Tuesday, June 25, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

অনলাইনে অনুমতি ছাড়া নারীর ছবি ব্যবহার, বাড়ছে উদ্বেগ

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মিম’ এবং ‘ট্রল’ করার প্রবণতাও বেড়েছে। এসব ক্ষেত্রেও ভুক্তভোগী হচ্ছেন নারীরা

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৩, ০৪:১৯ পিএম

প্রযুক্তি আমাদের জীবনযাত্রাকে একদিকে যেমন সহজ করেছে, অন্যদিকে এর অপব্যবহারের কারণে যুক্ত হয়েছে কিছু বিড়ম্বনাও। বর্তমান সময়ে আমাদের দৈনন্দিন বেশিরভাগ কাজই কোনো না কোনোভাবে প্রযুক্তির সঙ্গে জড়িত, তাই প্রয়োজনের তাগিদেই এটি এড়িয়ে চলার তেমন সুযোগ নেই। তবে, অপব্যবহারকারীদের কারণে এই প্রয়োজনীয় মাধ্যম ব্যবহার করতে গিয়ে অনেকেই হচ্ছেন হয়রানির শিকার। আর এই হয়রানির ক্ষেত্রে নারীরাই বেশি ভুক্তভোগী।

বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশনএইডের “বাংলাদেশে অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা” শীর্ষক সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে অনলাইন ব্যবহারকারী নারীদের প্রায় ৬৩.৫১% সহিংসতার শিকার হয়েছেন- যা আগের বছরের তুলনায় ১৪% বেশি৷ এরমধ্যে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছেন তারা, এই হার ৪৭%। 

গবেষণায় বলা হয়, অনলাইনে নারীরা ১২ ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন৷ সবচেয়ে বেশি ৮০% নারী অশ্লীল, ক্ষতিকর, যৌনতামূলক ও বিদ্বেষমূলক মন্তব্য পেয়ে থাকেন৷ ৫৩% নারীকে ইনবক্সে অশ্লীল ছবি পাঠিয়ে যৌন সম্পর্ক করার কথা বলে হয়রানি করা হয়৷ বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হন ১৯% নারী৷ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের নাম ব্যবহার করে ভুয়া আইডি খোলার মাধ্যমে সহিংসতার শিকার হয়েছেন জরিপে অংশ নেওয়া ১৮% নারী৷ 

এসবের বাইরেওসম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি উদ্বেগের বিষয় দেখা দিয়েছে। সেটি হলো, মিম এবং ট্রল প্রবণতা।

সাধারণত, নিছক মজার জন্য বা ব্যাঙ্গাত্মক হিসেবে “মিম” ব্যবহার করা হয়। এটি অনেকের কাছে শুধুমাত্র বিনোদনের খোরাক। তবে, উদ্বিগ্নতার বিষয় হলো এরকম অনেক পোস্টেই নারীদের ছবি অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করা হয়। আক্রামণাত্মক বিষয় না হলেও এসব পোস্টে বিব্রত হন নারীরা। যার ফলে তিনি সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হন, পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার মানসিক স্বাস্থ্য।

এরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক রাবিতা রহমানের সঙ্গে।

একটি ফেসবুক গ্রুপ থেকে তার ছবি দিয়ে মিম বানিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তার ছবির ওপর “বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক” সংক্রান্ত কিছু কথা লিখে পোস্ট করা হয়েছিল। তবে, সেই গ্রুপের কাউকে তিনি চেনেন না, কিংবা ছবি ব্যবহারের জন্য তার কোনো অনুমতিও কেউ নেয়নি।

অনেকটা কাছাকাছি রকমের অভিজ্ঞতা হয়েছিল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্টমেকিং ডিসিপ্লিনের প্রভাষক আসমা চৌধুরীর। ঘটনাটি ২০২০ সালের, সে সময় একজন প্রবাসী ব্লগার তার ভিন্ন মতাবলম্বীদের ব্যঙ্গ করে দেওয়া একটি পোস্টে আসমা চৌধুরীর একটি ছবি জুড়ে দেন। আসমা ওই ব্লগারকে চিনতেন না, এমনকি তার নামও শোনেননি আগে।

