বাজার সিন্ডিকেটের বিষয়ে গত ২৬ জুন জাতীয় সংসদে এবং গত ১ জুলাই খুলনা শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে রোটারি ক্লাবের ডিস্ট্রিক্ট ইয়ার লঞ্চিং অনুষ্ঠানে কথা বললেও এখন তা মানতে নারাজ বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।
এখন তিনি বলছেন, “পণ্যের ঘাটতি তৈরি হলে কিছু ব্যবসায়ী সুযোগ নেয়। বাজারে সিন্ডিকেট আছে, সিন্ডিকেট ভাঙা হবে এ ধরনের কথা আমি কখনো বলিনি। আমি বলেছি, মাঝেমধ্যে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়, সেক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী? ভোক্তা অধিকারসহ নানা সংস্থা কাজ করছে। কিন্তু জনবল কম। এটা নিয়ে নানা সময়ে কথা বলেছি।”
বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ে মঙ্গলবার (২৯ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলে সেখানে বাণিজ্যমন্ত্রীর আগে দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ আসে। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টা নিয়ে “বাণিজ্যমন্ত্রীকে ধরতে” চাওয়ার কথা বলেন।
তার একদিন পরেই বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে আমেরিকান চেম্বার্সের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিন্ডিকেট নিয়ে বক্তব্য দেননি বলে জানালেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
এর আগে গত ২৬ জুন জাতীয় সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, “চাইলে জেল-জরিমানাসহ বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। তবে আমাদের লক্ষ্য রাখা দরকার- আমরা জেলে ভরলাম, জরিমানা করলাম; সেটা হয়তো করা সম্ভব। কিন্তু তাতে হঠাৎ করে ক্রাইসিসটা তৈরি হবে, সেটাও তো সইতে আমাদের কষ্ট হবে। এ জন্য আমরা আলোচনার মাধ্যমে নিয়মের মধ্যে থেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি।”
বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলা অবস্থায় গত ১ জুলাই খুলনা শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি দ্রব্যমূল্যের বাজার সিন্ডিকেট ভাঙার। তবে এই সিন্ডিকেট এক দিনে গড়ে ওঠেনি; দীর্ঘ দিন ধরে এটি প্রতিষ্ঠিত। তাই ভাঙতে সময় লাগছে। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি ভাঙার।”
বুধবার বাণিজ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়- আপনি বলেছিলেন যে, যখন ক্রাইসিস শুরু হয় তখন ব্যবসায়ীরা সুবিধা নিলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আরও বেশি ক্রাইসিস তৈরি হতে পারে। সে কারণে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। জাতীয় সংসদেও আপনি এটি বলেছেন।
এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি যে কথাটা বলেছিলাম, জেল-জুলুম এ ধরনের ব্যবস্থা নিলে পরে...। আমি সেটেল করছি আলোচনার মাধ্যমে। যেটা লজিকাল হয়। হঠাৎ করে জেল-জুলুম দিলে পরে মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। আমি এটাই বলেছিলাম। তবে আলোচনা করে আমরা ব্যবস্থা নিতে চাই।”
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ার পর আমি বলেছিলাম, প্রয়োজনে সরবরাহ ঠিক রাখতে ডিম আমদানি করা হবে। সে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছি সব সময়।”
তাহলে কি বলছেন সিন্ডিকেট বলতে কোনো কিছু নেই বাজারে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সিন্ডিকেটের একটি বিশাল অর্থ বিশাল ব্যাপার। আজ দেখেন সিন্ডিকেটের অল্প কিছু, ডিম নিয়ে দেখেন গ্রামে গ্রামে লাখ লাখ ডিম উৎপাদন হয়। সেখানে সিন্ডিকেটের কথা বলব কেমন করে। একজন দুজন তো ডিমের ব্যবসা করছে না।”
কোনোভাবেই তো বাজার নিয়ন্ত্রণে আসছে না, আজ একটা বাড়লে কাল আরেকটার দাম বাড়ছে। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, ভারতের বাজার আর আমাদের বাজারের তারতম্য অনেক- এমন প্রশ্নের জবাবে টিপু মুনশি বলেন, “ভারতের সঙ্গে সব বিষয়ে তুলনা করা সম্ভব নয়। আজ ভারতে চিনির দাম কম, কারণ তাদের উৎপাদন যেটা হয় চাহিদা মেটানোর পরও রপ্তানি করে। আর আমাদের ৯৯.৯% বাইরে থেকে আনতে হয়। সব জিনিস একরকম হবে তা কিন্তু নয়। কখনো কখনো কোনো কোনো জিনিস একরকম হয়। পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেল, তখন ভারতে রেশনিং চালু করেছিল। যখন কাঁচা মরিচের দাম বাড়ল তখন ৩৫০ রূপিতে বিক্রি হয়েছে। এই মুহূর্তে দেখেন পেঁয়াজের ওপর ট্যাক্স বাড়িয়ে দিয়েছে।”
ডিমের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “আমি সেদিনও বলেছি, ডিমের কি দাম হওয়া উচিত সেটা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ঠিক করবে না। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় দাম নিদিষ্ট করে দিয়েছে, এরকম দাম হওয়া উচিত। আমরা চেষ্টা করছি তারা যে দামটা নির্ধারণ করে দিয়েছেন সেটা যেন বাজারে থাকে।”
সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ে তিনি বলেন, “গ্লোবাল অবস্থাটা দেখেন, আপনারা যখন দেখেন ইংল্যান্ডের দোকানেও যখন তিনটার বেশি টমেটো কেনা যাবে না, সে বিষয়ে রেস্ট্রিকশন দিয়ে দেয়। জার্মানিও দোকানগুলোতে তেলের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়। আমাদের এখানেও নিশ্চয়ই প্রভাব পড়েছে। মুহূর্তের মধ্যে সমাধান হবে তেমন তো নয়, তবে আমাদের প্রতিনিয়ত চেষ্টা চলছে। গ্লোবাল এই দুরবস্থার মধ্যেও যেন আমরা ঠিক থাকতে পারি।”



সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে বাজারে সংকট তৈরি হবে, বললেন বাণিজ্যমন্ত্রী
সিন্ডিকেট ভাঙার চেষ্টা চলছে, জানালেন বাণিজ্যমন্ত্রী