Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ঢাকা ট্রিবিউনের খুলনা প্রতিনিধিসহ ১৪ সাংবাদিকের নামে হত্যা মামলা

সরকারি নিবন্ধনে তার মৃত্যু বৈদ্যুতিক শকে হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৪:০২ পিএম

ঢাকা ট্রিবিউন এর খুলনা প্রতিনিধি মো. হেদায়েৎ হোসেনসহ ১৪ সাংবাদিকের নামে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতা বিরোধী হত্যা মামলার আবেদন করা হয়েছে। ১৪ সাংবাদিকের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট ৩১৫ জনসহ অজ্ঞাত ১,২০০-১,৫০০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী খুলনার পাইকগাছা উপজেলার রকিবুল হাসানকে আসামিরা পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে হত্যা করার মাধ্যমে মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে। অভিযুক্তরা গুলি ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে রকিবুল হাসানকে মারার পরিকল্পনা এবং হত্যার সঙ্গে যুক্ত। ১,৫০০ জনকে অভিযুক্ত করা হলেও স্বাক্ষী ২ জন নারীসহ ৫ জন।

এর আগে রকিবুল হাসান বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মারা গেছেন বলে ৯ নং চাঁদখালি ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যয়ন পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মৃত্যুর প্রমাণ পত্রে ও সরকারি মৃত্যু নিবন্ধনেও তার মৃত্যু বৈদ্যুতিক শকে হয়েছে বলে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।

ঘটনার পর বাদী নিজেও স্বীকার করেছিলেন তার ছেলে বিদ্যুৎস্পৃস্টে মারা গেছে। মৃত্যুর সাড়ে ৩ মাস পর গত ২১ নভেম্বর তিনি তার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ শকে হত্যা করা হয়েছে বলে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করলেন।

এ বিষয়ে মামলার বাদি রকিবুলের বাবা মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। মামলার আবেদনপত্রে থাকা তার মোবাইল নম্বরে ফোন করলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

তবে রফিকুল ইসলামের বরাত দিয়ে তার চাচাত ভাই এস এ মুকুল জানান, রফিকুল কোনো আদলতে মামলা বা আবেদন করেননি, গত কিছুদিন আগে দুজন অপরিচিত ব্যাক্তি এসে রফিকুলের কাছ থেকে তার আইডি কার্ড ও কাগজপত্র নিয়ে গেছে অনুদান দেবে বলে। তারা মুগ্ধের ভাইয়ের কাছ থেকে এসেছে বলে পরিচয় দেয়।

এ ব্যাপারে রফিকুল সুস্পষ্ট তদন্ত করার দাবি জানান, কেন তার নাম ব্যাবহার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে অভিযোগ করা হলো সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

মুকুল ফেসবুকে একটি পোস্টে বলেন, “ছাত্র বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে গত ৫ আগস্ট পাইকগাছা চাঁদখালী বাজারে পতাকা মিছিল করার সময় স্বৈরাচারের পতনের খবর পেয়ে পতাকা উত্তোলনের সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে হয়ে স্পটেই রকিবুল ইসলাম রকির মৃত্যু হয়। ছেলেটির বাবার এক চোখ নষ্ট, খুবই গরিব অসহায়, কে বা কাহারা তার বাবার নাম ব্যাবহার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে আবেদন করেছে অনেক মানুষের নামে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় এক ধরনের ধুম্রজাল তৈরি হয়েছে।”

