Wednesday, June 10, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কেন জুন-জুলাইকে অর্থবছর ধরা হয়?

এর পেছনে রয়েছে শত বছরের ইতিহাস, গ্রামীণ জনপদ ও প্রশাসনিক বাস্তবতা

আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ০৩:৩৬ পিএম

ক্যালেন্ডারের পাতায় বছরের শুরু ১ জানুয়ারি হলেও বাংলাদেশে শুরু হয় নতুন অর্থবছর শুরু হয় ১ জুলাই। ১ জুলাই থেকে শুরু হয়ে এই হিসাব চলে পরের বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত।  

সাধারণ ক্যালেন্ডারের সাথে খাপ না খাওয়া এই ‘জুন-জুলাই’ মাস কেন বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি? কেনই বা বছরের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয় কোটি কোটি টাকার হিসাব-নিকাশ? এর পেছনে লুকিয়ে আছে শত বছরের ইতিহাস, ভূ-প্রকৃতি, গ্রামীণ জনপদের এক অবিচ্ছেদ্য সমীকরণ এবং বর্তমানের প্রশাসনিক বাস্তবতা।   

অর্থবছর কী?

অর্থবছর হলো সরকারের আয়-ব্যয়, কর আদায়, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আর্থিক হিসাব-নিকাশের জন্য নির্ধারিত ১২ মাসের একটি সময়কাল। বাংলাদেশে অর্থবছর শুরু হয় ১ জুলাই এবং শেষ হয় পরবর্তী বছরের ৩০ জুন। অর্থাৎ ২০২৬-২৭ অর্থবছর বলতে বোঝায় ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়।

ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া ‘হিসাবের খাতা    

‘জুন-জুলাই’ অর্থবছরের এই নিয়মের বীজ রোপিত হয়েছিল প্রায় ১৫০ বছর আগে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। ১৮৬৭ সালের আগে ব্রিটিশ ভারতে অর্থবছর শুরু হতো ১ মে থেকে। কিন্তু পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের নিজস্ব হিসাব ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ভারত উপমহাদেশে মার্চ-এপ্রিল অর্থবছর চালু করে।   

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান আমলেও সেই এপ্রিল-মার্চের ধারা বজায় ছিল। তবে ১৯৫৯ সালে এসে তৎকালীন আইয়ুব খান সরকার প্রশাসনিক ও আবহাওয়াজনিত কারণে তা পরিবর্তন করে ‘জুন-জুলাই’ অর্থবছর চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শাসনতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা এবং ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে এই চেনা পদ্ধতিটিই ধরে রাখা হয়। ফলে এটি কেবল কোনো সাময়িক নিয়ম নয়, বরং কয়েক দশকের প্রশাসনিক ও আর্থিক ঐতিহ্যের অংশ।

প্রধান অনুঘটক যেখানে বাংলার কৃষি

বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে একটি কৃষিপ্রধান দেশ। একসময় সরকারের রাজস্ব, উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সিংহভাগই নিয়ন্ত্রিত হতো কৃষির মাধ্যমে। আর এই জুন-জুলাই অর্থবছর নির্ধারণের পেছনে সবচেয়ে বড় কৌশলগত কারণ ছিল বাংলার প্রধান ফসল ‘বোরো ধান’।

সাধারণত এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে দেশের বোরো ধানসহ প্রধান প্রধান ফসল কাটা এবং বাজারে বিক্রির প্রক্রিয়া শেষ হয়। এই সময়ে কৃষকের ঘরে ওঠে নতুন ফসল, চাঙ্গা হয়ে ওঠে গ্রামীণ অর্থনীতি। জুন মাসের শেষ নাগাদ সরকারের হাতে একদম নিখুঁত একটি চিত্র আসে যে - এবার কৃষিতে কেমন উৎপাদন হলো, দেশ খাদ্য উৎপাদনে কতটা স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং কৃষি খাত থেকে সম্ভাব্য কেমন রাজস্ব বা আয় আসতে পারে। যদিও বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে শিল্প ও সেবাখাতের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে, তবুও ঐতিহাসিকভাবে এই কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক বাস্তবতাই বর্তমান বাজেট পঞ্জিকা নির্ধারণে মূল ভূমিকা রেখেছিল।

