বন্ধ্যাত্ব বা প্রজনন-সংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হওয়া দম্পতিদের জন্য ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বড় আশীর্বাদ।
গত কয়েক দশকে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষ মা-বাবা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছেন। তবে আইভিএফকে ঘিরে এখনও প্রচুর ভুল ধারণা এবং অবাস্তব প্রত্যাশা রয়েছে।
অনেকের ধারণা, একবার আইভিএফ শুরু করলেই সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
চিকিৎসকদের মতে, আইভিএফ কোনো “গ্যারান্টিযুক্ত” চিকিৎসা নয়। এটি একটি জটিল, ব্যয়বহুল এবং ধৈর্যসাপেক্ষ চিকিৎসাপদ্ধতি, যেখানে প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনও অনেক দম্পতি আছেন, যাঁরা প্রথমবারেই সফল হয়েছেন; আবার কারও ক্ষেত্রে একাধিকবার চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি।
তাই চিকিৎসা শুরু করার আগে আইভিএফ কী, এটি কীভাবে কাজ করে এবং সফলতার সম্ভাবনা কোন কোন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে—এসব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
আইভিএফ কীভাবে সম্পন্ন হয়?
ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয় এ চিকিৎসাপদ্ধতি
ডিম্বাশয় উদ্দীপনা: প্রথমে হরমোন ইনজেকশনের মাধ্যমে ডিম্বাশয়কে উদ্দীপিত করা হয়, যাতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি পরিমাণে পরিপক্ব ডিম্বাণু তৈরি হয়।
ডিম্বাণু সংগ্রহ: নির্দিষ্ট সময়ে অ্যানেস্থেশিয়ার সাহায্যে ডিম্বাশয় থেকে পরিপক্ব ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। এটি একটি স্বল্প সময়ের এবং তুলনামূলকভাবে কম ব্যথাযুক্ত প্রক্রিয়া।
ল্যাবরেটরিতে নিষেক: সংগ্রহ করা ডিম্বাণুর সঙ্গে পুরুষ সঙ্গীর শুক্রাণু নিয়ন্ত্রিত ল্যাব পরিবেশে নিষিক্ত করা হয়। এরপর কয়েক দিন ধরে ভ্রূণের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ভ্রূণ প্রতিস্থাপন: সুস্থ ও মানসম্মত ভ্রূণ নির্বাচন করে তা নারীর জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়।
দুই সপ্তাহের অপেক্ষা: ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের পরের সময়টিই সবচেয়ে আবেগঘন। প্রায় দুই সপ্তাহ পর রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়, গর্ভধারণ সফল হয়েছে কি না।
আইভিএফ নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
আইভিএফ মানেই প্রথমবারে সফলতা-এমন ধারণা একেবারেই সঠিক নয়। চিকিৎসকদের ভাষ্য, প্রতিটি দম্পতির শারীরিক অবস্থা আলাদা। তাই একজনের ক্ষেত্রে যা সফল, অন্যজনের ক্ষেত্রে তা নাও হতে পারে। অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে একাধিক আইভিএফ সাইকেলের প্রয়োজন হয়।
সফলতার পেছনে কোন বিষয়গুলো কাজ করে?
বয়স: আইভিএফের সফলতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হলো নারীর বয়স। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমে যায়। তাই সাধারণভাবে ৩৫ বছরের কম বয়সে সফলতার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি থাকে।
জীবনযাপন: ধূমপান, অ্যালকোহল গ্রহণ, স্থূলতা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ-এসবই ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মানকে প্রভাবিত করতে পারে। এ কারণে চিকিৎসকেরা আইভিএফ শুরু করার আগে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রয়োজনীয় জীবনধারাগত পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
মানসিক প্রস্তুতি কেন জরুরি?
আইভিএফ শুধু শারীরিক চিকিৎসা নয়; এটি মানসিকভাবেও একটি দীর্ঘ ও সংবেদনশীল যাত্রা। প্রতিটি ধাপে প্রত্যাশা, উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তা কাজ করে। হরমোনজনিত পরিবর্তনের পাশাপাশি বারবার ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কাও মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে মনোবিদ বা ফার্টিলিটি কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়া এই যাত্রাকে অনেকটাই সহজ করে তুলতে পারে।
আইভিএফ নিঃসন্দেহে সন্তান লাভের একটি কার্যকর চিকিৎসাপদ্ধতি। তবে এটি কোনো অলৌকিক সমাধান নয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা রাখা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকাই এই চিকিৎসার সফলতার সম্ভাবনা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।



