সরকারী ধান চাল সংগ্রহের নানান শর্তের বেড়াজালে আবদ্ধ রয়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা। চালে ১২%-এর কম আর্দ্রতা, ব্যাংক হিসাব থাকাসহ এসব শর্তকে কৃষকরা ঝামেলা মনে করেন। ফলে সরকারি গুদামে বেশি দামে ধান বিক্রি না করে বাজারে কম দামে ধান বেচে দেন তারা। এতে তারা নগদ টাকা পান। সরকারি গুদামে বার বার ঘোরা ও বাড়তি শ্রমসহ খরচ থেকে বাঁচেন কৃষকরা।
মাহমুদকাঠির সাধন কুমার দাশ জানান, ৮ বিঘায় বোরো মৌসুমে ১৮০-২০০ মন ধান হয়। আমনে ১৬০ মন। হাটে নিয়ে বিক্রি করেন। সরকারি গুদামে বেচতে হলে ৪-৫ বার রোদে দিতে হয়। যা বাজারে ১-২ বার রোদে দিলে চলে। ৫০ টাকা বেশি পেতে নানান শর্ত মাথায় নিতে হয়। রোদ বৃষ্টির সময়ে টানা রোদ পাওয়াও সমস্যা। বিঘা প্রতি ৪ হাজার টাকা লাগে পানি খরচ। সরকারি ভিত্তি বীজ ভালো। নষ্ট হয় না। বিঘায় গড়ে ৫-৬ কেজি বীজ লাগে। সরকারি বীজ ধান ৬০ টাকা কেজি। ১২০ টাকা কেজি কোম্পানির বীজ। সরকারি বিভাগ শর্ত বেশি দেওয়ায় সমস্যা। ঝামেলা হয়। হাটে গেলে দাম কম হলেও সমস্যা নেই। ঝামেলা মুক্ত থাকা যায়।
মাহমুদকাঠির পুর্ণিমা দাশ জানান, ৪-৫ বিঘা জমিতে ভালো ধান পান। বাৎসরিক চাহিদা মেটে। অ্যাওসেড বীজ দেয়। ঢেরস, করলা, উচ্ছেসহ বিভিন্ন সবজিও চাষ হয়। ধানে মাজরা পোকার সমস্যা হয়। কৃষি বিভাগ থেকে পরামর্শ নিয়ে সমাধান করা হয়।
মাহমুদকাঠির পরিতোষ দাশ জানান, ধান পাট, শাক-সবজি, ওল, কচুর মুখীসহ বিভিন্ন ফসল হয়। ৪-৫ বিঘা জমি রয়েছে। দেড় বিঘায় ধান চাষ হয়। এ বছর বিঘায় ২৪ মন পাওয়া গেছে। এ ফসল বিক্রি হয় বাজারে। শর্তের কারণে অ্যাপের মাধ্যমে বা সরকারি গুদামে বিক্রি করা হয় না।
মাহমুদকাঠির সন্তোষ দাশ জানান, ৪-৫ বিঘা জমিতে ধান চাষ হয়। সময়মতো সার পান না। দাম বেশিও হয় সময় সময়। ইউরিয়া, ফসফেট, ড্যাব নিয়ে সমস্যা হয়। কৃষি অফিসারদের জানালেও সমাধান নেই। সার সময়মতো দিতে না পারায় উৎপাদনে প্রভাব পড়ে। ৬০ বছর ধরে ধান চাষ করেন। তাপমাত্রা ও বৃষ্টির প্রভাব বেড়েছে এবার।
মাহমুদকাঠির চুমকি দাশ জানান, আগে জমিতে চাষ করে সংসার চলা দায় ছিল। এখন চাষের উন্নতি হওয়ায় ধানের উৎপাদন বেড়েছে। ফলে সংসার চালানোর পরও বিক্রি করতে পারেন। সরকারি গুদামে দাম বেশি হলেও ঝামেলা মেলা। তাই বাজারে কম দামে বিক্রি করেন। জলাবদ্ধতার কারণে দুই বছর আগে মাত্র ৭ মন ধান হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে ৪০-৫০ মন ধান হয় ৩ বিঘায়। খরচ বেশি হওয়ার কারণে সরকারি শর্ত মেনে ধান দেওয়া কঠিন হয়। তাই বাজারে বিক্রি করে দিতে হয়।
ঠাকুর দাশ জানান, কারেন্ট পোকার আক্রমণ হয়, পানিতে সমস্যা হয়। মাজরা পোকায় আক্রমণ করে। ভাটার পাশ দিয়ে পানি নিষ্কাশনের সমস্যায় জলাবদ্ধতা বাড়ে।
মাহমুদকাঠির মনিরুল ইসলাম জানান, ১৭ শতকে বীজ ফেলেন। দুই সপ্তাহ ধানের চারা পানির নিচে ছিল। ১০-১২ বিঘায় রোপণ হতো। ৭০% চারা নষ্ট হওয়ায় নতুন বীজ লাগবে। ৭০ মন ধান ৩ বিঘায় আসে। বাজারে বিক্রি করেন। সরকারি বিক্রিতে দাম বেশি, কিন্তু ঝামেলা। ক্ষুদ্র পরিসরে নেয় না।
নোয়াকাটির সেলিম পারভেজ জানান, ২-৩ বিঘা জমির ২ বিঘাতে ২৫-৩০ মন ধান হয়। এবার ধানের পাতা ডুবেছে। অর্ধেকের বেশি পাতা নষ্ট হয়ে গেছে। ১১, ৪৯ ও ৩০ ধানের পাতা ফেলেছেন। বোরো মৌসুমে ধান ভালো হয়। বর্ষা মৌসুমে সার কীটনাশক লাগে। পোকার উপদ্রব বেশি। বিক্রি করেন না। কেনাও লাগে।
