Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বিশ্ববাণিজ্যে জিআই স্বীকৃতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

  • ২০১৩ সালের আগে জিআই পণ্য নিবন্ধনের জন্য বাংলাদেশে কোনো আইন ছিল না
  • লড়াই শুরুর আগেই ‌‘বাংলার রসগোল্লা’, ‘নকশি কাঁথা’ ও ‘মালদার ফজলি আম’ জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধন নিয়ে নেয় ভারত
আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:০৩ পিএম

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়িকে ভারত নিজেদের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য দাবি করায় সমালোচনার ঝড় শুরু হয়েছে। তবে বিষয়টি নতুন নয়। এর আগেও কয়েকটি পণ্যের জিআই নিবন্ধন করিয়েছে ভারত, যেগুলো বাংলাদেশের আপত্তি ছিল শুরু থেকেই। 

ভারতের সঙ্গে জিআই নিয়ে বাংলাদেশের লড়াই শুরুর আগেই “বাংলার রসগোল্লা”, “নকশি কাঁথা” ও “মালদার ফজলি আম” জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধন নিয়ে নেয় ভারত। ২০১২ সালের দিকে জামদানি শাড়ি ও ইলিশকেও জিআই পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল ভারত। এসব পণ্য বাংলাদেশেই বেশি প্রসিদ্ধ ছিল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৩ সালের আগে জিআই পণ্য নিবন্ধনের জন্য বাংলাদেশে কোনো আইন ছিল না। আইন হওয়ার পর প্রথম জিআই পণ্য হিসেবে নথিভুক্ত হয় জামদানি শাড়ি। তবে ভারতও জামদানিকে জিআই পণ্য হিসেবে নথিভুক্ত করে, তবে তা “উপাধা জামদানি” নামে।

অন্যদিকে সুন্দরবনের মধুকে ভারতের জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধন দেওয়া হয় গত ২ জানুয়ারি, যার জন্য আবেদন করেছিল পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ন কর্পোরেশন।

বাংলাদেশের আইন যা বলছে

ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন ২০১৩-এর ২৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলে বা বেআইনি ব্যবহার করলে ছয় মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। তবে দুঃখজনক হলো, আইন প্রয়োগ, অসচেতনতা ও কালক্ষেপণের কারণে বাংলাদেশ অনেক পণ্যের জিআই হাতছাড়া করেছে। ১৯৯১ সালে ভারতে মেধাস্বত্ব আইন পাস হয় এবং ২০০৩ সালে কার্যকর হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়ে ভারত ১০ বছর আগে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়া শুরু করেছে। 

ডব্লিউআইপিও পরিসংখ্যানের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভারতের জিআই পণ্য ছিল ৩৩০টি। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের দখলে রয়েছে ২১টি। বর্তমানে ভারতের জিআই পণ্য রয়েছে প্রায় ৪২১টি।

দেশের যে ২১ পণ্য জিআই স্বত্ব পেয়েছে

ইলিশ, ক্ষীরসাপাতি আম, মসলিন, বাগদা চিংড়ি, কালিজিরা চাল, বিজয়পুরের সাদা মাটি, রাজশাহীর সিল্ক, রংপুরের শতরঞ্জি, দিনাজপুরের কাটারিভোগ চাল, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, কুমিল্লার রসমালাই, কুষ্টিয়ার তিলের খাজা ও ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল, জামদানি। সাম্প্রতিক সময়ে জিআই সনদ পাওয়া পণ্যগুলো হলো- বগুড়ার দই, শেরপুরের তুলসীমালা ধান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ল্যাংড়া ও আশ্বিনা আম।

