Tuesday, August 25, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

লাভজনক হলেও বাড়েনি ভেনামি চিংড়ির চাষ

রপ্তানিকারকরা বলছেন, বাগদা চিংড়ির চেয়ে ভেনামির উৎপাদন খরচ অর্ধেক। অন্যান্য দেশ ভেনামি রপ্তানি করে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৪, ১০:১৭ এএম

দেশে ভেনামি চিংড়ির পরীক্ষামূলক চাষ সফল সফল হওয়ার পর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এ চিংড়ি চাষের অনুমতি দিয়েছিল সরকার। ফলে ভেনামি চিংড়ি চাষে ইচ্ছুক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে আবেদন করে চাষ করতে পারছেন। তবে লাভজনক হলেও এ জাতের চিংড়ি চাষ তেমন একটা বাড়েনি।

দেশে ভেনামি চিংড়ির পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয় ২০১৯ সালে। চার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০২৩ সালের ২৯ মার্চ রপ্তানি আয় বাড়াতে খুলনা অঞ্চলে এই চিংড়ির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। চাষেও মিলেছে সফলতাও। কিন্তু বিদেশ থেকে খাদ্য, ওষুধ ও পোনা আমদানি এবং চাষের স্থানে জৈবনিরাপত্তা (বায়োসিকিউরিটি) নিশ্চিতের কড়াকড়ি থাকায় চাষ বাড়েনি। গত বছর খুলনায় আটজন চাষের অনুমোদন পেয়েছিলেন। এর মধ্যে চাষ করেছেন তিনজন। বাকি পাঁচজন পোনা না পাওয়ায় চাষ করতে পারেননি।

বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটে চিংড়ি রপ্তানি কমে যায়। সেইসঙ্গে বাগদার উৎপাদন কমে যায়। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। এমন পরিস্থিতিতে ভেনামিতে আশার আলো দেখেন চিংড়ি ব্যবসায়ীরা। কারণ এই চিংড়ির উৎপাদন যেমন বেশি, এর পেছনে খরচও তেমনি কম। তাই সরকার পরীক্ষামূলকভাবে উচ্চ উৎপাদনশীল ভেনামি জাতের বিদেশি চিংড়ি চাষের সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, যেটি এতদিন ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কায় নিষিদ্ধ ছিল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) অধীনে ২০২১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে পাইকগাছায় চাষ শুরু হয়। সে বছর দুটি প্রতিষ্ঠান চাষ করে সফলতা পায়। তার ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে আট প্রতিষ্ঠান অনুমতি পেয়ে চাষ করে সফলতা পায়।

উৎপাদন খরচ অর্ধেক

রপ্তানিকারকরা বলছেন, বাগদা চিংড়ির (ব্ল্যাক টাইগার) চেয়ে ভেনামির উৎপাদন খরচ প্রায় অর্ধেক। এ কারণে বিদেশে প্রতিযোগিতার বাজারেও টিকে থাকা যাবে। অন্যান্য দেশ ভেনামি উৎপাদন ও রপ্তানি করে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে। ১০ বছর আগে ভারত ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন শুরু করেছিল। এখন তারা ওই খাতে অনেক সফল। বাংলাদেশে চাষ বাড়লে এবং রপ্তানি ঠিকমতো হলে লাভ হবে।

বিদেশ থেকে ভেনামি পোনা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এম ইউ সি ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শ্যামল দাস বলেন, “দেশে বাগদা চিংড়ির উৎপাদন কমে যাচ্ছে। যে কারণে প্রতি বছর চিংড়ি রপ্তানি কমছে। চিংড়ির অভাবে অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চ উৎপাদনশীল জাতের ভেনামি চিংড়ি চাষ করা ছাড়া আমাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই। এটি অনেক লাভজনক।”

ভেনামি চিংড়ি কী

ভেনামি চিংড়ি উচ্চ উৎপাদনশীল মাছ। এটি পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রজাতি। উচ্চ উৎপাদনের পাশাপাশি এর রোগ প্রতিরোধক্ষমতার জন্যও এটি এখন সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে। বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে উৎপাদিত চিংড়ির ৮০% ভেনামি। ইংরেজি নাম “হোয়াইটলেগ শ্রিম্প” বা সাদা পায়ের চিংড়ি। শুধু পা দেখতে সাদা এমন নয়, পুরো চিংড়িই দেখতে সাদাটে। অনেকটা স্থানীয় জাতের “হরিণা” চিংড়ির মতো। ফলে প্রথম দেখায় “হরিণা” ভেবে ভুল করেন অনেকে। বর্তমানে চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, একুয়েডর, মেক্সিকো ইত্যাদি দেশে চাষ হচ্ছে।

