Wednesday, July 22, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বাজার থেকে সিসাযুক্ত হলুদ অপসারণে কতটুকু সফল বাংলাদেশ

  • মাটি থেকেও সিসা হলুদে প্রবেশ করতে পারে
  • বিভিন্ন সময় জরিমানা করা হয়েছে ব্যবসায়ীদের
  • সিসাযুক্ত হলুদ শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর
আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৩, ০১:৩৩ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক জেনা ফোরসিথ এবং পানি ও পয়নিঃষ্কাশন বিশেষজ্ঞ স্টিফেন লুবি বাংলাদেশে হলুদে সিসার উপস্থিতি নিয়ে কাজ করেন। লুবি তার গবেষণায় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে গর্ভবতী নারী এবং শিশুদের রক্তে উচ্চমাত্রার সিসার উপস্থিতি রয়েছে বলে ধারণা করেন। পরবর্তীতে ফোরসিথ পরীক্ষা করে হলুদে সিসার মিশ্রণের বিষয়ে নিশ্চিত হন।

ফোরসিথের এই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালে। ফোরসিথ এবং তার সহযোগী গবেষকরা কেবল ল্যাবরেটরিতেই নয়, সরেজমিনে বাংলাদেশের বিভিন্ন কল-কারখানা পরিদর্শন করে বিষয়টি নিশ্চিত হন। তারা বিষয়টি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে জানান। প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন চেয়ারম্যান সৈয়দা সারোয়ার জাহান এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেন এবং বাজার থেকে সিসাযুক্ত হলুদ অপসারণে সক্ষম হন।

আশ্চর্যের ব্যাপার হলেও সত্যি, একটি ছোট গবেষণায় বাংলাদেশে গর্ভবতী নারীদের রক্তে সিসা আইসোটোপের উপস্থিতি সম্পর্কে প্রথম তথ্য পাওয়া যায়। গবেষকরা ভুক্তভোগীদের রক্ত পরীক্ষা করে দেখেন এই সিসার প্রধান উৎস হলো হলুদ।

গবেষকদের মতে, মাটি থেকেও সিসা হলুদে প্রবেশ করতে পারে। তবে বাজারের বেআইনিভাবে হলুদে সিসা রঞ্জক দেওয়া হয়। জনসচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ফোরসিথের নতুন গবেষণার ফলাফল প্রচারিত হয়। সিসার ক্ষতি সম্পর্কে বোঝাতে গবেষকরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও কথা বলেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরিচালক ড. সহদেব চন্দ্র সাহা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা যখনই জানতে পারি বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ শুরু করি। পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আমরা হলুদে সিসা পাওয়ার বিষয়টি প্রচার করি। যেসব নমুনায় আমরা সিসা পেয়েছি, তা সঙ্গে সঙ্গে বাজার থেকে বাতিল করে দেওয়া হয়।”

সরকারের পদক্ষেপ

২০১৯ সালে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ দেশের বৃহত্তম পাইকারি মসলার বাজার শ্যামবাজারে নোটিশ দেয়। সিসার ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সতর্ক করা হয় এবং সিসাযুক্ত হলুদ বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

অভিযানে প্রায় দুই হাজার পাউন্ড হলুদ জব্দ করা হয় এবং দুই পাইকারি বিক্রেতাকে আট লাখ টাকারও বেশি জরিমানা করা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সিসার কোনো নিরাপদ মাত্রা জানা নেই। তুলনামূলকভাবে সিসার যে মাত্রা একসময় “নিরাপদ” বলে বিবেচিত হতো তা শিশুদের জন্য ক্ষতিকর। এটি তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

সিসা একটি শক্তিশালী নিউরোটক্সিন। সামান্য মাত্রার সিসাও শিশুদের মানসিক বিকাশ ও মনোযোগ ধরে রাখতে বাধা দেয়। সিসার প্রভাব শিশুদের ভবিষ্যতে আগ্রাসী ও অপরাধমূলক কার্যকলাপকে ত্বরান্বিত করে। এর ক্ষতিকর প্রভাবের ঝুঁকি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এই ধাতুর প্রভাবে স্নায়ুবিক বৈকল্য, মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি এবং এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও রয়েছে।

এ বিষয়ে ড. সহদেব চন্দ্র সাহা বলেন, “সীসা মা ও শিশুর উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। সীসা শিশুদের মস্তিস্কের বেশি ক্ষতিসাধন করে। শিশুদের বিকাশে সমস্যা হয়। সেইসাথে শিশুদের ভুলে যাওয়ার রোগ হয়। ”

২০১৯ সালের শেষের দিকে, হলুদে সিসা ব্যবহারের বিরুদ্ধে অভিযানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার কপি সতর্কতামূলক পোস্টার বিতরণ করে।

হাতের আঙুলকে খুব উজ্জ্বল ও হলুদাভ করে তোলে এবং হাত থেকে সহজে না সরে, এমন হলুদের বিষয়ে জনগণকে সতর্ক করেছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।

গবেষকদের অনুসন্ধান

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং আইসিডিডিআর,বির খোঁজ নিয়ে দেখেছে, হলুদকে ক্রেতার কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য এতে সিসা ব্যবহার করা হয়। আশার কথা হলো, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে হলুদে সিসার ব্যবহার বন্ধ হয়েছে। ২০১৯ সালে যেখানে বাজারজাত হলুদের ৪৭%-এ এই ধাতুর উপস্থিতি ছিল। ২০২১ সালে তা শুন্যে নেমে এসেছে।

ড. সহদেব আরও বলেন, “এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা সর্বদা সচেষ্ট। খাবারে এমন রাসায়নিক বিষক্রিয়ার খবর পেলে আমরা অবশ্যই যথাযথ পদক্ষেপ নেব, এটি আমাদের দায়িত্ব। এমন যেকোনো পরিস্থিতির বিষয়ে গণমাধ্যমের কাছ থেকে কোনো তথ্য পেলে আর তা সত্য প্রমাণিত হলে সে বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

যা বলছেন ভোক্তারা

সচেতন ভোক্তা সমাজের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদের সাথে এ বিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন, “আমাদের দেশে কীটনাশক আমদানি করা হয়। এ কীটনাশক পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে এতে সিসা ছাড়াও অনেক হেভি মেটাল আছে।  ২০১৯ সালে গবেষণার পর পরই বাজার থেকে হলুদ অপসারণ করা হয়েছিল। তাৎক্ষণিকভাবে তখন (২০১৯) বাজার থেকে হলুদ অপসারণ করা হলেও বর্তমানে হলুদে সিসা পাওয়া যেতে পারে। আমাদের কীটনাশক পরীক্ষা করে ব্যবহার করা দরকার। কেননা, কীটনাশক আমাদের মাটি এবং পানিকে প্রভাবিত করে।  সেইসাথে হলুদ ছাড়াও আমাদের অন্যান্য খাদ্যকেও প্রভাবিত করে। আমাদের আরও সচেতন হতে হবে।”

   

About

Popular Links

x