ছবিটি তার কলেজে পড়াকালীন সময়ের কোনো একটি পাবলিক প্রোগ্রামের। এই ধরনের একটি পোস্টে অচেনা একজন লোক অনুমতি ছাড়াই তার ছবি জুড়ে দেওয়াতে ভীষণ মনোক্ষুণ্ণ হন। কিন্তু সে সময়ে নিজের পরীক্ষার চাপ থাকায় বিষয়টি এড়িয়ে যান। আর ওই ব্লগার দেশের বাইরে থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারেননি।

আসমা চৌধুরীর মতে, দৈনন্দিন জীবনে আমাদের বিভিন্ন জনাসমগম কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে হয়। আর আজকাল সবার হাতে হাতেই মোবাইল ফোন। ফলে অনিচ্ছা স্বত্বেও অনেকের মোবাইলে ক্যামেরাবন্দী হয়ে যেতে হয়। আর সেই ছবির অপব্যবহারকে মানসিক দৈন্যতা এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হিসেবেই দেখেন তিনি।

ঢাকা ট্রিবিউনকে আসমা চৌধুরী বলেন, “বর্তমান সময়ে বিনা অনুমতিতে অন্য কারো ছবি নিয়ে মজার ট্রল করা এবং বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে নিজস্ব ফলোয়ার বাড়ার প্রবণতা একটু বেশিই। বিশেষ করে মেয়েদের বিভিন্ন সময়ের ছবি বিস্তারিত না জেনে বা ইচ্ছা করে সেই ছবিকে অস্বস্তিকর মন্তব্যের মুখে ফেলে দেওয়া বর্তমান সময়ের একটা ট্রেন্ড বলা যায়। যার ফলশ্রুতিতে সেই মেয়েটার ওপর কোনো ইফেক্ট পড়ছে কি-না এ বিষয়ে কারো মাথা ব্যাথা থাকছে না। একজন মিম তৈরি করে পোস্ট দিচ্ছে অন্যজন তার বিস্তারিত না জেনেই শেয়ার করছে, কারো প্রতি কারো কোনো সম্মানবোধ বা দ্বায়িত্ববোধ থাকছে না। প্রতিনিয়তই এমন পরিস্থিতির স্বীকার হচ্ছে দেশের বেশিরভাগ মেয়ে। সমাজে এমন পরিস্থিতির জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকা উচিত। প্রত্যেকের মনে শাস্তিজনিত ভয় থাকলে তবেই নিজেদের ফলোয়ার বৃদ্ধির জন্য যেকোনো কিছু করার আগে প্রত্যেকেই অন্তত একবার ভাববে বলে আমি মনে করি।”

অনলাইনে হয়রানির শিকার হওয়া আরেক নারী শারমিন নাহার ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান তার অভিজ্ঞতার কথা। ঢাকায় মেয়েদের হোস্টেলে থেকে চাকরির প্রস্ততি নিচ্ছিলেন তিনি। হোস্টেলের মেয়েদের সঙ্গে কাটানো সময়ের ছবি কারো মাধ্যমে অন্য হাতে চলে যায়। একটি ফেসবুকে আইডি থেকে তার ছবি দিয়ে বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হতে থাকে। বাজে রকমের মন্তব্যে ঠাসা সেসব পোস্ট। বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যান শারমিন। বিষয়টি তার বন্ধুদের জানালে তারা ওই আইডির ইনবক্সে পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়ার ভয় দেখান। বেশ কয়েকবার ভয় দেখানোর পর ওই আইডি থেকে তার ছবি পোস্ট করা বন্ধ হয়। 

শারমিন বলেন, “আমি পুলিশের কাছে না যেয়ে শুধু ভয় দেখানোতেই কাজ হয়েছে। অর্থাৎ সব অপরাধীর মনেই পুলিশের ভয় আছে। তাই, এ ধরনের সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তির দৃষ্টান্ত তৈরি হলে এবং সেটি প্রচার করা হলে অপরাধীরা ভয় পাবে এবং অপরাধের সংখ্যা কমে আসবে।”