নোয়াকাটির পারভিন বেগম জানান, এক বিঘা ধানি জমি আছে। ধান কিনতে হয়। ভালো ধান পানিতে ধরা খেলে সমস্যা হয়। পোকা লাগে।
নোয়াকাটির মুজিবর সরদার জানান, আড়াই বিঘায় ধান চাষ করেন। বৃষ্টির সময় সমস্যা হয়। গাছপালা ঘেরা জমি। ঝামেলার কারণে কৃষি বিভাগে ধান বেচেন না। ৪ কাঠা জমির পাতা বৃষ্টিতে নষ্ট হয়েছে অর্ধেকের বেশি। ১৩ কেজি নষ্ট হওয়ার পর আবার ৫ কেজি বীজ ফেলা হয়েছে। ৫৮ বছর বয়সের মধ্যে তিনি এ রকম টানা দেড় মাস ধরে বৃষ্টি দেখেননি।
এওসেডের কমিউনিটি মোবিলাইজার সুপ্রিয়া মণ্ডল জানান, ৩৪২ কৃষি পরিবারে সদস্য ৬৬৫ জন। মাহমুদকাঠি, রামনাথপুর, বাকা ও নোয়াকাঠি গ্রামের বাসিন্দা তারা। এওসেড ৬৭ ও ৮৯ বীজ শেয়ার কষ্টে ২৫% মূল্যে দেয়। কৃষকদের পরামর্শসহ বীজ সহায়তা দেয়।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, খুলনা জেলায় আউশ আমন বোরো চাষ হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৯৯২ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন হয়। পাওয়া যায় ৬ লাখ ৪ হাজার ৮৬০ টন চাল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৭০ হাজার ১১৩ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন হয়। ৬ লাখ ২৪ হাজার ৬৪৭ মেট্টিক টন চাল পাওয়া যায়। খুলনা জেলায় গত ৫ বছরে ধানের আবাদ ও উৎপাদন বাড়লেও পাইকগাছা উপজেলায় গত বছর আবাদ ও উৎপাদন কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাইকগাছা উপজেলায় ২১ হাজার ৬৮৫ হেক্টর জমিতে আবাদ করে উৎপাদন হয় ৭৫ হাজার ৪৫৫ টন চাল। অথচ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ উপজেলায় ২৩ হাজার ৩৪৩ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়ে ৮১ হাজার ৩৮৪ মে টন চাল উৎপাদন হয়েছিল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার উপপরিচালক নজরুল ইসলাম বলেন, “ওপরের পানি আসতে না পারার কারণে খুলনা অঞ্চলের নদী-খাল পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে জলাবদ্ধতা লবণাক্ততা বাড়ছে। আধুনিক চাষ পদ্ধতির কারণে প্রতি বছরই ধানের উৎপাদন বাড়ছে। দুর্যোগের কারণে মাঝে মধ্যে সমস্যা হয়। এ বছর ৫ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত টানা বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ৫৭৫ হেক্টর বীজতলার মধ্যে ১০৬ হেক্টর আমন বীজতলা নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে ৫৩ হেক্টর জমিই পাইকগাছায়। খুলনায় ২০.৮৭০ হেক্টর ফসলের মধ্যে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮৪৮ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সংখ্যা ১৩,০৭১ জন। এতে মোট আর্থিক ক্ষতি ২৭ কোটি ৬৫ লাখ ৯৭ হাজার। দুর্যোগ এ অঞ্চলের নিত্যসঙ্গী। ফলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে খাপ খাওয়াতে না পেরে কর্মের খোঁজে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হচ্ছেন।”
খুলনা জেলা খাদ্য কর্মকর্তা কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, “চলতি বছর খুলনায় ধান চাল সংগ্রহ ভালো হয়েছে। ধান লক্ষমাত্রার চেয়ে বেশি সংগ্রহ হয়েছে। চাল সংগ্রহ হয়েছে ৮৫%। এখন সময় আছে। চাল সংগ্রহের লক্ষমাত্রাও ছাড়িয়ে যাবে বলে তিনি আশা করেন। গত বছর সিদ্ধ চাল ৯৩%, আতপ চাল ১০০% ও ধান ৯৮% সংগ্রহের লক্ষমাত্রা অর্জিত হয়েছিল।”