বাজেট প্রস্তুতির প্রশাসনিক সুবিধাজনক সময়

একটি পূর্ণাঙ্গ বাজেট প্রণয়ন কোনো এক বা দুই দিনের কাজ নয়। এর পেছনে থাকে দীর্ঘ কয়েক মাসের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা তাদের প্রয়োজনীয় ব্যয়ের প্রস্তাব জমা দেয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভিন্ন অংশীজনদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করে এই বিশাল খসড়া তৈরি করে।

সাধারণত মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত বাজেট প্রণয়নের এই মূল কাজগুলো চলে এবং জুন মাসে তা জাতীয় সংসদে পেশ ও অনুমোদিত হয়। ফলে ১ জুলাই থেকে একদম নতুন উদ্যমে, নতুন কর কাঠামো অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার পথ সুগম হয়। যদি জানুয়ারি থেকে অর্থবছর শুরু হতো, তাহলে বছরের শেষের দিকের নানা ছুটি, উৎসব, প্রশাসনিক ব্যস্ততা এবং বছর শেষের হিসাব বন্ধের কারণে বাজেট প্রণয়নের কাজ আরও জটিল হয়ে উঠতো।

আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন

দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বড় অংশের সাথে জড়িয়ে থাকে বৈদেশিক অর্থায়ন। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিশ্বের বড় বড় উন্নয়ন সহযোগী ও পশ্চিমা দেশের অফিশিয়াল অর্থবছর শুরু হয় ১ জুলাই থেকে। তাদের সাথে মিল রেখে অর্থবছর নির্ধারণ করায় বৈদেশিক ঋণ, অনুদান এবং উন্নয়ন প্রকল্পের হিসাব-নিকাশ ও অর্থছাড়ের সমন্বয় করা অনেক সহজ হয়।

একইসঙ্গে, ১ জুলাই থেকে নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ায় নতুন বরাদ্দগুলো দ্রুত কার্যকর করা যায়। এর ফলে বর্ষা-পরবর্তী শুকনো মৌসুমে মাঠপর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মূল কাজ ও পরিকল্পনা গ্রহণ যেমন সুবিধাজনক হয়, তেমনই প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়নও সহজ হয়।  

তবে কি বদলানো প্রয়োজন?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এই অর্থবছর নিয়ে নতুন একটি বিতর্ক শুরু হয়েছে। জুন-জুলাই মানেই বাংলাদেশে বর্ষাকাল এবং অনেক ক্ষেত্রে বন্যার মৌসুম। দেখা যায়, অর্থবছরের শেষ দিকে (মে-জুন মাসে) এসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) টাকা খরচ করার জন্য তীব্র তোড়জোড় শুরু হয়। বর্ষার মধ্যে তড়িঘড়ি করে রাস্তাঘাট বা অবকাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে কাজের মান খারাপ হওয়ার এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ ওঠে প্রায়ই।

এই কারণে অনেকেই এখন ভারতের মতো ‘এপ্রিল-মার্চ’ কিংবা পশ্চিমা দেশের মতো ‘জানুয়ারি-ডিসেম্বর’ অর্থবছর করার প্রস্তাব দিচ্ছেন। তবে দীর্ঘদিনের চেনা এই প্রশাসনিক কাঠামো, কর ব্যবস্থা, হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি, সরকারি ডিজিটাল সফটওয়্যার এবং আইনি জটিলতা ভেঙে নতুন নিয়মে যাওয়া বেশ সময়সাপেক্ষ ও জটিল। তাই সরকার এখন পর্যন্ত এই জুলাই-জুন পদ্ধতিই বহাল রেখেছে।

কাগজে-কলমে এটি কেবলই একটি সরকারি হিসাবের বছর হতে পারে, কিন্তু এর গভীরতা মিশে আছে আমাদের ইতিহাস, কৃষকের পরিশ্রম এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক বাস্তবতার সাথে। ক্যালেন্ডারের নতুন বছর উৎসবের আমেজ আনলেও, জুলাইয়ের এই নতুন বছর নির্ধারণ করে দেশের সাধারণ মানুষের আগামী দিনগুলোর অর্থনৈতিক ভাগ্য।  

   

About

Popular Links

x