ভেনামি চিংড়ি রোগ সহনীয় এবং উৎপাদন সন্তোষজনক/সংগৃহীত

সম্ভাবনা

মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, দেশের উপকূলবর্তী এলাকায় ২ লাখ ৬ হাজার ৭৬৩ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়। এই জমিতে ২০২১-২২ অর্থবছরে বাগদা উৎপাদন হয়েছিল মাত্র ৭২,৮০৯ টন। বর্তমান বিশ্বে উৎপাদিত চিংড়ির ৮০% ভেনামি প্রজাতির হলেও বাংলাদেশে এর উৎপাদন করা যাচ্ছিল না। সরকারি সিদ্ধান্তের ফলে এখন দেশে চিংড়ি উৎপাদন ও রপ্তানি দুটিই বাড়বে।

চাষিরা বলছেন, দেশে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ব্ল্যাক টাইগার চিংড়ি, যেটি “বাগদা” নামে পরিচিত। সনাতন উপায়ে খামারে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ কেজির মতো বাগদা উৎপাদন সম্ভব। তবে এই চিংড়ি যদি নিবিড় পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয়, তাহলে হেক্টরপ্রতি দেড় টন থেকে দুই টন মাছ পাওয়া সম্ভব।

অন্যদিকে, নিবিড় পদ্ধতিতে ভেনামি চিংড়ি চাষ করা হলে হেক্টরপ্রতি ৮ থেকে ১০ টন পর্যন্ত চিংড়ি পাওয়া সম্ভব। তাতে খরচ বাদে বিনিয়োগের ৩০% পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সঠিকভাবে ভেনামি চাষ করা গেলে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এই খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

যে কারণে বাড়েনি চাষ

২০২৩ সালে চাষের আবেদন করেন নয়জন। অনুমোদন পান আটজন। এর মধ্যে চাষ করেন তিনজন। তারা সফলতা পেয়েছেন। বাকিরা পোনার অভাবে চাষ করতে পারেননি। ২০২৪ সালে অনুমতি পেয়েছেন ছয়জন। শেষ পর্যন্ত পোনা পাবেন কি-না, তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন। কারণ পোনা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সেইসঙ্গে খাদ্য ও ওষুধ আমদানি করতে হবে। এসব কারণে আগ্রহী হচ্ছেন না চাষিরা।

চাষিরা বলছেন, ভেনামি চিংড়ি রোগ সহনীয় এবং উৎপাদন সন্তোষজনক। চাষে খরচ কম। কিন্তু এর খাদ্য, ওষুধ ও পোনা আমদানি করতে বেশি টাকা খরচ হয়। পাশাপাশি চাষের ক্ষেত্রে জৈবনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। ফলে চাষে আগ্রহী হচ্ছি না আমরা। এজন্য চাষ বাড়ছে না।

লোকসানের ভয়ে চাষ বাড়ছে না বলে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক এম এ হাসান পান্না। তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “দেশে ভেনামির পোনা উৎপাদনে একটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দিলেও লোকসানের ভয়ে উৎপাদনে আসেনি। ফলে পোনা ও খাবার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। যা ব্যয়বহুল। সেইসঙ্গে চাষে মৎস্য বিভাগের বিধিনিষেধ আছে। এসব কারণে উৎপাদন বাড়ছে না। পোনা ও খাবার এখানে উৎপাদন হলে এবং উন্মুক্ত জলাশয়ে চাষের অনুমতি দিলে চাষ বাড়বে।”

মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, জৈবনিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে সনাতন পদ্ধতির বদলে আধা নিবিড় বা নিবিড় পদ্ধতিতে ভেনামি চিংড়ি চাষ করতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ যথাযথভাবে মানসম্মত খাদ্য দিতে হবে। কোনোভাবেই অননুমোদিত অ্যান্টিবায়োটিক, রাসায়নিক বা কীটনাশক প্রয়োগ করা যাবে না। আর বাজারজাত করার ৮ থেকে ১০ দিন আগে চিংড়ির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে নিতে হবে।

