Monday, June 17, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বন্ডে বিনিয়োগ কতটা লাভজনক, যেসব বিষয় বিবেচনায় রাখা জরুরি

প্রতিষ্ঠানগুলোর ধরনের ওপর ভিত্তি করে বন্ড তিন প্রকার

আপডেট : ১৯ মে ২০২৪, ০১:৪০ পিএম

প্রথাগত সঞ্চয় হিসাবের তুলনায় অধিক লাভ পাওয়ার সেরা উপায় হচ্ছে বিনিয়োগ। এর মাধ্যমে সম্পদের ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তার মতো দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব হয়। শুধু তাই নয়; উপযুক্ত বিনিয়োগ মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলায়ও যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। এমনি একটি আর্থিক উপকরণ হচ্ছে “বন্ড”, যেখানে বিনিয়োগের বিনিময়ে স্থির আয় পাওয়া যায়। মেয়াদপূর্তিতে বেশ ভালো পরিমাণের রিটার্ন আসায় বিগত বছরগুলোতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বিনিয়োগের এই মাধ্যমটি। তবে বাজারজুড়ে যথেষ্ট ভিন্নতা থাকায়, সঠিক বন্ডটি কেনার আগে তার যথাযথ যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। চলুন, চূড়ান্তভাবে বন্ডে বিনিয়োগের পূর্বে কোন বিষয়গুলো বিবেচনা করা জরুরি, তা জেনে নেওয়া যাক।

বন্ড কী?

ঋণের বিনিময়ে একটি নিরাপত্তা চুক্তিপত্রের নাম বন্ড, যে চুক্তি ঋণগ্রহীতা হিসেবে বন্ড ইস্যু করা প্রতিষ্ঠান এবং ঋণদাতার মধ্যে হয়ে থাকে। এখানে ঋণদাতা বা বিনিয়োগকারীকে বন্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান প্রাপ্ত ঋণের উপর নির্দিষ্ট হারে বিভিন্ন কিস্তিতে সুদ প্রদান দিয়ে থাকে। এভাবে পূর্বনির্ধারিত মেয়াদ পার হওয়ার পর ঋণের টাকা সুদসহ পরিশোধ করা হয়। বন্ডের অর্থের ওপর নির্দিষ্ট মেয়াদে ধার্য করা সুদের হারকে কুপন রেটও বলা হয়। বন্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান ও কুপন রেটসহ মূল অর্থ দিতে নানা মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে বন্ডগুলো বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে।

বাজারের আকস্মিক অস্থিতিশীলতা যেকোনো আর্থিক সরঞ্জামের পাশাপাশি বন্ডগুলোর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে/প্রতীকী ছবি/সংগৃহীত

বাংলাদেশে বন্ডের প্রকারভেদ

বন্ডে বিনিয়োগের সুবিধা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ধরনের ওপর ভিত্তি করে বন্ড তিন প্রকার। এগুলো হচ্ছে- সরকারি বন্ড, কর্পোরেট বন্ড এবং অ্যাজেন্সি বন্ড।

সরকারি বন্ড

এই বন্ডগুলোর আরেক নাম “ট্রেজারি বন্ড”, যেগুলোর মেয়াদ ন্যূনতম দুই বছর থেকে সর্বোচ্চ ২০ বছরের হয়ে থাকে। এখানে সুদের হার অন্যান্য বন্ডের তুলনায় সর্বাপেক্ষা বেশি থাকে।

কর্পোরেট বন্ড

ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো যে ধরনের বন্ড ইস্যু করে থাকে, সেগুলো “কর্পোরেট বন্ড”। এই বন্ড কোম্পানিগুলোর ব্যাংক ছাড়া টাকা উত্তোলনের একটি সেরা মাধ্যমে। এখানে কুপন রেট কম থাকলেও বিনিয়োগকারীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বেশি থাকে।

অ্যাজেন্সি বন্ড

সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো এই বন্ড ইস্যু করে থাকে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে “বাংলাদেশ ডিজেল প্লান্টস লিমিটেড” এবং “বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি”।

সুদ দেওয়ার পদ্ধতির ভিত্তিতে বন্ডের শ্রেণীবিন্যাস নিম্নরূপ:

উপযুক্ত বিনিয়োগ মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে/ফ্রিপিক

জিরো কুপন বন্ড

এই বন্ডগুলোতে কোনো সুদ বা কুপন দেওয়া হয় না, তবে মেয়াদপূর্তিতে বন্ডের ফেস ভ্যালুতে মূল টাকা পরিশোধ করা হয়। প্রথমেই দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে মেয়াদ শেষে প্রদানকৃত অর্থের পরিমাণ বা বন্ডের ফেস ভ্যালু ঠিক হয়। আর বন্ড ইস্যুর সময় এই ফেস ভ্যালুর থেকে কম মূল্যে বন্ড ছাড়া হয়। আর এই ডিসকাউন্ট রেটটাই বিনিয়োগকারীদের লাভ।

