Friday, October 02, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

গয়না ছাড়াও আর কোথায় ব্যবহার হয় স্বর্ণ, জানেন?

স্মার্টফোন, চিকিৎসার বিভিন্ন সরঞ্জাম, এমনকি মহাকাশ গবেষণাতেও কাজে লাগে স্বর্ণ

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০১ এএম

স্বর্ণ বলতেই সাধারণত গয়না কিংবা বিনিয়োগের কথা মনে পড়ে। তবে মূল্যবান এই ধাতুর ব্যবহার কেবল অলংকার বা সম্পদ জমিয়ে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্মার্টফোন, চিকিৎসার বিভিন্ন সরঞ্জাম, এমনকি মহাকাশ গবেষণাতেও কাজে লাগে স্বর্ণ।

সহজে ক্ষয় না হওয়া, বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষমতা এবং অত্যন্ত পাতলা পাত বা সূক্ষ্ম তারে রূপ দেওয়া যায় বলে নানা ক্ষেত্রে স্বর্ণের ব্যবহার রয়েছে। এমনকি বিশেষ কিছু খাবার সাজাতেও ব্যবহার করা হয় খাওয়ার উপযোগী স্বর্ণ।

চলুন, জেনে নেওয়া যাক গয়না ও বিনিয়োগের বাইরে স্বর্ণের আরও কিছু অজানা ব্যবহার।

খাবারেও ব্যবহার হয় স্বর্ণ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাবার সাজাতেও এই ধাতু ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় কেক, চকলেট, আইসক্রিম, সুশি ও বিভিন্ন মিষ্টির সৌন্দর্য বাড়াতে স্বর্ণের অতি পাতলা পাত ব্যবহার করা হয়। এই স্বর্ণ ‘এডিবল গোল্ড’ নামে পরিচিত।  

খাবারে ব্যবহারের জন্য সাধারণত ২২ থেকে ২৪ ক্যারেট বিশুদ্ধ স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাবারে ব্যবহৃত স্বর্ণ ’ই১৭৫’ নামে একটি অনুমোদিত ফুড অ্যাডিটিভ।   

তবে স্বর্ণ খেলে যে শরীরের জন্য খুব উপকারী বা এতে বিশেষ কোনো পুষ্টিগুণ রয়েছে, তা নয়। কেননা ধাতব স্বর্ণ সহজে দ্রবীভূত হয় না এবং মানুষের পরিপাকতন্ত্রেও উল্লেখযোগ্যভাবে শোষিত হয় না। মূলত খাবারের সৌন্দর্য ও আভিজাত্য বাড়াতেই এর ব্যবহার।

দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে মিষ্টি সাজাতে স্বর্ণ ও রুপার পাত ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। এগুলো সাধারণত ভারক বা ওয়ার্ক নামে পরিচিত। 

খাবারে স্বর্ণের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। ২০২৩ সালে পার্টিকল অ্যান্ড ফাইবার টক্সিকোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত ইঁদুরের ওপর ৯০ দিনের একটি গবেষণায় দেখা যায়, ই১৭৫ গ্রহণের পর প্রাণীগুলোর যকৃৎ, প্লীহা ও অন্ত্রে সরাসরি কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে অন্ত্রের জীবাণু এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। মানুষের স্বাভাবিক গ্রহণমাত্রার চেয়ে বেশি স্বর্ণ খাওয়ানো স্ত্রী ইঁদুরের অন্ত্রে হালকা প্রদাহও দেখা গিয়েছিল।

স্মার্টফোন ও কম্পিউটারের ভেতরেও আছে স্বর্ণ

হাতে থাকা স্মার্টফোন কিংবা কম্পিউটারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরিতেও ব্যবহার করা হয় স্বর্ণ। পরিমাণে খুব সামান্য হলেও এসব যন্ত্রের কার্যকারিতা বজায় রাখতে ধাতুটির ভূমিকা রয়েছে।

ইলেকট্রনিক যন্ত্রের সার্কিট বোর্ড, সংযোগকারী অংশ, সুইচ এবং বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সংযোগে স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়। এর প্রধান কারণ স্বর্ণ বিদ্যুৎ পরিবহনে কার্যকর এবং সহজে ক্ষয় বা মরিচা ধরে না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে যন্ত্রাংশের বৈদ্যুতিক সংযোগ সচল রাখা সম্ভব হয়।

বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরি হওয়ায় এসব যন্ত্রে ব্যবহৃত সোনার সম্মিলিত পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। এ কারণে পুরোনো ফোন, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক বর্জ্য থেকে স্বর্ণ সংগ্রহ করে পুনরায় ব্যবহারেরও প্রচলন রয়েছে।

মহাকাশ গবেষণায় স্বর্ণের প্রয়োজন কেন?

