সাভারের আশুলিয়ায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এলাকাবাসীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। রবিবার বিকেল থেকে শুরু হয়ে রাত পর্যন্ত চলা দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ৬ নভেম্বর থেকে ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
রবিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে ক্যাম্পাসসংলগ্ন চান্দগাঁও এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এরপর মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোকজন জড়ো স্থানীয়রা ক্যাম্পাসের একাডেমিক ভবনে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি ওই এলাকার কয়েকজন ব্যক্তির মারধরে বিশ্ববিদ্যালয়টির বস্ত্র প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. হাসিবুল ইসলাম ওরফে অন্তর (২২) নিহত হন। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের দাবিতে রবিবার বিকেলে ক্যাম্পাসসংলগ্ন সড়কে মানববন্ধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।সেখান থেকেই সংঘর্ষের ঘটনার সূত্রপাত হয়।
তথ্য বলছে, ওই এলাকার কয়েকটি দোকান দফায় দফায় বন্ধ করে দেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক শিক্ষার্থীদের দাবি বাস্তবায়ন না করা নিয়ে অসন্তুষ্টি ও মাইকে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিষয়ে উস্কানিমূলক বার্তা প্রচার। মূলত এই তিন কারণেই রবিবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা জানান, গত ২৭ অক্টোবর কয়েকজন ব্যক্তির মারধরে শিক্ষার্থী হাসিবুল ইসলাম ওরফে অন্তর আহত হন। ২ নভেম্বর তার মৃত্যু হয়। এরপর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম হয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে সহপাঠী হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তি, প্রক্টরের পদত্যাগ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিহত শিক্ষার্থীর নামে স্থায়ী কোনো স্থাপনার দাবি জানান।
এসব দাবির বিপরীতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। অন্যান্য দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নেরও আশ্বাস দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এরপর রবিবার সন্ধ্যায় শিক্ষার্থীরা সামগ্রিক বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অনুমতি চান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালকের অপসারণের নতুন দাবি জানান।
শিক্ষার্থীরা জানান, বেশ কিছু দাবি নিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে জড়ো হন। কিন্তু প্রশাসন এই বিষয়ে কোনো সাড়া না দিলে তারা বিক্ষুব্ধ হন। এমন সময় খবর আসে ক্যাম্পাসে স্থানীয়রা হামলা চালিয়েছে।এ সময় স্থানীয়দের হামলায় ৮-১০ জন শিক্ষার্থী আহত হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন চান্দগাঁও সড়কের দুই পাশে ৭০-৮০টি দোকান রয়েছে। এরমধ্যে ৫৫-৬০টি দোকানেই ভাঙচুর চালানো হয়েছে। বেশিরভাগ দোকানের শাটার ভাঙা ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। বেশ কয়েকটি দোকানের ভেতরে মালামালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, সহপাঠীর মৃত্যুর পর থেকে ওই দোকানগুলো বন্ধ রাখতে বলেন শিক্ষার্থীরা। রবিবার বিকেলে মালিকরা তাদের বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, অন্তরকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে আকরান গ্রামে। তাই চান্দগাঁওয়ের দোকানগুলো যেন খুলতে দেওয়া হয়। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিতে থাকেন। কয়েকজন শিক্ষার্থী চায়ের দোকানের কাঠের বেঞ্চ ভেঙে সড়কে আগুন জ্বালিয়ে দেন। কিছু শিক্ষার্থী কয়েকটি দোকানের শাটারে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ক্যাম্পাসে পাঠিয়ে দেন।
স্থানীয়রা অভিযোগ, ক্যাম্পাসে গিয়ে শিক্ষার্থীরা আবার জড়ো হয়ে এলাকাবাসীদের পাল্টা ধাওয়া দেন। এলাকাবাসীও লাঠিসোঁটা নিয়ে পাল্টা ধাওয়া দেন। পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার সময় দোকানপাট ভাঙচুর করা হয়। স্থানীয়রাও বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি ভবনের জানালার কাচ ভাঙচুর করেন। এরপর শিক্ষার্থীরা ফের ধাওয়া দিলে স্থানীয় মসজিদের মাইকে শিক্ষার্থীরা এলাকাবাসীর ওপর হামলা চালিয়েছেন জানিয়ে প্রতিরোধের জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এতে আরও এলাকাবাসী জড়ো হন। পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
চান্দগাঁও বাজারের কয়েকটি দোকানের মালিক নাসির উদ্দিন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “শিক্ষার্থীরা এসে আমার দোকানে প্রথম আক্রমণ করে। এরপর দুই ঘণ্টা ধরে সব দোকান ভাঙচুর করে। চেয়ার-টেবিলে আগুন দেয়।”
চান্দগাঁও মোল্লা মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শাহরিয়ার সুমন জানান, শিক্ষার্থীরা ৭০টি দোকান ভাঙচুর করেছেন।
তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হয়েছে। সর্বমোট ১ কোটি ৮১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে আন্তরিক হলে ব্যবসায়ীরাও তাদের পাশে থাকবেন।”
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ব্যবসা প্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এজাজ উর রহমান জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চার সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।