ঠিক একই ধরনের মতামত রাবিতা রহমানের। তিনিও বিশ্বাস করেন, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রচারণা বেশি থাকলে অপরাধ প্রবণতা কমবে।

আর সে কারণেই নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনায় পুলিশের শরণাপন্ন হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সহকারী অধ্যাপক। পুলিশের কাছে গিয়ে সন্তোষজনক সেবাও পেয়েছেন তিনি।

পুলিশের কাছে যাওয়ার আগে তার ছবি পোস্ট করা গ্রুপের অ্যাডমিনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন তিনিও। তবে, তারা সে ছবি সরিয়ে নিতে আপত্তি জানায়। 

রাবিতা রহমানের ভাষ্য, ছবির ওপর লেখা কথাগুলো ততটা ক্ষতিকর না হলেও তার ছবি অনুমতি ছাড়াই যেভাবে ব্যবহৃত হয়েছে সেটা থামানো না হলে পরে আরও বিপজ্জনক হতে পারে। 

আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্তে পরিবারের সমর্থনও পান রাবিতা রহমান।

পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডব্লিউ) ইউনিটে যোগাযোগ করলে প্রথমে একটি সাধারণ ডায়েরি করার পরামর্শ দেওয়া হয় তাকে।

এরপর পুলিশ ওই পোস্টদাতাকে থানায় হাজির করে। তবে, সে সময় মামলা করার সুযোগ থাকলেও সেটি করেননি রাবিতা। মুচলেকার মাধ্যমে ওই পোস্টদাতাকে আর এ ধরনের কাজ না করার শর্তে ক্ষমা করে দেন এই শিক্ষক। 

রাবিতা রহমান বলেন, “বাংলাদেশের মানুষের ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারের শিক্ষাগত অভাব আছে। তাই বিশেষ কোনো শাস্তির বদলে আমি পোস্টদাতাকে আইনি ভাষায় ক্ষমা প্রার্থনা করার শর্ত দিই।”

তিনি বলেন, “আমাদের দেশে নারীদের প্রতি কোনো অন্যায় ঘটলে প্রতিবাদ করার বদলে ওই নারী শঙ্কিত বা দ্বিধান্বিত থাকেন। তিনি ভাবেন, আমার সঙ্গে এরকমটা ঘটেছে মানে আমার কোনো ভুল আছে। আমাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি আছে। এই জায়গা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। প্রতিবাদ করতে হবে।”

যেকোনো নারীর জীবনে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে পরিবারের সমর্থন তার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

পুলিশি সহয়তা সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে আইনি সহায়তার প্রক্রিয়া নিয়ে ভুল ধারণা আছে। প্রক্রিয়া না জানার কারণে অনেকে পুলিশের কাছে যান না। কিন্তু পুলিশের কাছে গেলে খুব সহজেই ভালো সহযোগিতা পাওয়া যায়। যেটি আমি নিজেই পেয়েছি।”

সাইবার অপরাধ কমাতে পুলিশ সদা তৎপর বলে জানালেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপির)  সাইবার ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি) নাজমুল ইসলাম।

তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আগের চেয়ে মানুষের মধ্যে প্রতিবাদ করার মানসিকতা এবং পুলিশের কাছে আসার প্রবণতা বেড়েছে। আমরা প্রতিদিন প্রায় ২৫-৩০ টা অনলাইনে হয়রানি সংক্রান্ত অভিযোগ পেয়ে থাকি। এর মধ্যে প্রায় ৭০% অভিযোগই টিনএজারদের কাছ থেকে আসে।”

অভিযোগের ধরন সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমাদের কাছে প্রায় সবধরনের অভিযোগই আসে। তবে, যৌন হয়রানি, বুলিং, ফেক আইডি খুলি হয়রানি, ব্লাকমেইলিং এবং অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা সংক্রান্ত অভিযোগ বেশি আসে।”

সাইবার ক্রাইমের কাছে আসা সব অভিযোগে নিয়মিত মনিটর করা হয় এবং সেগুলো সুরাহা করতে পুলিশ শতভাগ চেষ্টা করে বলে জানান এই কর্মকতা। বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট প্রযুক্তিগত দক্ষতায় বেশ সমৃদ্ধ বলে জানান তিনি।

