২০২০ সালের ৫ জুলাই। সময়টা ছিল করোনাভাইরাস মহামারির। এমন ক্রান্তিকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ট্রেজারারের দায়িত্ব নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের তৎকালীন অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান। এ বছরের ৫ জুলাই দায়িত্বের চার বছর পূর্ণ করেছেন তিনি। তবে দায়িত্ব পালনের পুরোটা সময় নানা কারণেই আলোচিত ছিলেন তিনি। শুরুতেই শিক্ষকদের একটি অংশ প্রকাশ্যেই তর বিরোধিতায় নামেন। এখনও শিক্ষক সমিতির বেশিরভাগ অভিযোগ ও অসন্তোষ তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের নানা আন্দোলনও তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে।
সর্বশেষ এবারের গুচ্ছভুক্ত ভর্তি পরীক্ষায় দায়িত্ব পালন শেষে ক্যাম্পাস থেকে গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার সময় শিক্ষক সমিতির বাঁধার মুখে পড়েন তিনি। প্রায় চার ঘণ্টা পর গাড়ি ছাড়াই সেখান থেকে চলে যেতে হয় তাকে। এতোকিছুর পরও কিছু ইতিবাচক সাফল্য রয়েছে তার। এর মধ্যে শিক্ষকদের পার্টটাইম রিউমুনারেশন বৃদ্ধি, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ভাতা প্রদান, গ্রেডভিত্তিক শিক্ষকদের ল্যান্ডফোন ভাতা, পরীক্ষা পারিতোষিক নিয়মিত বরাদ্দের বাইরে বিশেষ বরাদ্দ, বিশেষ বরাদ্দে আইন বিভাগের মুট কোর্ট স্থাপন। গত চার বছরে ৪৭ কোটি টাকার বাজেট ৭১ কোটিতে উন্নীতকরণ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মিডিয়া ল্যাব স্থাপন, শিক্ষকদের গবেষণার বিষয়ে জোর দেওয়া ও ফ্যাকাল্টিভিত্তিক কনফারেন্স কক্ষ তৈরিতে আর্থিক সহায়তা ছিল উল্লেখযোগ্য।
এসব বিষয় ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক অস্থিরতা নিয়ে ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মহসীন কবির।
ঢাকা ট্রিবিউন: বর্তমান উপাচার্যের যোগদানের পর থেকে আপনি গবেষণার বিষয়ে জোর দিয়েছেন। বিষয়টি আসলে কী?
অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা কার্যক্রম কতটুকু উন্নত হয়েছে, তা বিগত চার বছরের খতিয়ান টানলেই বুঝ যাবে। মূলত প্রশাসনের পরিকল্পিত উদ্যোগে বর্তমানে গবেষণায় একটি স্ট্যান্ডার্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। শুধুমাত্র রিপোর্ট বাইন্ডিংয়ে বিশ হাজার টাকা, কিংবা বিদেশে ভ্রমণ করেও গবেষণায় ব্যয় দেখানো, নামে মাত্র রিপোর্ট দেওয়া, কম্পিউটার সামগ্রী ক্রয়; এসবই ছিল অতীতের প্র্যাকটিস। এসব অনিয়ম দূরীকরণে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণার ফরম্যাট এনে কুবির জন্য নির্ধারিত এবং উপযুক্ত একটি নীতিমালা প্রতিষ্ঠিত করেছি।
ঢাকা ট্রিবিউন: অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে কুবির বাজেট বেড়েছে। এটা কীভাবে সম্ভব হয়েছে?
অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান: একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে বাজেট প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন সব সময় চ্যালেঞ্জের। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুদান স্বচ্ছভাবে ব্যবহার করলে এবং কাজের পরিধি উপস্থাপন করতে পারলে বিমক কর্তৃক অনুদান বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। আমরা সেই সুযোগ নিয়েছিলাম। দায়িত্ব নেওয়ার সময় করোনাভাইরাস মহামারিতেও নিয়মিত অফিস করেছি। কিন্তু তৎকালীন উপাচার্য ইমরান কবির চৌধুরী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সোলার বিদ্যুৎ দুর্নীতিতে অভিযুক্ত সাবেক রেজিস্ট্রার আবু তাহের তখন ঢাকায় অলস সময় কাটিয়েছেন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবহেলিত ও পরিত্যক্ত প্রকল্পের কাজের স্বার্থে শিক্ষক কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে একাধিক মতবিনিময় করি। প্রকল্পের অসুবিধা সমূহ এবং উত্তরণের পথ তৎকালীন শিক্ষা সচিব মহো্দয়ের কাছে বলিষ্ঠভাবে ব্যাখ্যা করায় প্রায় ৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের মাধ্যমে প্রকল্পটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে সক্ষম হই।
ঢাকা ট্রিবিউন: কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আপগ্রেডেশন নীতিমালা সংশোধনে কী উদ্যোগ নিয়েছিলেন?
অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান: অতীতে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে তৎকালীন রেজিস্ট্রার আবু তাহের নিজস্ব লোকদের আপগ্রেডেশনের সুবিধা দিতে নামে মাত্র নীতিমালা তৈরি করেন। আমাদের দিন-রাত পরিশ্রমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আপগ্রেডেশন নীতিমালা সংশোধন হয়েছে।
ঢাকা ট্রিবিউন: আপনাকে ঘিরে শিক্ষকদের একাংশের অসন্তোষের কারণ কী?
অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান: সত্যিকার অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারারের কাজ একটি থ্যাঙ্কস লেস জব। আমার কাজই হলো অর্থ প্রদানের বিষয়ে আইন মেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। আমি তো শিক্ষক কিংবা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে খুশি করতে আসিনি। আমার কাছে দেশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থই সবার আগে। হয়ত অনেকের অন্যায় আবদার আমি রক্ষা করতে পারিনি। অনেকে ব্যক্তিগত কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি ব্যবহার করতেন। আমি তা বন্ধ করেছি। আবার কেউ কেউ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তির অনুমতি ছাড়াই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কোনো কোনো শিক্ষক আপগ্রেডেশন সময়ের পূর্বেই পদোন্নতি পেয়েছেন। কেউ কেউ শিক্ষা ছুটিতে থাকলেও গবেষণার কাজ শেষ না করেই নিজ বিভাগে যোগদানের চেষ্টা চালান। সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটানো উপাচার্য মহোদয়ের জন্য অসম্ভব। যেহেতু উপ-উপাচার্য ড. হুমায়ুন কবির নিয়মিত অফিস করেননি, তাই মাননীয় উপাচার্য কখনও কখও আমার নিকট এ ধরনের নথি পাঠিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিয়ম মোতাবেক মতামত দিয়েছি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন অধ্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন দ্বারা প্রাপ্ত ক্ষমতা এবং উপাচার্য কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে আমার কোনো বাধা নেই। সঙ্গত কারণেই আমি সেসব নথিতে মতামত দিয়েছি। এ মতামত কার পক্ষে বা বিপক্ষে যাবে, সে চিন্তা করে কখনও মতামত দিইনি। যারা আমার সমালোচনাকারী অনেকেরই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষক হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতাও নেই।
ঢাকা ট্রিবিউন: উপাচার্যের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনেছে শিক্ষক সমিতি। এতে আপনাকেও সহযোগী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটি কীভাবে দেখছেন?
অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান: শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ঠিক কী কারণে আমাকে নিয়ে মন্তব্য করেন, তা আমার বোধগম্য নয়। শুধু শুধু উত্তেজনাকর স্লোগান দেওয়া বা অন্যকে ছোট করা একজন শিক্ষকের কাজ নয়। তিনি যেসব অভিযোগ আনছেন, এর সবগুলোই বানোয়াট, বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যাচার। রাজনৈতিক সাইনবোর্ডের মোড়কে বিশৃঙ্খলা ছাড়া তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে কিছুই দেননি। এটা প্রমাণিত। বিগত বছরগুলোতেও উপাচার্যদের সঙ্গে তিনি দুর্ব্যবহার করেছেন। তাই শিক্ষক সমিতির অহেতুক অভিযোগে কিছু যায় আসে না।
ঢাকা ট্রিবিউন: ফার্মাসি বিভাগের আলোচিত এইচপিএলসি (HPLC) ক্রয় সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে যদি কিছু বলতেন…
অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান: ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ইউজিসি কর্তৃক বরাদ্দকৃত অর্থের মাধ্যমে তৎকালীন উপাচার্য মহোদয় কোন ধরনের সাইন্টিফিক ইন্সট্রুমেন্ট ক্রয় করতে পারেননি। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোডের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেননি। আমি যোগদানের পর ২০২০-২১ অর্থবছরের টাকাসহ পূর্বের অর্থবছরের টাকা জমা হওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছিলে। বিভাগীয় প্রধানদের মাধ্যমে এ অর্থ দিয়ে প্রয়োজনীয় ইন্সট্রুমেন্ট ক্রয় করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, তখনকার ফার্মাসি ডিপার্টমেন্টের বিভাগীয় প্রধানের অনুরোধে আমি তাকে একটি আধুনিক এইচপিএলসি (High Performance Liquid Chromatography, HPLC) ক্রয় করার পরামর্শ দিই। সে মোতাবেক এইচপিএলসি ক্রয়ের পদক্ষেপ নেন তিনি। অন্যান্য বিভাগগুলো যেখানে ছোট ছোট ইন্সট্রুমেন্ট কিনে অর্থ ব্যয় করেছিল, সেখানে ফার্মাসি ডিপার্টমেন্টের সাবেক প্রধান একটি দামি ও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যন্ত্র কিনে ডিপার্টমেন্টের গবেষণা ও শ্রেণি শিক্ষার্থীদের নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সুযোগ করেছেন। অথচ ওই সময়ের উপাচার্য মহোদয় আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। কারণ সব মহলে আমার প্রশংসা তিনি সহ্য করতে পারেননি। এ কারণে তার অনুসারীরা সে বিষয়ে না বুঝেই আমার সমালোচনা করছিলেন।
ঢাকা ট্রিবিউন: আপনার বিরুদ্ধে ৯৬ লাখ টাকার জামানত ঠিকাদারদের সাথে ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগ কতটুকু সত্য?
অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান: অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ৯৬ লাখ টাকা নয়, মাত্র ৯৬ পয়সার জামানাতের কিংবা অন্য কোনো উৎস থেকে ভাগ-বাটোয়ারা কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। আমি দোষী হলে রাষ্ট্র যে ব্যবস্থা নেবে, তা অকপটে মেনে নেবো। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে অপপ্রচারকারীর যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।



