ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগানকে মধ্যরাতে ঘরের দরজা ভেঙে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতনকারী কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের তৎকালীন রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) নাজিম উদ্দিনকে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসেবে পদায়ন করার একদিন পরই সরিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের উপপরিচালক পদে তাকে বদলি করা হয়।
তবে প্রতিযোগিতা কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাংবাদিক পেটানো কোনো কর্মকর্তাকে নিজেদের দপ্তরে দেখতে চান না। ইতোমধ্যে তারা বিতর্কিত প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিনের বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনে বদলির আদেশ প্রত্যাহার চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন।
বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে ব্যবসা বাণিজ্যে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। বাজার থেকে সকল প্রকার সিন্ডিকেট ও কার্টেল নির্মূল, দরপত্র জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য এই প্রতিষ্ঠানকে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত হওয়া প্রয়োজন। এরই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনে কোনো বিতর্কিত, দুর্নীতিবাজ ও কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের মদদপুষ্ট কর্মকর্তার পদায়ন এই প্রতিষ্ঠান, ভোক্তাসাধারণের স্বার্থ সংরক্ষণ ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য হুমকিসরূপ। ”
এতে আরও বলা হয়, “বিতর্কিত প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তা জনাব নাজিম উদ্দিন (১৭৪৪২) এর বিষয়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে বিবস্ত্র করে পেটানো, জোরপূর্বক ভূমিদখল, ব্যবসায়ী ও বৃদ্ধ কৃষককে মারধরসহ বিভিন্ন দুর্নীতি সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও, তার বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারী ও বিভাগীয় মামলা চলমান আছে। এ বিষয়ে সাংবাদিক রিগ্যানের আইনজীবী ইশরাত হাসান একটি সাংবাদমাধ্যকে জানান যে, ‘নাজিম উদ্দিন একটি ফৌজদারি মামলার আসামি। সেই মামলা তদন্তাধীন। তার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের রুল রয়েছে। রুলের জবাবও দেয়নি এখনো। এই অবস্থায় তাকে পদায়ন ও চাকরিতে বহাল রাখা বেআইনি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এটা করতে পারে না। আমরা বিষয়টি আদালতের নজরে আনব। পিবিআইকে বলব দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য। নাজিম উদ্দিন অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, এখনো করছেন।”
চিঠিতে বলা হয়, “বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে জনাব নাজিম উদ্দিনের মতো দুর্নীতি ও বিভাগীয় মামলায় অভিযুক্ত, একাধিক ফৌজদারী মামলার আসামী ব্যক্তির পদায়ন সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করবে এবং কমিশনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এমতাবস্থায়, বিতর্কিত প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তা জনাব নাজিম উদ্দিনের বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন বদলীর আদেশ বাতিলপূর্বক পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে মহোদয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব।”
উল্লেখ্য, গত ৮ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ মামুন শিবলী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে নাজিম উদ্দিনকে প্রতিযোগিতা কমিশনে বদলির বিষয়টি জানানো হয়। তাকে প্রতিযোগিতা কমিশনের উপপরিচালক পদে বদলি করা হয়।
এর আগে, ৭ সেপ্টেম্বর নাজিম উদ্দিনকে কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে পদায়ন করা হয়। তাকে ৮ সেপ্টেম্বর বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে নাজিমকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
সাংবাদিক আরিফের করা ফৌরদারি মামলায় এজাহার নামীয় আসামি নাজিম উদ্দিন।
উল্লেখ্য, কুড়িগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের নামে সরকারি পুকুরের নামকরণ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে ২০২০ সালের ১৩ মার্চ দিবাগত মধ্যরাতে সাংবাদিক আরিফকে তার শোবার ঘরের দরজা ভেঙে তুলে নিয়ে যায় জেলা প্রশাসনের কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেট ও আনসার সদস্যরা। তৎকালীন আরডিসি নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বে আরিফকে পেটাতে পেটাতে গাড়িতে তুলে জেলা শহরের পূর্ব প্রান্তে ধরলা নদীর তীরে ক্রসফায়ারের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ফিরিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করা হয়। আরিফের ঘরে আধা বোতল মদ ও দেড়শ’ গ্রাম গাঁজা পাওয়ার অভিযোগ এনে মধ্যরাতে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে এক বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দিয়ে রাতেই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদ উঠলে এক দিনের মাথায় জামিনে মুক্তি পান আরিফ। পরে তৎকালীন ডিসি সুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দিন, এনডিসি রাহাতুল ইসলাম ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমাকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এরপর তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু করে। অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় সুলতানা পারভীনকে দুই বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) স্থগিত, এনডিসি রাহাতুল ইসলামের তিনটি ইনক্রিমেন্ট কর্তন, আরডিসি নাজিম উদ্দিনকে নিম্নধাপে নামিয়ে দেওয়া হয় এবং রিন্টু বিকাশ চাকমাকে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয় জনপ্রশাসন। তবে পরে তারা সবাই রাষ্ট্রপতির কাছে দাপ্তরিক দায়মুক্তি পান।



ইউএনও পদ থেকে এক দিন পরই সরানো হলো সাংবাদিক পেটানো নাজিমকে