১৪ পণ্যের আবেদন জমা আছে

ডিপিডিটি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, যে ১৪টি পণ্যের জন্য আবেদন জমা পড়েছে, সেগুলো হলো- যশোরের খেজুর গুড়, নরসিংদীর লটকন, নরসিংদীর অমৃতসাগর কলা, জামালপুরের নকশীকাঁথা, মধুপুরের আনারস, সুন্দরবনের মধু, মৌলভীবাজারের আগর-আতর, রংপুরের হাড়িভাঙ্গা আম, মুক্তাগাছার মণ্ডা, রাজশাহীর মিষ্টিপান, শেরপুরের ছানার পায়েশ, ভোলার মহিষের কাঁচা দুধ, গোপালগঞ্জের রসগোল্লা, নওগাঁ’র নাগ ফজলি। আবেদনের প্রক্রিয়ায় আছে দু’টি পণ্য, দিনাজপুরের লিচু ও টাঙ্গাইলের শাড়ি।

বাংলাদেশে প্রসিদ্ধ যেসব পণ্য ভারতের নামে স্বত্ব আছে

আবেদন জমা পড়লেও একই নামের পণ্যগুলো ভারতে অনেক আগে থেকেই নিবন্ধিত আছে। সেগুলো হলো- নকশি কাঁথা, বাসমতী, মোয়া, মিহিদানা, রসগোল্লা, গোবিন্দভোগ চাল, বেনারসি শাড়ি, লক্ষণভোগ আম, হিমসাগর, ফজলি আম, সুন্দরবনের মধু, রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বিশেষ করে সুন্দরবনের মধুর ৬০ ভাগই বাংলাদেশে উৎপন্ন হয়। কিন্তু জিআই স্বত্ব ভারতের নামে। আবার রাজশাহী অঞ্চলের প্রসিদ্ধ লক্ষণভোগ, হিমসাগর, ফজলি, হিমসাগর আম , এখন ভারতের নামে। প্রাচীন মালদা দেশভাগের পর ভারতীয় অংশে পড়েছে এবং এই আমগুলো সে অঞ্চলের বলে দাবি করেছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো।

জিআই নিবন্ধন নেওয়া কেন জরুরি

জিআই কোনো পণ্যের উৎপত্তিস্থল ও স্বকীয়তার নির্দেশক। কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে উৎপাদন কৌশল শিখতে পারে যে কেউ। উদাহরণস্বরূপ নাটোর থেকে কাঁচাগোল্লার প্রস্তুত প্রণালী শিখে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যত্র গিয়ে এই মিষ্টান্ন উৎপাদন করলেও এর শেকড় নাটোরেই। তাই উৎপাদনস্থলের স্বীকৃতি ও স্বকীয়তা ধরে রাখতে জিআই নিবন্ধন জরুরি।

কর্মকর্তারা যা বলছেন

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেড মার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) জিআই পণ্যের নিবন্ধন দিয়ে থাকে। তবে এ বিষয়ে আবেদন করতে হয় জেলা প্রশাসক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের পক্ষ থেকে।

ডিপিডিটির পরিচালক আলেয়া খাতুন সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “এ বিষয়ে তাঁত ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছি। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসককে টাঙ্গাইলের শাড়ির বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করতে বলেছি। আশা করছি, টাঙ্গাইলের শাড়ির জিআই আমাদের দেশেরই থাকবে।”

এদিন বৈঠকের পর বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক সাংবাদিকদের বলেন, টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই নিবন্ধনে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আলেয়া বলেন, “টাঙ্গাইল বাংলাদেশের একটি ভৌগোলিক এলাকা। ভারত তাদের এলাকার জিআই দিতে পারে। টাঙ্গাইলের শাড়ির জিআই তারা দিতে পারে না।”

সুন্দরবনের মধুর বিষয়ে ডিপিডিটি পরিচালক বলেন, “সুন্দরবনের মধুর জিআই পেতে কিছুটা সময় লাগবে। ওখানকার বন বিভাগ জানিয়েছে, তাদের সক্ষমতা নেই। এ কারণে আমরা বিষয়টি অন্য জায়গায় পাঠাচ্ছি।”

এ নিয়ে জাতিসংঘে আপত্তি জানানোর সুযোগ আছে জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, “আমরা চাইলে আন্তর্জাতিকভাবে কথা বলতে পারি। বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থা বা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনে (ডাব্লিউআইপিও) আপত্তি জানানো সম্ভব। সুযোগ আছে।”

