প্রায় দুই বছর পর নীতি সুদহার কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে নীতি সুদহার ১০% থেকে ৯.৫০% করা হয়েছে। আগামী ২ আগস্ট থেকে নতুন হার কার্যকর হবে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটারি পলিসি কমিটির (এমপিসি) বৈঠকে নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, দেশীয় বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্যসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন এমপিসির সদস্যরা।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর নীতি সুদহার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদে ব্যাংকগুলোর নেওয়া ঋণের সুদহার ১১.৫০% থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ১১% করা হয়েছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ব্যাংকগুলোর রাখা আমানতের সুদহার হিসেবে ব্যবহৃত স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) হার আগের মতো ৭.৫০% রাখা হয়েছে।
গত ৩০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য পরবর্তী ছয় মাসের মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক নীতি বজায় রেখে ওই মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ১০% রাখা হয়েছিল।
চাহিদা কমে যাওয়ায় নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও কমানো হয়। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৬.৮%-এ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের মুদ্রানীতিতে জুন শেষে এই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে ৮%। তবে গত এপ্রিল শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৭৫%।
নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী ছয় মাসে অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০.৫%। আগের মুদ্রানীতিতে এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে ১১%। গত এপ্রিল শেষে এ খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯.৬৫ %।
অন্যদিকে, নতুন মুদ্রানীতিতে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২১.৮%। আগের মুদ্রানীতিতে এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১.৬%। গত এপ্রিল শেষে সরকারি ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩০.৩৭%।
গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর গত মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো তার নেতৃত্বে মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। সরকারের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি তারল্য নিয়ন্ত্রণের কৌশল নির্ধারণ করা হয় ওই মুদ্রানীতিতে।
সরকারের আর্থিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়ে অর্থনীতিতে কী পরিমাণ অর্থের সরবরাহ থাকবে, তার একটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা থাকে মুদ্রানীতিতে। বাংলাদেশ ব্যাংক ছয় মাস পরপর মুদ্রানীতি ঘোষণা করে।
এর আগে , অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঘোষিত মুদ্রানীতিতেও সংকোচনমূলক অবস্থান বজায় রাখা হয়েছিল। তখনও নীতি সুদহার ছিল ১০%।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ২০২২ সালের শেষ দিকে নীতি সুদহার বাড়াতে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপরও ২০২৪ সালে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কে পৌঁছায়। ওই বছরের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি রেকর্ড ১১.৬৬% হয়।
এরপর ওই মাসে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আগস্টে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। সেখানে নীতি সুদহার ১০% নির্ধারণ করা হয়, যা নভেম্বরে কার্যকর হয়। এরপর কয়েক দফা মুদ্রানীতি ঘোষণায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল।
বর্তমান সরকারের আমলে প্রথম মুদ্রানীতি ঘোষণার এক মাসের মাথায় এবার নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিলো বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটারি পলিসি কমিটি।
চলতি অর্থবছরে এমপিসির প্রথম সভাটি বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ কক্ষে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কমিটির সদস্য ও ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান, অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কামাল মুজেরী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ফিরদৌসি নাহার, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আক্তার হোসেন এবং নির্বাহী পরিচালক ইমাম আবু সাঈদ উপস্থিত ছিলেন।



