Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ইউনিসেফ: বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ শিশু বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার

প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা ৩৫% বেশি

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৫, ০৭:০৭ পিএম

বাংলাদেশের প্রতি ১০টি শিশুর মধ্যে প্রায় তিনজন (২৮.৯%) বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। যা দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী প্রাপ্তবয়স্কদের হারের (২১.৪৪%) চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর ফলে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে শিশুরা বাংলাদেশে বিদ্যমান দারিদ্র্যের কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত জাতীয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক বা মাল্টিডাইমেনশনাল পোভার্টি ইনডেক্সে (এমপিআই) এই চিত্র উঠে এসেছে। ইউনিসেফ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সহাযোগিতায় এই সূচক প্রকাশ করেছে জিইডি।

এই প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মানের ক্ষেত্রে শিশুরা যেসব বঞ্চনার শিকার হয় এবং যা প্রতিনিয়ত তাদের অধিকার ও সম্ভাবনাকে ব্যাহত করে চলেছে, সেসব অবিলম্বে মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

এমপিআই-এ একটি বিস্তৃত ও সমন্বিত পদ্ধতি। যেখানে দারিদ্র্য পরিমাপ করা হয়, শুধু আয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং শারীরিক দুর্বলতা বা খারাপ স্বাস্থ্য, শিক্ষার সুযোগের অভাব, অপর্যাপ্ত পুষ্টি, অনিরাপদ জীবনযাপন বা থাকার ব্যবস্থা ও অত্যাবশ্যকীয় সেবাসমূহের অভাব - এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মূল্যায়ন করা হয়। এইসব সূচকের অন্তত দুটি দ্বারা প্রভাবিত হলে তাকে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসরত বলে বিবেচনা করা হয়।

এমপিআই অনুযায়ী, সার্বিকভাবে বাংলাদেশে তিন কোটি ৯০ লাখের বেশি মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে।

অর্থনৈতিক দারিদ্র্য ও খর্বকায় শিশুর সংখ্যা হ্রাসে অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশে বহুমাত্রিক শিশু দারিদ্র্য এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। কারণ প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা ৩৫% বেশি।

এছাড়াও গ্রামীণ এলাকার শিশুরা শহরাঞ্চলের শিশুদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি মাত্রায় বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার হচ্ছে। এমপিআই-এ স্কুলে উপস্থিতিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, শিশুর শিক্ষা-সংক্রান্ত বঞ্চনাগুলো শিশুদারিদ্র্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালক।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, “যখন দারিদ্র্যের একাধিক মাত্রাগুলোকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়, তখন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিশুদারিদ্র্য প্রতিরোধ করা সম্ভব। এটি শুরু হয় শিশুদের যে সকল ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হতে হয়, তার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে।”

তিনি বলেন, “এমপিআই’র সৌজন্যে এখন আমাদের হাতে একটি কার্যকরী টুল (উপকরণ) আছে, যার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি কোথায় এবং কীভাবে শিশুদারিদ্র্য বাংলাদেশের শিশুদের জীবনে প্রভাব ফেলছে; পাশাপাশি আমাদের এখন একটি প্রাথমিক ভিত্তি রয়েছে, যা ব্যবহার করে ভবিষ্যতে শিশুদের বহুমাত্রিক বঞ্চনা মোকাবিলায় অগ্রগতি মূল্যায়ন করা যাবে।”

তিনি আরও বলেন, “যখন প্রতি ১০টি শিশুর মধ্যে তিনটি শিশুই এই দারিদ্র্যের শিকার, সেসময়ে মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের মাধ্যমে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগ গৃহীত এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নীতিনির্ধারকদের কাছে এমন স্পষ্ট তথ্য প্রদান করবে, যা তাদের নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে, সামাজিকখাতে আরও সচেতন ও পরিকল্পিত বিনিয়োগ করতে এবং কার্যকরী ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে। এই মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে এই বছর আবারও করা হবে।”

