Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

চোখের ভাষায় মন পড়ার এক জাদুকরী কৌশল

বিশ্বজুড়ে 'কে পপ' বা 'কে ড্রামার' যে অভাবনীয় সাফল্য, এর পেছনেও নুনচির বড় ভূমিকা রয়েছে

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫২ এএম

কথায় আছে, কথা বলা শিখতে মানুষের সময় লাগে বড়জোর দুই বছর, কিন্তু কোথায় চুপ থাকতে হয় তা শিখতে পেরিয়ে যায় সারা জীবন। দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ এই চুপ থাকার এবং পরিস্থিতি বোঝার শিল্পটি রপ্ত করে মাত্র তিন বছর বয়স থেকে। এই বিশেষ জীবনদর্শনকে তারা বলে 'নুনচি'। কোরিয়াতে শিশুদের মাত্র তিন বছর বয়স থেকেই এই শিক্ষা দেওয়া হয়। কোনো শিশু যদি পরিবেশের সাপেক্ষে বেমানান আচরণ করে, তবে কোরীয় অভিভাবকেরা তাকে শাসন করবেন। তারা বলেন, 'তোমার কেন কোনো নুনচি নেই?' এটি কেবল একটি আচরণবিধি নয়, বরং চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি অনন্য দক্ষতা। 

আক্ষরিক অর্থে নুনচি মানে 'চোখের পরিমাপ'। এটি এমন এক দক্ষতা যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি কোনো কথা না শুনেই শুধু পরিবেশ ও মানুষের দেহভঙ্গি (body language) দেখে পরিস্থিতি বুঝে নিতে পারেন। কোরীয় আমেরিকান সাংবাদিক ইউনি হং এর বিখ্যাত বই 'দ্য পাওয়ার অব নুনচি'-তে নুনচিকে ব্যক্তিগত সুখ ও পেশাগত সাফল্য লাভের চাবিকাঠি বলেছেন।

 নুনচি ও কোরিয়ান মিরাকল   

৭০ বছর আগে কোরীয় যুদ্ধের পর দক্ষিণ কোরিয়া ছিল বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ, যাদের কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না। কিন্তু কয়েক প্রজন্মের ব্যবধানে আজ তারা বিশ্বের অন্যতম ধনী এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এই উন্নতির পেছনে নুনচি একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। অন্য জাতির দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রয়োজনগুলো বুঝতে পারা এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের পরিকল্পনা বদলে ফেলার ক্ষমতা বা 'দ্রুত নুনচি' তাদের সফল করেছে। 

বিশ্বজুড়ে 'কে পপ' বা 'কে ড্রামার' যে অভাবনীয় সাফল্য, এর পেছনেও নুনচির বড় ভূমিকা রয়েছে। কোরিয়ানরা এই কৌশলের মাধ্যমে বুঝতে পেরেছে বিশ্বের তরুণ প্রজন্ম কোন ধরণের মিউজিক বা গল্প বেশি পছন্দ করছে। তারা নিজেদের সংস্কৃতির সাথে বৈশ্বিক রুচির এমন এক সমন্বয় ঘটিয়েছে যা কেবল নিখুত পর্যবেক্ষণ কৌশলের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে।   

অন্তর্মুখীদের নীরবতার শক্তি 

অনেকেই মনে করেন, কর্মক্ষেত্রে বা আড্ডায় যে বেশি কথা বলে সেই প্রাধান্য পায়। কিন্তু নুনচি বলছে ভিন্ন কথা। যারা লাজুক বা অন্তর্মুখী তাদের জন্য নুনচি হতে পারে এক মহাশক্তি। ইউনি হং এর মতে, সাফল্যের একটি বড় কৌশল হলো "চুপ থাকার কোনো ভালো সুযোগই হাতছাড়া করবেন না।" 

বইটিতে থিয়া নামের এক নারীর উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। তিনি যখন বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে বসের কাছে যান, তখন তিনি নিজে অনর্গল কথা না বলে বরং চুপ থেকে বসের কথা শোনেন। অস্বস্তিকর নীরবতা কাটাতে বস যখন নিজেই কথা বলতে শুরু করেন, থিয়া বুঝে যান কোম্পানির আর্থিক অবস্থা বুঝতে পারে। এজন্য কোনো তর্কে না জড়িয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত ২০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধিতে সফল হন। ইউনি হং মনে করেন, নীরবতা আপনাকে আলোচনার টেবিলে অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রাখে। 

নুনচি চর্চার কিছু সহজ কৌশল

কীভাবে আপনিও নিজের জীবনে নুনচি বা এই মন পড়ার কৌশল প্রয়োগ করতে পারেন? ইউনি হং কিছু সহজ পরামর্শ দিয়েছে-

পূর্বধারণা ঝেড়ে ফেলা: কোনো ঘরে প্রবেশের আগে বা কারো সাথে কথা বলার আগে নিজের মনে থাকা পুরনো ধারণাগুলো মুছে ফেলুন। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে পরিস্থিতি অবলোকন করতে হবে।  

বডি ল্যাঙ্গুয়েজ খেয়াল রাখা: মানুষ মুখে যা বলে, সব সময় তা সত্যি নয়। তাদের চোখের ভাষা এবং বসার ভঙ্গি আপনাকে অনেক কিছু বলে দিবে।

অব্যক্ত কথা বুঝতে শেখা: অনেক সময় যা বলা হয় না, তা বলা শব্দের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একে বলা হয় 'রিডিং বিটুইন দ্য লাইনস'।

অন্যের অস্বস্তি বুঝতে পারা: আড্ডায় বা মিটিং এ কেউ আপনার কথায় অস্বস্তিবোধ করছে কি না, তা আগেই নুনচি দিয়ে বুঝে নিন।

কেন এটা জরুরি

বর্তমান ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে সবাই কম-বেশি বুঁদ, আশেপাশের মানুষের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতাও কমে আসছে। ইউনি হং এর মতে, নুনচি চর্চা করলে কেবল ক্যারিয়ারে সফল হওয়া নয়, বরং দুশ্চিন্তা কমিয়ে মানসিক প্রশান্তি পাওয়াও সম্ভব।

সাফল্যের জন্য কেবল কঠোর পরিশ্রমই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক আচরণ। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পেছনে থাকা এই 'নুনচি' আমাদের শেখায় নীরবতা কতখানি শক্তিশালী হতে পারে। নিজেকে আরও সচেতন এবং সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে নুনচি হতে পারে এক আধুনিক সমাধান।

   

About

Popular Links

x