ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) গণতন্ত্র সূচকে স্কোর সবচেয়ে বেশি কমেছে বাংলাদেশের। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশ ২৫ ধাপ পিছিয়েছে। ১৬৫টি দেশ ও ২টি অঞ্চলের মধ্যে এবার বাংলাদেশের অবস্থান ১০০তম। আগের বছরের তুলনায় ২০২৪ সালে বিশ্বের আর কোনো দেশের গণতন্ত্রের সূচক এতটা পেছায়নি।
বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত বার্ষিক এই সূচকে বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর গণতন্ত্রের অবস্থা পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে। সেগুলো হলো, নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও বহুদলীয়তা, সরকার পরিচালনা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক স্বাধীনতা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ নম্বরের স্কেলে মোট ৪.৪৪ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ এখনো “হাইব্রিড শাসনব্যবস্থা” হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ থাকলেও এবার এই শ্রেণির নিম্নস্তরের কাছাকাছি অবস্থান করছে। ১০ স্কোরকে সর্বোচ্চ বা শ্রেষ্ঠ অবস্থান হিসেবে ধরা হয়।
২০২৩ সালের ইআইইউর গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭৫তম। ২০২২ সালে তা ছিল ৭৩তম। ২০২৩ সালে আগের বছরের তুলনায় দুই ধাপ পিছিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ২০২৪ সালে এক লাফে ২৫ ধাপ পিছিয়ে ১০০-তে নেমে গেছে।
ইআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে স্কোর সবচেয়ে বেশি কমেছে বাংলাদেশের। এবার বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর ৪.৪৪। ২০২৩ সালের তুলনায় স্কোর কমেছে ১.৪৪। এর আগের বছর বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৫.৮৭।
যেসব দেশের নির্বাচনে বড় ধরনের অনিয়ম থাকে এবং সেগুলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে বাধাগ্রস্ত হয় সেসব দেশগুলোর শাসনব্যবস্থাকে ইআইইউ হাইব্রিড হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, একটি পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর অপসারণ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যেকোনো দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় স্কোর পরিবর্তনে রেকর্ড করেছে।
বাংলাদেশে নির্বাচনে কারচুপির পরও তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলন পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যুব নেতৃত্বাধীন নানা উদ্যোগ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করেছে। কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি হতাশ হয়ে পড়ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেখানে আরও বলা হয়েছে, যদি বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয় তাহলে ২০২৪ সালের গণতান্ত্রিক বিপর্যয় হয়ত সাময়িক হতে পারে।
আগের বছরের মতো ২০২৪ সালেও গণতন্ত্র সূচকে সবচেয়ে বেশি ৯.৮১ স্কোর নিয়ে শীর্ষে রয়েছে নরওয়ে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে নিউ জিল্যান্ড ও সুইডেন। ২০২৩ সালে আইসল্যান্ড তৃতীয় স্থানে থাকলেও এবার দেশটি চতুর্থ স্থানে নেমে এসেছে।
এদিকে, ২০২৪ সালেও গণতন্ত্র সূচকে তলানিতে (১৬৭তম) রয়েছে আফগানিস্তান। দেশটির স্কোর ০.২৫। ২০২৩ সালে তা ছিল ০.২৬। ২০২৩ সালের মতো এবারও আফগানিস্তানের ওপরের দুই অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে মিয়ানমার (১৬৬তম) ও উত্তর কোরিয়া (১৬৫তম)।
এবারের তালিকায় যুক্তরাজ্যের অবস্থান আগের তুলনায় এক ধাপ এগিয়ে ১৭-তে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও আগের বছরের তুলনায় এক ধাপ এগিয়ে ২৮-এ উঠে এসেছে। তবে দেশটির গণতন্ত্র “ত্রুটিপূর্ণ শাসনব্যবস্থা”র অন্তর্ভুক্ত।
কর্তৃত্ববাদী ক্যাটাগরিতে থাকা চীনের অবস্থান তিন ধাপ এগিয়েছে, তাদের অবস্থান ১৪৫। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনি-বিসাউয়ের সঙ্গে এবার যৌথভাবে ১৫০তম অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া। গতবার রাশিয়া ছিল ১৪৪তম।
এছাড়া সাম্প্রদায়িকতার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতে বিজেপি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিয়েছে এবং এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেছে যেখানে মুসলিমবিরোধী মনোভাব কেবল সহ্যই করা হচ্ছে না বরং রাজনৈতিক অভিজাতদের দ্বারা তা প্রায়শই উৎসাহিত হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতারা সমর্থন বাড়ানোর জন্য ক্রমবর্ধমানভাবে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির আশ্রয় নিচ্ছে, যা সামাজিক সংহতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এরপরও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। দেশটির অবস্থান ৪১তম, ২০২৩ সালেও তা-ই ছিল। এরপর রয়েছে যথাক্রমে শ্রীলঙ্কা ৬৭তম, ভুটান ৭৯তম, নেপাল ৯৬তম, পাকিস্তান ১২৪তম।
এশিয়ায় গণতন্ত্র সূচকে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে যেসব দেশ বেশি খারাপ করেছে, সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পর পাকিস্তান অন্যতম। আগের বছরের তুলনায় ২০২৪ সালে দেশটির অবস্থান ছয় ধাপ পিছিয়েছে। তবে এই অঞ্চলে ২০২৩ সালের তুলনায় ১০ ধাপ পিছিয়ে ২০২৪ সালে ৩২তম অবস্থানে নেমে গেছে দক্ষিণ কোরিয়া।



