যান্ত্রিক এই শহরের বহুতল ভবনগুলোতে প্রতিদিন কতবার যে আমরা লিফটে উঠি, তার হিসাব নেই। লিফটে পা রাখতেই বেশির ভাগ মানুষের চোখ চলে যায় ঠিক সামনে থাকা চকচকে আয়নাটার দিকে। কেউ চুলটা একটু ঠিক করে নেন, কেউ লিপস্টিকের ছোঁয়াটা পরখ করেন, আর কেউ হয়তো এক পলক দেখে নেন নিজের পোশাকের পরিপাটি ভাব।
প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, যাত্রীদের একটু সাজগোজের সুযোগ করে দিতেই বুঝি এই আয়োজন। কিন্তু স্থাপত্য আর প্রযুক্তির এই যুগে লিফটের ভেতরের এই ছোট্ট আয়নাটির পেছনে লুকিয়ে আছে এক দারুণ মনস্তাত্ত্বিক কৌশল এবং প্রকৌশলগত বুদ্ধিমত্তা।
(১) লিফটে আয়না বসানোর গল্পটা বেশ পুরোনো। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যখন বহুতল ভবনের চল শুরু হলো, তখন লিফটের ব্যবহারও বাড়তে থাকে। তবে শুরুর দিকে লিফটগুলো চলত বেশ ধীরগতিতে। ফলে যাত্রীরা প্রায়ই অভিযোগ করতেন - লিফটে সময় কাটে না, বড্ড ধীরগতির।
ভবন মালিক আর প্রকৌশলীরা পড়লেন মহাবিপদে। লিফটের গতি বাড়ানো যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি প্রযুক্তিগতভাবেও ছিল বেশ জটিল। তখনই এক অদ্ভুত বুদ্ধি খাটালেন এক মনস্তত্ত্ববিদ। তিনি পরামর্শ দিলেন, লিফটের গতি না বাড়িয়ে যাত্রীদের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হোক।
যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। লিফটের দেয়ালে জুড়ে দেওয়া হলো বড় বড় আয়না। ফলাফল পাওয়া গেল হাতেনাতে। মানুষ লিফটে উঠে নিজের চেহারা, পোশাক বা চারপাশের মানুষের প্রতিফলন দেখতে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়লো যে, সময় কোন দিক দিয়ে কেটে গেল তা টেরই পেলো না। গতি না বাড়িয়েও কেবল মানুষের মনোযোগের দিক পরিবর্তন করে লিফটকে ‘দ্রুতগামী’ প্রমাণ করার এই মনস্তাত্ত্বিক কৌশল আজ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।
(২) লিফটের ভেতরে অনেকেই ‘ক্লাস্ট্রোফোবিয়া’ অনুভব করেন। ক্লাস্ট্রোফোবিয়া হলো ছোট ও সংকীর্ণ জায়গার ভয়। লিফটে প্রবেশের সময় মানুষ অনেক সময় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং আটকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর ফলে শ্বাসকষ্টের অনুভব হয় এবং দ্রুত শরীরে রক্ত সঞ্চালনের হার বৃদ্ধি পায় ফলে হার্ট অ্যাটাকও হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আয়না অনেক সাহায্য করতে পারে। সাধারণত, আয়না একটি ছোট জায়গাকে প্রশস্ত দেখায় বলে জানা যায়। যা শ্বাসরোধের অনুভূতি কমিয়ে দেয়।
লিফটের আয়না কেবল সৌন্দর্য বাড়ায় না, এটি একটি চমৎকার নিরাপত্তামূলক রক্ষাকবচও বটে। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে ছোট্ট একটি বদ্ধ জায়গায় ওঠার পর এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করা স্বাভাবিক। আয়না থাকার কারণে সরাসরি কারও দিকে না তাকিয়েও পেছনের মানুষটি কী করছেন, তার হাত কোথায় আছে বা কোনো সন্দেহজনক আচরণ করছেন কি না, তা সহজেই নজরে রাখা যায়। বিশেষ করে পকেটমার বা অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ এড়াতে এই আয়না দারুণ সাহায্য করে।
(৩) শারীরিক প্রতিবন্ধী বা হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য লিফটের ভেতরের আয়না এক বড় স্বস্তি। লিফটের ভেতরের সরু জায়গায় হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে নেওয়া বেশ কঠিন। আয়না থাকার কারণে হুইলচেয়ারে বসা ব্যক্তি পেছনে না ফিরেই দেখতে পারেন তার পেছনে কোনো বাধা আছে কি না। ফলে লিফট থেকে নামার সময় পেছন দিকে ব্যাক করে তারা সহজেই ও নিরাপদে বের হয়ে যেতে পারেন।
(৪) নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও আয়না বড় ভূমিকা পালন করে। ভিড়ের মধ্যে কী হচ্ছে তা সহজেই দেখা যায়, পিছন ফিরে তাকাতে হয় না। বর্তমানে অনেক জায়গায় আয়নার সঙ্গে সিসিটিভি ক্যামেরাও ব্যবহার করা হয়। এতে যাত্রীরা আরো নিরাপদ অনুভব করে।
তাই পরের বার যখন লিফটে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াবেন, তখন মনে রাখবেন -এটি কেবলই আপনার সাজগোজের আয়না নয়, বরং আপনার স্বস্তি, নিরাপত্তা মানিসিক শান্তির কথা ভেবেও লাগানো হয়েছে।