মামলার আবেদনপত্রে বাদীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কারের উদ্দেশে বৈষমাবিরোধী যোক্তিক ছাত্র আন্দোলনে সারাদেশে উত্তাল পরিস্থিতি তৈরি হয়। আমার ছেলে রকিবুল হাসান ১৬ জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানোর প্রতিবাদে ১৭ জুলাই থেকে রাজপথে নেমে সক্রিয়ভাবে আন্দোলন শুরু করে। ক্রমান্বয়ে আন্দোলন বেগবান হওয়ায় আমার ছেলে আন্দোলনের নেতৃত্বের সামনের সারিতে চলে আসে। শুরু থেকেই আন্দোলন থামাতে আওয়ামী লীগ সরকারের উচ্চ মহল থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে এবং সরকারি দল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগসহ তাদের অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাসীদেরকে সাধারণ নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার উপর লেলিয়ে দেওয়া হয়। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পূর্বক্ষণে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চাদখালী গ্রামে সামনের রাস্তায় ছাত্র জনতা মিছিল করে। ছাত্র জনতার অধিকার আদায়ের সেই যৌক্তিক মিছিল দমন করার জন্য উল্লেখিত আসামিদের পরিকল্পনা এবং সরাসরি নির্দেশে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে উল্লিখিত আসামিসহ খুলনা জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আগত আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগের সহস্রাধিক কর্মী সরাসরি গুলি বর্ষণ করে। আসামিদের ছোড়া গুলিতে অনেকেই আহত হয়। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সাহসী পদক্ষেপে আন্দোলন দমাতে ব্যার্থ হয়। এ অবস্থায় আন্দোলনকারীদের বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মারার পরিকল্পনা করে আসামিরা। আন্দোলনকারীদের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চাঁদখালীর বিভিন্ন পয়েন্টে, রাস্তার মাঝে পড়ে থাকা বাঁশ ও বিদ্যুতিক খুঁটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে কাঁচা বাঁশের মাথায় বাঁধা পতাকা হাতে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় আমার ছেলে রকিবুল হাসান এর হাতে থাকা বাঁশ বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে দেওয়া আসামিদের বিদ্যুতে স্পৃষ্ট হয় এবং ঘটনাস্থলেই আমার ছেলে রকিবুল হাসানের শরীর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় ও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আন্দোলনকারীরা আমার ছেলেকে পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আসামিদের ছোড়া গুলির বিবরণ এবং বিদ্যুৎ শক দিয়ে গণহত্যা চালানোর ঘৃণ বিবরণ বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার হয়েছে। পরবর্তীতে আমার ছেলের মারা যাওয়ার খবর শুনে হাসপাতাল থেকে মৃতদেহ বুঝে নিয়ে ৬ আগস্ট সকাল ১০টায় নিজ গ্রামে জানাজার পর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এহেন কাজের মাধ্যমে আসামিরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩ এর ৩(২/৪(১/৪(২) ধারা মোতাবেক অপরাধ ও গণহত্যার অপরাধ সংগঠিত করে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন হেদায়েৎ

এর আগে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে খুলনা ১ আসনের নির্বাচনি ফলাফল নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় ঢাকা ট্রিবিউন সাংবাদিক হেদায়েৎ হোসেনকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। ৪৮ ঘণ্টা কারাবাসের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। ২ বছর পর তাকে তদন্ত সাপেক্ষে মামলা থেকে দায়মুক্তি দেন আদালত।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাতে খুলনার রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ হেলাল হোসেন তার কার্যালয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন। ওই ফলাফলে খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাট) আসনে মোট ভোটারের চেয়ে ২২ হাজারেরও বেশি ভোট গ্রহণ হয়েছে বলে প্রথম ঘোষণা দেন। এর ঘণ্টাখানেক পর এ আসনের ফলাফল সংশোধন করে  ফেরন ঘোষণা করা হয়। এই দুটি ঘোষণা নিয়ে করা প্রতিবেদন ঢাকা ট্রিবিউন অনলাইনে প্রকাশিত হয়। এ ঘটনায় মানবজমিনসহ অন্য বেশ কয়েকটি পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার হয়। এ ঘটনায় বটিয়াঘাটা থানায় ঢাকা ট্রিবিউন ও মানবজমিনের ২ সাংবাদিকের নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি বিকেলে খুলনার পিকচার প্যালেস এলাকা থেকে ধরে নেওয়া হলেও গল্লামারী এলাকা থেকে হেদায়েৎ হোসেন মোল্লাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২ জানুয়ারি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ব‌টিয়াঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর  রহমান আদালতে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ এর বিচারক নয়ন বিশ্বাস তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডে নিয়ে যাওয়ার পর ৩ জানুয়ারি বিকেলে খুলনার দায়রা জজ আদালতের বিচারক মশিউর রহমান চৌধুরী তার জামিন মঞ্জুর করেন। ওই দিন সন্ধ্যায়য় জামিনের মুক্তি পান তিনি। এরপর ২০২০ সালে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। কিন্তু তাতে প্রচারিত সংবাদটি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় হেদায়েৎ হোসেনকে মামলার দায় থেকে অব্যহতির সুপারিশ করা হয়। খুলনার আদালতে দুদফা শুনানীর পর মামলাটির বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য সাইবার ট্রাইব্যুনাল ঢাকায় প্রেরণ করা হয়। সেখানে শুনানি শেষে তাকে মামলার দায় থেকে অব্যহতি প্রদান করা হয়।

   

About

Popular Links

x