জিআই স্বত্ব নিতে ভারতীয়রা কেন এত আগ্রহী

ইন্টারন্যাশনাল প্রোপার্টি রাইটস অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউআইপিও) সংজ্ঞা অনুসারে, জিআই বলতে কোনো পণ্যের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান, নাম বা চিহ্নকে বোঝায়। ভৌগোলিক কারণে সে পণ্যের আলাদা গুণ ও খ্যাতি থাকতে হয়। যেহেতু এর গুণাগুণ ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে, কাজেই পণ্য ও এর উৎপত্তিস্থলের মধ্যে সুস্পষ্ট সম্পর্ক থাকে।

ভারত কেন জিআই স্বত্ব পেতে আগ্রহী সে বিষয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক জাহাঙ্গীর সুরের সঙ্গে। তার মতে, জিআই স্বীকৃতি পেলে পণ্যের আলাদা কদর তৈরি হয়। দেশে-বিদেশে সে পণ্যের ব্র্যান্ডিং হয়ে যায়। বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়া সহজ হয়। জিআই পণ্য থেকে সমমানের অন্য পণ্যের পার্থক্য ধরা যায়। 

তিনি জানান, ২০১৩ সালে দেশে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন হয়। ২০১৫ সালে আইনের বিধিমালা তৈরির পর জিআই পণ্যের নিবন্ধন নিতে আহ্বান জানায় পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেড মার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)। ডব্লিউআইপিও নিয়ম মেনে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি ও সনদ দিয়ে থাকে ডিপিডিটি। 

ঢাকা ট্রিবিউনকে এই গবেষক আরও জানান, জিআই ট্যাগের সুবিধা হলো নিজেদের আঞ্চলিক ও বিশেষ পণ্যের আইনি সুরক্ষা পাওয়া যায়। যাতে করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্য কেউ বা কোনো দেশ সে পণ্যের মালিকানা বা স্বত্ব দাবি করতে না পারে। সংশ্লিষ্ট পণ্যের পুরো সুবিধাভোগী সে দেশই হতে পারে।

অর্থনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ জিআই

প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা বাংলাদেশে জিআই পণ্য হাতেগোনা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ইসতিয়াক রায়হান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “জিআই পণ্যের স্বীকৃতিতে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে, যা আশাব্যঞ্জক নয়। পিছিয়ে থাকার কারণ হলো এ দিকটাতে মনোযোগ নেই।”

অর্থনীতির এই শিক্ষক বলেন, “জিআই পণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ের ফলে দেশে পর্যটন ও রপ্তানি বাড়ে, কৃষক, উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা লাভবান হন। এসব পণ্য ক্রেতারা বাড়তি দাম দিয়ে কিনতেও রাজি থাকেন।”

তার মতে,  সাধারণ মানুষ জিআই নিবন্ধনের বিষয়ে যত জানবে, ঐতিহ্যবাহী পণ্য সুরক্ষায় তত এগিয়ে আসবে।

ইসতিয়াক জানান, প্রতিবেশী ভারত শুধু জিআই পণ্যের সংখ্যায় সমৃদ্ধ হয়নি, দেশটিতে এসব পণ্য এক প্ল্যাটফর্মে পাওয়ার সহজ ব্যবস্থা রয়েছে। ‘‘আমরা স্থান, উৎপাদক ও পণ্য বুঝি’’- এ স্লোগানে ২০১৬ সালে দেশটিতে জিআই ট্যাগড নামে একটি কোম্পানির যাত্রা শুরু হয়। কোম্পানিটি জিআই পণ্য উৎপাদন, প্রচার ও বিপণনে কাজ করে। বর্তমানে জিআইট্যাগডডটকম-এ দেশটির স্বীকৃত পণ্যগুলো পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশেও জিআই পণ্যের ই-কমার্স সাইট তৈরি করা যেতে পারে।

   

About

Popular Links

x