি এবং নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন,  “নতুন পাইপলাইন স্থাপনের চেয়ে রক্ষণাবেক্ষণ কম খরচের হলেও জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য ঢাকা ওয়াসা সবসময় নতুন প্রকল্পের ব্যাপারেই বেশি মনোযোগী।”

তিনি আরও বলেন, “নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আর্থিক সুবিধার সুযোগ এনে দেয় বলে এখন সিটি কর্পোরেশনগুলোও ড্রেন পরিষ্কারের পরিবর্তে নতুন প্রকল্পগুলোর ব্যাপারে বেশি মনোযোগী।”

ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রাস্তার নিচের এক কিলোমিটার ড্রেন বাস্তবায়নে ঢাকা ট্রিবিউন অসঙ্গতি খুঁজে পায়। ড্রেনটি নির্মাণের জন্য ২০১৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ডিএসসিসি একটি টেন্ডার দেয় এবং এই প্রক্রিয়ায় একটি প্রতিষ্ঠান একাই অংশ নেয়। রি-টেন্ডার না করে ডিএসসিসি সেই প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়। এছাড়া, চুক্তি সইয়ের পর কাজের ধরনেও পরিবর্তন আনা হয়।

প্রাথমিকভাবে আরসিসি ধরনের ড্রেন স্থাপনের পরিকল্পনা করা হলেও পরবর্তীতে কংক্রিটের পাইপলাইন বসানো হয়।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. খায়রুল বাকেরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে অসঙ্গতি বা পরিকল্পনা পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তিনি বলেন, “তৃতীয় পাইপলাইন স্থাপন যৌক্তিক হলেও ডিএনসিসির সঙ্গে সমন্বয় করে ড্রেন পরিস্কার কার্যক্রম পরিচালিত না হওয়া পর্যন্ত জনগণ উপকৃত হবে না।”

প্রকল্পের মূল তত্ত্বাবধায়ক খায়রুল জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে আরও প্রকল্প নেওয়া হবে।

জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে যত খরচ

জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ঢাকা ওয়াসা ২০০১ সালে ১৪৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নেয়। ২০৩ কোটি টাকার প্রকল্পটি ২০১১ সালে শেষ হলেও কিন্তু পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে সেই প্রকল্পের প্রভাব ছিল খুবই নগণ্য।

প্রকল্পটির তীব্র সমালোচনা করে ইমপ্লিমেন্টেশন মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন ডিভিশন (আইএমইডি) একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। সেখানে পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় উপাদান ব্যবহার না করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পটি আইএমইডি দ্বারা অকার্যকর বলে বিবেচিত হলেও ২০১৩ সালে ঢাকা ওয়াসা ২৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় দফায় একই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। তবে জলাবদ্ধতার সমস্যার কোনো সমাধান আসেনি।

এ প্রকল্প ছাড়াও ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি যৌথভাবে ১৫৪ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।  এ সময়ে ঢাকা ওয়াসা, ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি ৪০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করে।

বাজেট বাড়িয়ে দুই সিটি করপোরেশন ২০১৯-২০ অর্থবছরে ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের উন্নয়নে ২৯৪ কোটি টাকা ব্যয় করে। তবে জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসন না হওয়ায় বাজেট বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে জলাবদ্ধতা প্রবণ এলাকার সংখ্যাও।

দুই সিটি কর্পোরেশনের নথিপত্র অনুযায়ী, বর্তমানে জলাবদ্ধতার প্রধান কেন্দ্রসংখ্যা ৪৮। ২০১৮ সালেও এই সংখ্যা ছিল ২৫ এর নিচে।

ধানমন্ডি, জিগাতলা, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরসহ প্রধান ১৩টি পয়েন্টে জলাবদ্ধতা নিরসনে  ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা ওয়াসা গত বছর আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। জুন এবং জুলাইয়ে ওই এলাকাগুলো এলাকা পরিদর্শন করে দেখা যায়, বর্ষার সময়ে ওই এলাকাগুলো এখনও পানিতে ডুবে থাকে।

২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রধান তিন সংস্থা ১২৭৮ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। 2019-2020 অর্থবছরে কর্তৃপক্ষ একাই ৮৬২ কোটি ৯১ লাখ ব্যয় করে। ২০১২-১৩ অর্থবছরের তুলনায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যয় বেড়েছে ৫ গুণ।

গত বছর ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে দুই সিটি কর্পোরেশনই তাদের বাজেটে জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতি বেশি জোর দিচ্ছে।

ডিএসসিসির মেয়র ব্যারিস্টার শেখ তাপস জানান, ঢাকা থেকে জলাবদ্ধতা নিরসনে তারা ইতোমধ্যে ১০৩ কোটি টাকার কার্যক্রম শুরু করেছে।

তিনি আরও জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে ডিএসসিসির অধীনে ড্রেন ও খাল উন্নয়নের জন্য ৯৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছেন।

একইভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ডিএনসিসি ১২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে।

বিপুল খরচের পরেও যে কারণে প্রকল্প ফলপ্রসূ হচ্ছে না

জলাবদ্ধতা দূরীকরণ নিশ্চিতে বিশেষজ্ঞরা তিনটি জিনিসের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সেগুলো হলো ড্রেনগুলোর মাধ্যমে খালগুলোতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, খালে পানির প্রবাহ বজায় থাকা নিশ্চিত করা এবং ভারি বৃষ্টির সময়ে নদীতে পানি সেচের কাজ করা।

কঠিন বর্জ্য পদার্থ থেকে শুরু করে প্লাস্টিক পর্যন্ত ড্রেনে ফেলে দেওয়ার কারণে ঢাকার বেশির ভাগ ড্রেনের পানির প্রবাহ আটকে থাকে।

কমডোর রাজ্জাক (অব.) বলেন “ড্রেনেজ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ না করেই কর্তৃপক্ষ নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে। তবে সময়মতো ড্রেন পরিষ্কার না করলে যত প্রকল্পই নেওয়া হোক না কেন, জলাবদ্ধতার সমস্যা কখনোই দূর হবে না।”

রাজধানী থেকে জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে ডিএনসিসি এবং ডিএসসিসি উভয়ই এ বছরের জানুয়ারি থেকে খাল ভরাট ও পরিষ্কারের জন্য ব্যাপক অভিযান শুরু করে। কিন্তু খালগুলোতে যদি মানুষজন ক্রমাগত বর্জ্য পদার্থ ফেলতে থাকলে তাহলে আবর্জনা অপসারণ করে কোনো লাভ হবে না।

এ বিষয়ে ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, “যারা খালে ময়লা আবর্জনা ফেলে, সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে তাদেরকে চিহ্নিত করে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শিগগিরই খালের পাড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর কাজ শুরু হবে।”

   

About

Popular Links

x