প্রতিবেদনে অঞ্চলভিত্তিক দারিদ্র্য বৈষম্যের চিত্রও উঠে এসেছে। দেশের পাঁচটি জেলায় ৪০%-এর বেশি মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার: বান্দরবান, কক্সবাজার, সুনামগঞ্জ, রাঙ্গামাটি ও ভোলা। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার রয়েছে বান্দরবানে (৬৫.৩৬%)। আর দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে সিলেট বিভাগে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি, যা ৩৭.৭০%। কক্সবাজার, সুনামগঞ্জ, রাঙ্গামাটি এবং ভোলায় বিদ্যমান উচ্চমাত্রার বহুমাত্রিক দারিদ্র্য, পূর্বাঞ্চলীয় বিভাগের একটি আঞ্চলিক দারিদ্র্য-ক্লাস্টার বা দারিদ্র্যের ঘনত্বের ইঙ্গিত দেয়। শিশু দারিদ্র্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো পূর্বাঞ্চলের অঞ্চলগুলোতে বেশি। অপরদিকে অর্থনৈতিক দারিদ্র্য উত্তরাঞ্চলে বেশি।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “নীতিনির্ধারকদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা এলাকার বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক (এমপিআই) বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো এর অন্তর্নিহিত কারণসমূহ উদঘাটন করা। আমাদের প্রতিটি সূচকের গভীরে যেতে হবে, বুঝতে হবে কীভাবে এবং কেন তা সামগ্রিক বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকে প্রভাব রাখছে।”

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিভিন্ন খাতে সমন্বয়ের ঘাটতি ও দুর্বলতা এবং সাম্প্রতিক অস্থিরতার মতো বিষয়গুলো, বহুমাত্রিক শিশু দারিদ্র্য মোকাবিলার জন্য যে জরুরি বিনিয়োগ প্রয়োজন তা সীমিত করছে। আর এর ফলে অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফার্স্ট কাউন্সেলর অ্যান্ড অ্যাক্টিং হেড অফ ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এডউইন কুককুক বলেন, “বাংলাদেশের সমৃদ্ধির জন্য এটি অত্যাবশ্যক যে দেশের সকল মানুষ—বিশেষ করে যারা এখনও দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে আছে—সমান সুযোগ ও মর্যাদা লাভ করবে। এর জন্য অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী উভয় ধরনের আত্মবিশ্লেষণ প্রয়োজন: অন্য দেশগুলোর সমন্বিত অ্যাপ্রোচ (পদ্ধতি) থেকে প্রাসঙ্গিক শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি দেশের নিজস্ব উদ্ভাবন- যেমন বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রামের মতো উদ্যোগের মূল্যায়ন ও সম্প্রসারণ প্রয়োজন।”

তিনি আরও বলেন, “এই প্রতিবেদনটি আমাদের সঠিক ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটি মজবুত ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। আসুন আমরা সবাই—সরকার, সুশীল সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী এবং জনগণ—একত্রে কাজ করি, যাতে বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে আরও সমতাভিত্তিক, সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় একটি দেশ যেখানে পিছিয়ে থাকবে না কেউ।”

কার্যকরভাবে বহুমাত্রিক শিশুদারিদ্র্য কমানোর লক্ষ্যে এমপিআই-এর তথ্য ব্যবহার করে সমতাভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন, সুনির্দিষ্ট লক্ষভিত্তিক বিনিয়োগ এবং বাসস্থান, ইন্টারনেট প্রাপ্তি, পয়ঃনিষ্কাশন ও প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সম্পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বঞ্চনার ক্ষেত্রগুলোর সমাধানে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন এবং আসন্ন সরকার ও অংশীজনদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ। এক্ষেত্রে দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকা ও গ্রামীণ অঞ্চলে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন; পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ), বিদ্যুৎ, রান্নার জন্য নিরাপদ জ্বালানি ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বিশেষ নজর জরুরি।

সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি), ইউনিসেফ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অক্সফোর্ড পোভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (ওপিএইচআই)-এর মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে এমপিআই উদ্যোগটি বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এটি বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে করা হয়েছে।

   

About

Popular Links

x