Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

জাবির আবাসিক হলে হাজারের বেশি অছাত্র, নবীনদের দুর্ভোগ

  • কেউ কেউ ছাত্রত্ব শেষ হবার পরে তিন চার বছর পর্যন্তও হলে অবস্থান করেন
  • অধিকাংশই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত
আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:৫২ পিএম

নতুন নতুন আবাসিক হল নির্মাণ করেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) আবাসন সংকট নিরসন করা যাচ্ছে না। আবাসিক হলে আসন সংখ্যার প্রায় সমান সংখ্যক শিক্ষার্থী থাকলেও নবীন শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরেও অনেকে হলে অবস্থান করার কারণে আসন সংকট নিরসন হচ্ছে না। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা এক্ষেত্রে বেশি অনিয়ম করেন। কেউ কেউ ছাত্রত্ব শেষ হবার পরে তিন চার বছর পর্যন্তও হলে অবস্থান করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্যমতে, বর্তমানে ১৯টি আবাসিক হল চালু রয়েছে। হলগুলোতে আসন রয়েছে ১২,৩৬২টি। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১২,৫৩৩ জন শিক্ষার্থী আছেন। আরও দুটি হল নির্মাণ করা হলেও সেগুলো চালু করা হয়নি। হল দুটি চালু হলে আসন সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ১৪,৩৬২টি।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত অছাত্রদের মাধ্যমেই নানা সময়ে ক্যাম্পাসে ঘটছে অনাকাঙি্ক্ষত ঘটনা। সর্বশেষ গত ৩ ফেব্রুয়ারি ৪৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান এক দম্পতিকে ডেকে নিয়ে মীর মশাররফ হোসেন হলের একটি কক্ষে স্বামীকে আটকে স্ত্রী ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার পর ক্যাম্পাসে অছাত্রদের বের করতে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ ২০১৮-এর ৫ (ট) ধারা অনুযায়ী, স্নাতকোত্তর চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ছাত্রছাত্রীরা পরীক্ষা সমাপ্তির সাত দিনের মধ্যে তাদের পরিচয়পত্র, চিকিৎসা ও গ্রন্থাগার কার্ড ফেরত দিয়ে নিজ নিজ আবাসিক হল ত্যাগ করবেন। একই ধারায় এ বিধি অমান্য করার শাস্তি হিসেবে উল্লেখ আছে, যারা এ বিধি অমান্য করবেন, তাদের ফল প্রকাশ স্থগিত থাকবে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৪৭তম ব্যাচ থেকে ৫২তম ব্যাচ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চলমান। ফলে এই ছয় ব্যাচের শিক্ষার্থীরাই কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ শিক্ষার্থী। তবে হলগুলোতে ৪১তম ব্যাচ থেকে ৪৬তম ব্যাচের হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন।

এদের বেশিরভাগই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। খোদ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুটি করে চার আসনবিশিষ্ট মোট চারটি কক্ষ দখলে রেখেছেন। এর মধ্যে মওলানা ভাসানী হলের ৩২০ ও ৩২২ নম্বর কক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ৩৪৯ ও ৪৪৭ নম্বর কক্ষে সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিবুর রহমান লিটন থাকছেন। লিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পোষ্য কোটায় ভর্তি হওয়া ছাত্র। নিয়ম অনুযায়ী পোষ্য কোটার কেউ হলে থাকতে না পারলেও তিনি একাই দুই কক্ষ দখল করে থাকছেন।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটিতে চার শতাধিক নেতাকর্মী পদ পেয়েছেন। এদের মধ্যে শীর্ষ পদগুলো ছাড়াও প্রায় ২৫০ নেতাকর্মীর ছাত্রত্ব নেই। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটিতে সহসভাপতি রয়েছেন ১০৬ জন। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক নেতার ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে। আর যুগ্ম সম্পাদক রয়েছেন ১১ জন, যার সবার ছাত্রত্ব শেষ। এছাড়া অন্যান্য পদেও অনেক অছাত্র নেতা রয়েছেন, যারা অবৈধভাবে আবাসিক হলে থাকেন। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে হাজারের বেশি অছাত্র অবস্থান করছেন।

হলগুলোতে অছাত্র ছাত্রলীগের নেতাদের থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেল। তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমার জানামতে ছাত্রলীগের যারা হলে রয়েছেন, তাদের বেশিরভাগই বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি আছে। অনেকে স্পেশাল পরীক্ষা দিচ্ছে। তারপরেও অছাত্র থেকে থাকলে আমরা তাদেরকে হল ছেড়ে দিতে বলব।”

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আবাসিক হলগুলোতে এক হাজারের বেশি অছাত্র রয়েছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে প্রায় ২০০ অছাত্র রয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে দেড় শতাধিক, মীর মশাররফ হোসেন হলে দুই শতাধিক, শহীদ সালাম-বরকত হলে ১২০ থেকে ১৩০ ও আ ফ ম কামালউদ্দিন হলে প্রায় দেড়শ’, মওলানা ভাসানী হলে শতাধিক, আল বেরুনী হলে ১৪০ ও শহীদ রফিক-জব্বার হলে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী অবৈধভাবে হলে আছেন। সম্প্রতি চালু হওয়া শেখ রাসেল ও শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ হলে নবীনদের আসন দেওয়ায় সেখানে অছাত্র নেই।

এর পাশাপাশি মেয়েদের হলগুলোতেও প্রায় অর্ধশতের মতো অছাত্র রয়েছেন; যাদের অধিকাংশই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে গেছে, এমন শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে হল ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও তারা হল ছাড়েননি। এ ব্যাপারে নোটিশেই সীমাবদ্ধ থাকে প্রশাসন। ক্যাম্পাসে ধর্ষণের ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে রবিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায়, অছাত্রদের হল থেকে বের হওয়ার জন্য ৫ দিনের সময় বেধে দেয় প্রশাসন। তবে এবারও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন করা যাবে কি না সেটি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, হলে অবৈধভাবে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না।

হলগুলোয় তীব্র আসন সংকট থাকার কারণে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একাধিক হলের গণরুমে আকার ভেদে ১০-১৫ জন শিক্ষার্থী থাকছেন গাদাগাদি করে। এছাড়া দুই আসন ও চার আসনবিশিষ্ট বেশ কয়েকটি (মিনি গণরুম) কক্ষে থাকছেন ৬ থেকে ৮ জন শিক্ষার্থী। দুর্ভোগের পাশাপাশি স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে এসব শিক্ষার্থীর।

এ বিষয়ে ছাত্র ইউনিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি অমর্ত্য রায় ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ছাত্রলীগকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে গিয়ে হলগুলোতে অছাত্র পুষছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যাদের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা সময়ে অপকর্ম ঘটছে। একই সঙ্গে নবীন শিক্ষার্থীদের ওপর র্যা্গিংয়ের মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে তারা। তবে প্রশাসন থেকে আদতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “অছাত্রদের বের করার ব্যাপারে আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছি। গতকাল সিন্ডিকেটেও সিদ্ধান্ত হয়েছে, হল প্রশাসনকেও নির্দেশনা দেওয়া আছে। আমি এটি বাস্তবায়ন করেই ছাড়ব।”

   

About

Popular Links

x