দেশের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত মানুষ সপ্তাহে একদিন গরুর মাংস দিয়ে আহার করে পরিতৃপ্ত হতে চান। কিন্তু দাম বাড়তে বাড়তে এই খাদ্যদ্রব্যটি চলে গিয়েছিল তাদের নাগালের বাইরে। তবে সম্প্রতি কমতে শুরু করেছে দাম। কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে জনমনে।
এ বছরের বেশিরভাগ সময় গরুর মাংসের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৮০০ টাকা। যা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ৫৯৫-৬০০ টাকায়। কেজিতে ২০০ টাকা দাম পড়ে যাওয়ায় ভিড় পড়েছে মাংসের দোকানগুলোতে। তবে ভোটের আগ পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় গরুর মাংস পাওয়া যাবে ৬৫০ টাকা কেজি দরে।
এই মূল্যহ্রাসের পেছনের নায়ক ঢাকার শাহজাহানপুর এলাকার খলিল আহমেদ নামে এক ব্যবসায়ী। তার উদ্যোগেই এই আমিষ পণ্যটির দাম কমতে শুরু করে। ঢাকা ট্রিবিউনকে তিনি বলেছেন সেই গল্প।
খলিল বলেন, “সবাই যাতে মাংস কিনে খেতে পারে সেজন্যই এই উদ্যোগ। সামর্থ্যের অভাবে মানুষ মাংস কেনা বন্ধ করে দিয়েছিল। অবস্থা এমন ছিল তারা দোকানের সামনে থেকে ঘুরে যেত, কিন্তু কিনতে পারত না।”
তবে দাম কমানোর পর তার দোকানে বেচাকেনা বেড়ে গেছে। খলিল বলেন, “আগে দৈনিক তিন থেকে চারটি গরু বিক্রি হতো। দাম কমার পরে এখন দৈনিক ৩০ থেকে ৩৫ টি গরু বিক্রি হয়।”
কেউ কেউ আবার গরুর মাংসের দাম কমার কারণ হিসেবে বলছেন ঈদ-উল-আযহার কথা। কিন্তু খলিল মনে করেন চাহিদা কমার কারণেই দাম কমেছে।
তার কথায়, “মানুষ আসলে গরুর মাংস খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। এ কারণে পশু বিক্রিও কমে গিয়েছিল। অবিক্রিত থেকে যাচ্ছিল বহু গরু। তাই এখন খামারি-ব্যাপারিরাও কম দামে গরু বিক্রি করছেন।”
তবে খলিলের এই উদ্যোগকে খুব একটা ভালোভাবে নেননি সব ব্যবসায়ী।
গত ৩ ডিসেম্বর জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর একটি সেমিনারের আয়োজন করে। এতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশন, কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, সুপারশপের প্রতিনিধি এবং স্বয়ং খলিল। সেমিনারে খলিলের কম দামে মাংস কেনার বিষয়ে আলোচনা হয়। তিনি সবার সামনে তার ব্যবসাপদ্ধতি তুলে ধরেন। কিন্তু অন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে খলিল ও ক্যাবের রীতিমতো বাগ্যুদ্ধ হয়ে যায়।
কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয় সভা। ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম শফিকুজ্জামান তখন মাংসের দাম নির্ধারণ করে অধিদপ্তরকে তা জানানোর জন্য বলেন।
খলিলের মাংসের গুণাগুণ সম্পর্কে অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার সভায় বলেন, “অনেকে বলছেন খলিলের মাংসের কোয়ালিটি খারাপ। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে তার মাংসের গুণাগুণ অন্যদের চেয়ে ভালো।”
খলিল নিজেও তার পণ্যের গুণাগুণ ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমার মতো সুন্দর ও ভালো মানের মাংস কেউ বিক্রি করে না। সবাই জানে এটা।”