কনভার্টিবল বা রূপান্তরযোগ্য বন্ড

এই কর্পোরেট বন্ডগুলোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সময় পর বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির শেয়ার হোল্ডারে পরিণত হতে পারেন। তুলনামূলক কম সুদ দিয়ে করতে হয় বিধায় কোম্পানি কনভার্টিবল বন্ড ইস্যু করে। এমনকি এখানে বন্ড হোল্ডাররা শেয়ার হোল্ডারে পরিণত হওয়ায় নির্দিষ্ট সময় পর তাদের মূলধন ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা কোম্পানির থাকে না।

কল-এবল বন্ড

যে বন্ডের মেয়াদ উত্তীর্ণের পূর্বেই তার ইস্যুকারী নতুন করে সুদের হার ধার্য করতে পারে, তাকে “কল-এবল বন্ড” বলে। মেয়াদ চলাকালেই বন্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কোয়ালিটি বৃদ্ধি পেতে পারে কিংবা বাজারে সুদের হার কমে যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি আগের থেকে কম কুপন রেট দিয়ে পুনরায় বন্ডটি ইস্যু করতে পারে। এতে ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের লাভ হয় এবং বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি হয়।

পুট-এবল বন্ড

এখানে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই বন্ড হোল্ডাররা বন্ড ইস্যুকারীকে বন্ড বিক্রি করার ক্ষমতা অর্পণ করতে পারে। এতে করে বাজারে বন্ডের দর কমে যাওয়া অথবা সুদের হার বেড়ে যাওয়ার পূর্বেই বিনিয়োগকারীরা বন্ড বিক্রির সুযোগ পায়। এই সুবিধা থাকার জন্য “পুট-এবল বন্ড” বাজারে অন্যান্য বন্ড থেকে একটু বেশি মূল্যে বিক্রি হয়।

ইনকাম বন্ড

এটি অনেকটা জিরো কুপন বন্ডের মতো, তবে এখানে সুদ দিতে হয়। এই সুদ তখনই দেওয়া হয়, যখন প্রতিষ্ঠানের কাছে কুপন দেওয়ার মতো যথেষ্ট পরিমাণ আয় থাকে।

পারপিচুইটি বন্ড

এই বন্ডগুলোতে মূলত কোনো মেয়াদ নেই। বন্ডের মূলধন শোধ না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকাল ধরে বন্ড হোল্ডাররা নিয়মিতভাবে কুপন বা সুদ পেয়ে যাবেন।

জামানতযুক্ত বা সিকিউরড বন্ড

এই বন্ড বিক্রির সময় ঋণ পরিশোধের নিশ্চয়তা স্বরূপ একটি স্থায়ী সম্পদের দলিল বন্ধক রাখা হয়। জামানতযুক্ত বন্ডের ইস্যুকারী কোনো কারণে ঋণ খেলাপি হলে ঐ বন্ধককৃত সম্পদ বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের মূলধন সুদসহ ফেরত দেওয়া হয়।

জামানতবিহীন বা আন-সিকিউরড বন্ড

এই বন্ড বিক্রির সময় কোনো কিছু বন্ধক রাখার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে বন্ড ক্রয়ের জন্য ক্রেতাকে কোম্পানির আয়, সুনাম এবং ঋণ প্রদানের ক্ষমতার উপর নির্ভর করতে হয়।

এখানে প্রতিষ্ঠান কোনো কারণে ঋণ খেলাপি হলে বন্ড হোল্ডারদের স্বাভাবিকভাবেই সম্পূর্ণ মূলধন হারানোর ঝুঁকি থাকে।

বন্ড কেনার আগে যে বিষয়গুলো বিবেচনা করা জরুরি

টাকা/প্রতীকী ছবি/ফাইল ছবি/ঢাকা ট্রিবিউন

বিনিয়োগের উদ্দেশ্য ও বন্ডের মেয়াদ

ঠিক কত বছর পরে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের দরকার তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করে আগে থেকেই সঠিক বিনিয়োগ নির্বাচন করতে হবে। এই মেয়াদের ওপর নির্ভর করছে কোন সময়টিতে টাকাটা তুলে প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা যাবে। যাদের খুব দ্রুত অর্থের প্রয়োজন তাদের দীর্ঘ মেয়াদে বন্ডগুলোর দিকে না যাওয়াই উত্তম। অপরদিকে, দীর্ঘমেয়াদে বন্ড থেকে উদ্বৃত্ত অর্থ এমন কাজে লাগানো যেতে পারে, যা বিনিয়োগ ছাড়া অন্য সময়ে অসম্ভব।