খুলনা বিভাগীয় পোনা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও পাইকগাছা উপজেলার পুরস্কারপ্রাপ্ত ঘের ব্যবসায়ী গোলাম কিবরিয়া রিপন বলেন, “আমদানি নির্ভরতার কারণে ভেনামি চিংড়ি চাষ বাড়ছে না। ইচ্ছে থাকলেও এই চিংড়ি চাষ বাড়াতে পারছেন না চাষিরা। কারণ নানা ধরনের বিধিনিষেধ আছে।”

নিবিড় পদ্ধতিতে ভেনামি চিংড়ি চাষ করা হলে হেক্টরপ্রতি ৮ থেকে ১০ টন পর্যন্ত চিংড়ি পাওয়া সম্ভব/ঢাকা ট্রিবিউন

উন্মুক্ত জলাশয়ে চাষ করলে ক্ষতি কী

মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, ভেনামি বিদেশি প্রজাতির মাছ। তাই উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছটি ছড়িয়ে পড়লে দেশি মাছের ক্ষতি হবে। নির্দিষ্ট স্থানে চাষাবাদ করতে হবে। না হয় কোনো ধরনের ভাইরাস ছড়াতে পারে। কারণ খাদ্যাভ্যাস ও আবহাওয়া বিবেচনায় এই চিংড়ি চাষের ঝুঁকি একটু বেশি। 

এসব কারণে ভেনামি চিংড়ি চাষ ব্যবস্থাপনায় জৈবনিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হয় বলে জানালেন খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব পাল। তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ভেনামি চাষে সরকারি অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। কারণ পরিবেশগত দিকসহ আধুনিক চাষ পদ্ধতির প্রস্তুতির বিষয় আছে। প্রস্তুতি ঠিক থাকলে অনুমোদন পাওয়া সহজ। পোনা ও খাদ্য আমদানি করতে হয়। এ বছর আরও ছয়জন অনুমোদন পেয়েছেন। গত বছর অনুমোদন পেয়েও পাঁচজন পোনা না পাওয়ায় চাষ করতে পারেননি। গতবার যে তিনজন চাষ করেছেন তারা হেক্টরপ্রতি ১২ টন উৎপাদন করতে পেরেছেন। তাদের লাভ হয়েছে ভালোই।”

ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়বে জানিয়ে এই মৎস্য কর্মকর্তা আরও বলেন, “২০০৬-০৭ অর্থবছরে বাগদা-গলদা- হরিণা চিংড়ি উৎপাদন হয়েছিল ১৮,২৫৫ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ২৫,৩৭৫ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। ভেনামি উৎপাদন ২০২২-২৩ অর্থবছরে শুরু হয়। তখন উৎপাদন হয়েছিল ১৩৫ মেট্রিক টন। এ বছর আরও বাড়বে।”

চলতি বছর সারাদেশে ২ লাখ ৬৩ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হচ্ছে জানিয়ে মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব পাল বলেন, “এখান থেকে ২ লাখ ৯৫ হাজার টন চিংড়ি উৎপাদন হবে। খুলনায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে  ১৪,৫৮৫ টন গলদা, ১২,৫৯১ টন বাগদা, ১,৪০৩ টন ভেনামি (পরীক্ষামূলক), ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৩,৩২৫ টন গলদা, ১২,৫৪৯ টন বাগদা, ১,৭৩৩ টন ভেনামি (পরীক্ষামূলক), ২০২০-২১ অর্থবছরে ১১,৪৪৬ টন গলদা, ১১,৩১৭ টন বাগদা, ১,৯৩৫ টন ভেনামি (পরীক্ষামূলক), ২০২১-২২ অর্থবছরে ১১,৯৩৮ টন গলদা, ১১,২২৪ টন বাগদা, ১,৯৬০ টন ভেনামি (পরীক্ষামূলক), ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২,১৫৭ টন গলদা, ১১,২৬৪ টন বাগদা এবং ১,৯৫৩ টন ভেনামির বাণিজ্যিক উৎপাদন হয়েছে। এই হিসেবে ভেনামি চিংড়ি তেমন একটা বাড়েনি।”

   

About

Popular Links

x