মহাকাশ প্রযুক্তিতেও নানা কাজে স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়। তাপমাত্রার পরিবর্তন, তীব্র সৌর বিকিরণ এবং নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলায় মহাকাশযানের বিভিন্ন অংশে বিশেষ উপকরণ প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে স্বর্ণের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, আলো ও তাপ বিকিরণ প্রতিফলিত করার ক্ষমতা থাকায় জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের আয়নায় স্বর্ণের পাতলা প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইনফ্রারেড আলো প্রতিফলনে স্বর্ণ বেশ কার্যকর। এই আলো বিশ্লেষণ করেই টেলিস্কোপটি দূরবর্তী নক্ষত্র, ছায়াপথসহ মহাবিশ্বের বিভিন্ন বস্তু পর্যবেক্ষণ করে।  

শুধু মহাকাশযানের যন্ত্রপাতিতেই নয়, মহাকাশচারীদের সুরক্ষার সরঞ্জামেও রয়েছে স্বর্ণের ব্যবহার। মহাকাশচারীদের হেলমেটের সামনের স্বচ্ছ অংশে স্বর্ণের পাতলা আবরণ দেওয়া থাকে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, এই আবরণ সূর্যের তীব্র আলো ও ক্ষতিকর রশ্মি থেকে চোখ ও মুখকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।  

এছাড়া মহাকাশযানের বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সংযোগ ও যন্ত্রাংশে স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়। এর বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষমতা এবং সহজে ক্ষয় না হওয়ার বৈশিষ্ট্য এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসাক্ষেত্রে স্বর্ণের ব্যবহার  

চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বর্ণের ব্যবহার বেশ পুরোনো। একসময় রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা একধরনের প্রদাহজনিত বাতের চিকিৎসায় স্বর্ণের কিছু যৌগ ব্যবহার করা হতো। এসব যৌগ ‘গোল্ড সল্ট’ নামে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের তথ্যমতে, বর্তমানে আরও কার্যকর ওষুধ সহজলভ্য হওয়ায় এ চিকিৎসায় স্বর্ণের ব্যবহার অনেকটাই কমে গেছে।   

তবে আধুনিক চিকিৎসায় স্বর্ণের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলছে। বিশেষ করে গোল্ড ন্যানোপার্টিকল বা অতি ক্ষুদ্র স্বর্ণের কণা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, এসব কণা ব্যবহার করে রোগ শনাক্ত করা, শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া এবং ক্যান্সার শনাক্ত ও   চিকিৎসার নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কিছু রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষাতেও স্বর্ণের ক্ষুদ্র কণা কাজে লাগে। দ্রুত ফলাফল পাওয়া যায় এমন কয়েক ধরনের পরীক্ষার কিটে দৃশ্যমান রঙিন রেখা তৈরিতে এসব কণা ব্যবহৃত হয়। দাঁতের চিকিৎসাতেও দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণের ব্যবহার রয়েছে। আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সহজে ক্ষয় না হওয়া ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে দাঁত মেরামত এবং পুনর্গঠনে স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়।

তবে উচ্চমূল্য এবং বিকল্প উপাদানের সহজলভ্যতার কারণে দাঁতের চিকিৎসায় স্বর্ণের ব্যবহার আগের তুলনায় কমেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কেন স্বর্ণ জমা রাখে?

স্বর্ণ শুধু গয়না তৈরি বা শিল্পকারখানার উপকরণ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গেও এর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ মজুত রাখে।

অতীতে অনেক দেশের মুদ্রার মূল্য নির্ধারণে স্বর্ণের সরাসরি ভূমিকা ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকা স্বর্ণের মজুতের সঙ্গে একটি দেশের মুদ্রার মূল্য সম্পর্কিত থাকতো। সময়ের সঙ্গে সেই ব্যবস্থা বদলে গেলেও বৈদেশিক সম্পদের অংশ হিসেবে স্বর্ণের গুরুত্ব রয়ে গেছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্বর্ণের মজুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। দেশটির রিজার্ভে রয়েছে ৮,০৩৩ টন স্বর্ণ, যা ৮১ লাখ কিলোগ্রামেরও বেশি।  

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৬,৪০০ টন স্বর্ণ ছিল। এসব দেশের বৈদেশিক রিজার্ভের ৭০%-এর বেশি ছিল স্বর্ণের মজুত।

এদিকে স্বর্ণের মজুত বাড়ানোর ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। কয়েক বছর ধরে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বর্ণ কিনে রিজার্ভে এর পরিমাণ বাড়াচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ চীনের স্বর্ণের মজুত ছিল ২,২৭৯ টন। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটি আরও প্রায় ১৯ টন স্বর্ণ কেনে। এর আগে ২০২৩ সালে চীন প্রায় ৮৮ টন স্বর্ণ কিনেছিল। বিপরীতে ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্র কোনো স্বর্ণ কেনেনি।

গয়না, প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও মহাকাশ গবেষণা থেকে শুরু করে বৈদেশিক রিজার্ভ সংরক্ষণ - বিভিন্ন ক্ষেত্রেই স্বর্ণের ব্যবহার রয়েছে। এর অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই এত ভিন্ন ভিন্ন কাজে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই মূল্যবান ধাতু।

   

About

Popular Links

x