ক্রেডিট রেটিং

বন্ড নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের “ক্রেডিট রেটিং” যাচাই করা। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকির বিচারে একটি বিশাল কোম্পানির বিভিন্ন দিক খুঁটিয়ে দেখা বেশ জটিল। মূলত বিভিন্ন এজেন্সি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধন, দেশি ও বৈদেশিক বিনিয়োগের খাত, ঋণের খাত, ঋণ পরিশোধের হার প্রভৃতি সূচকগুলো খতিয়ে দেখে। সামগ্রিক বিচারে বিভিন্ন অ্যাজেন্সি এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন স্কেলে মার্কিং করে। এই রেটিংগুলো দেখে সহজেই প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থান সম্পর্কে অবগত হওয়া যেতে পারে।

অধিকাংশ অ্যাজেন্সিতে পরিমাপের স্কেলগুলো একই হলেও এজেন্সি ভেদে কিছুটা ভিন্নতা থাকে। যেমন “ট্রিপল এ” বা “এএএ” বলতে সর্বোচ্চ নিরাপদ বা ঝুঁকিহীন প্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হয়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে “ট্রিপল সি” বা “সিসিসি”, “ডাবল সি” বা “সিসি”, “সিঙ্গেল সি” বা “সি” উল্লেখ করা হয়। আর “সিঙ্গেল ডি” হচ্ছে ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের নির্দেশক।

ক্রেডিট রেটিং অ্যাজেন্সি অব বাংলাদেশের (সিআরএবি) এর স্কেলে “এএ” থেকে “বি” রেটিংগুলোর মধ্যকার তুলনামূলক অবস্থান বোঝাতে অক্ষরের সঙ্গে ১, ২, ৩ যুক্ত করা হয়। যেমন- এএ১, বিবিবি২, এ৩। কিন্তু জাতীয় ক্রেডিট রেটিং (এনসিআর) অ্যাজেন্সিতে অঙ্কের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় “যোগ” (+) এবং “বিয়োগ” (-) চিহ্ন। যেমন- এএ+, বিবিবি-, এ-, বি+।

এনসিআর-এ স্বল্প-মেয়াদি ক্রেডিট অবস্থাগুলো এসটি দিয়ে বোঝানো হয়। এখানে “এসটি-১” মানে সর্বাধিক ঝুঁকিহীন প্রতিষ্ঠান, আর “এসটি-৬” মানে সব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

কুপন বা সুদের হার

ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই উচ্চ সুদের হারের প্রস্তাব করে। উচ্চ কুপন রেটে বিনিয়োগের স্থির আয়সহ মেয়াদ শেষে সুদ-আসল বেশ লোভনীয়। কিন্তু কুপন রেট বেড়ে যাওয়া মানে বন্ডের বাজার মূল্য হ্রাস পাওয়া। অর্থাৎ পরবর্তীতে বন্ড হোল্ডারকে ক্রয়মূল্য অপেক্ষা কম মূল্যে বন্ড ছেড়ে দিতে হতে পারে। তাই বাজারে বন্ডের দাম হ্রাসের আশঙ্কা থাকলে দীর্ঘমেয়াদি বন্ড বেছে নেওয়া ভালো। আর দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা সৃষ্টি হলে স্বল্পমেয়াদী বন্ড নেওয়া যেতে পারে।

আয়করের ওপর প্রভাব

বন্ডে বিনিয়োগের সঙ্গে নির্দিষ্ট মেয়াদে মুনাফা সম্পর্কিত। এই মুনাফার সঙ্গে সামগ্রিক আয় জড়িত, যার উপর ধার্য হয় আয়কর। তাই নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে বিনিয়োগের সময় রিটার্ন হিসাব করার ক্ষেত্রে আয়করের হিসাব খেয়াল রাখা আবশ্যক। এমনকি ট্রেজারি বন্ডের ক্ষেত্রেও উৎসে কর কতটুকু কাটা হচ্ছে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিৎ।

সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি

ভারসাম্যহীন মুদ্রাস্ফীতি এবং রাজনৈতিক অবস্থা সর্বাঙ্গীনভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অর্থনৈতিক এই অস্থিতিশীলতার ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন আসে ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেনে। এমনকি সরকারি বিধিমালাও এই অযাচিত পরিস্থিতির শিকার হতে পারে। এ সময় বিশেষ করে সুদের হার মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ রয়েছে তা খেয়াল রাখা জরুরি।

শেষাংশ

বন্ড কেনার আগে এই বিষয়গুলো যাচাই করে নিলে তা বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার সহায়ক হবে। প্রাথমিকভাবে সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হলে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। এ সময় বিনিয়োগের মেয়াদ, সুদের হার এবং প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট রেটিং বন্ডের ঝুঁকি সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়।

সর্বোপরি, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অবগত থাকা আবশ্যক। বাজারের আকস্মিক অস্থিতিশীলতা যে কোনো আর্থিক সরঞ্জামের পাশাপাশি বন্ডগুলোর উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা লাভের পরিবর্তে বরং আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

About

Popular Links