কোনো ব্যবসায়ীকেই শত্রু মনে করেন না তিনি। বলেন, “কেউ আমার শত্রু না। সবাই আমার ভাই। দিনশেষে আমরা সবাই ব্যবসায়ী। আমরা যদি একযোগে দাম কমাতাম তাহলে কোনো সমস্যাই দেখা দিত না।”
খলিলের এলাকার আরেক মাংস বিক্রেতা হাজী মিয়া বলেন, “খলিল যেভাবে মাংস বিক্রি করে তা আমাদের ব্যবসার নীতির পরিপন্থী। যারা এলাকার মাংসের ক্রেতা তারা খলিলের দোকানের সস্তা না খুঁজে, ভালো মানের মাংস খোঁজেন। কদিন আগেও একজনের কাছে ১০০ কেজি মাংস বিক্রি করেছি। সে জানিয়েছে, খলিলের থেকে সস্তায় খারাপ মানের মাংস নেওয়ার থেকে, বেশি দাম দিয়ে ভালো মাংস নেওয়া উচিত।”
খলিলের সাম্প্রতিক সাফল্য প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বলেন, “এ কয়দিন মাংস বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছে খলিল। দেখা যাক, কতদিন সে এই দামে মাংস বিক্রি করতে পারে।”
এ বিষয়ে খলিল বলেন, “আসলে কাঁচামালের রেট কেউ ধরে রাখতে পারেন না। এর আগে কাঁচা মরিচ ২০০ টাকা কেজিতেও বিক্রি হয়েছে। আমরা যদি সবাই মিলেই কম লাভে বিক্রি করি তাহলে এতটাও বাড়বে না মাংসের দাম। তবে হ্যাঁ মাংসের দাম বাড়বে। আমার বিক্রি কমে গেলে তখন আমাকেও দাম বাড়াতে হবে। দোকানে ৩৫ জন লোক আছে তাদের নিয়ে আমাকে চলতে হয়। ভালো বেতন ছাড়া কেউ কাজ করতে চায় না।”
“সরকার উদ্যোগ নিলে আমাদের দেশে গরু মাংস ৫০০ টাকা কেজিতেও বেচা সম্ভব। আমাদের মাংস ব্যবসায়ীদের মূলত লাভ তেমন হয় না। অনেকেই অনেক কষ্টে ব্যবসা করেন। তবে মিলেমিশে থাকলে সবার ব্যবসা ভালো হয়। এভাবেই আসলে ভালো থাকা সম্ভব। কেউ ভালো থাকবে আর কেউ থাকবে না , সেই ভালো তো আর ভালো থাকা হয় না,” বলেন এই ব্যবসায়ী।
এদিকে, দ্বন্দ্ব নিরসনে বিক্রির সময় মাংস এবং চর্বির অনুপাত ঠিক করে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশন। অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, মাংস, চর্বি এবং হাড়ের অনুপাত ঠিক করে দিলে এ ধরনের বিতর্কের সমাধান হবে।
তবে দেশের আবহাওয়া অনুকূলে থাকলেও গরু উৎপাদন কম হয় বলে মনে করেন খলিল আহমেদ।
তিনি বলেন, “আমাদের দেশে কখনোই গরুর কমতি হওয়ার কথা না। আমাদের দেশে গরুর উৎপাদন অনেক ভালো হওয়ার কথা, কারণ আমাদের দেশে পানি ভালো, আবহাওয়া ভালো তবে আমাদের সেই তুলনায় গরু উৎপাদন করা হয় না।”
গরুর চামড়ার দাম নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন খলিল। চামড়ার দামে মন্দাও মাংসের মূল্যবৃদ্ধির আরেক কারণ বলে মনে করেন তিনি।
এই ব্যবসায়ী বলেন, “চামড়ার দাম আজ থেকে ১৫ বছর আগে বিক্রি করেছি ৩,৫০০ টাকায়। তাহলে এ চামড়ার দাম এখন হওয়া উচিত ৭-৮ হাজার টাকা। কিন্তু আমরা সেটা বিক্রি করে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়। এখন এ ৩,০০০ টাকার কমতির চাপটা পড়ে ভোক্তাদের ওপর। এই দামটা আমরা তাদের কাছ থেকে নিয়ে থাকি। চামড়ার বড় বড় ব্যবসায়ীদের কারণে আমাদের এ অসুবিধা। সরকার এ বিষয়ে সুনজর দিলে আমাদের জন্য খুবই ভালো হয়।”