তার মতে, পুলিশকে না জানালে সহায়তা করার সুযোগ পুলিশের থাকে না। তাই পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানোর ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে উব্ধুদ্ধ করতে গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান এডিসি নাজমুল ইসলাম।

অনলাইনে হয়রানি বিষয়ে গণমাধ্যমে ইতিবাচক প্রচারণা বাড়ানোর প্রতি জোর দিলেন রাবিতা রহমানও। একইসঙ্গে দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের মৌলিক জ্ঞান বাড়ানোর প্রতি জোর দেন তিনি। 

রাবিতা রহমান বলেন, “বলার অধিকার মানেই, যা খুশি তাই বলার অধিকার নয়, যাকে খুশি তাকে নিয়ে ট্রল বা মিম করার নাম বাক স্বাধীনতা নয়। আমাদের পরিমিতি বোধ ও শিষ্টাচার জানতে হবে। সৌজন্যতাবোধ শিখতে হবে।”

তার মতে, পুলিশের পক্ষে এতো বড় জনগোষ্ঠীর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না, তাই ব্যক্তি, পারিবারিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান তার।

অনলাইনে নারী হয়রানি কমাতে সচেতনতা বাড়ানোর প্রতি জোর দিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। তার মতে, আমাদের সমাজে নারীর প্রতি নেতিবাচক যে দৃষ্টিভঙ্গি, নারীকে দুর্বল ভাবার যে মানসিকতা সেটারই প্রতিফলন অনলাইনে। এজন্য বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দোষ দেওয়ার পাশাপাশি, ব্যক্তি সচেতনার অভাবকেও দায়ী করেন তিনি।

তিনি বলেন, “নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে অনলাইনে ট্রল ও বুলিং সামগ্রিকভাবে বন্ধ হবে। তবে, এই প্রক্রিয়াটা অনেক বড়, এর জন্য শিক্ষা কারিকুলামে পরিবর্তন, রাজনৈতিক অঙ্গীকারসহ, সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের বেশকিছু বিষয় জড়িত। সমাজের সকল অংশ এক হলেই কেবল এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।”

অনলাইনে কিংবা অফলাইনে শিকার হলে সেটির প্রতিবাদ না করে লুকানোর চেষ্টাকেও এক ধরনের অন্যায় মনে করেন এই নারীনেত্রী। এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে পুলিশের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। আর অনলাইন ট্রল এবং বুলিংয়ের ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান তার।

মহিলা পরিষদের পেজ নিয়ে ট্রল করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা নিজেরাও এ বিষয়ে সাইবার ক্রাইমে মামলা করেছি।”

অনলাইনে এ ধরনের হয়রানিকে বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান।

তিনি বলেন, “যেকোনো খাতে যখন বাণিজ্যিকরণ চলে আসে, তখন সেটির সঙ্গে নেতিবাচক কিছু বিষয়ও যুক্ত হয়ে যায। বাণিজ্যিকরণের কারণে সেসব নেতিবাচক বিষয় এড়ানো যায় না। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন পুরোপুরি বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার চলছে। তাই এর সঙ্গে নেতিবাচক কিছু বিষয়ও যুক্ত হয়ে গেছে। এগুলো আমাদের মতো ছোট দেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। তবে, আমরা চেষ্টাটা করতে পারি। এজন্য আমাদের এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য শক্তিশালী ইউনিট গঠন করতে হবে। তারা যেকোনো হয়রানিমূলক বিষয়ে নিয়মিতভাবে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। বারবার যোগাযোগ করতে থাকলে তারা আমাদের দেশের জন্য কিছু নিয়ন্ত্রণ নির্দেশিকা প্রণয়ন করলেও করতে পারে। তবে, সর্বোপরি যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেটি হলো জনসচতেনতা। এর কোনো বিকল্প নেই।”

পাশাপাশি এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ সৃষ্টি করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। 

অনলাইনে নারী এবং শিশুদের হয়রানির ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে মনে করেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সালাহ্‌উদ্দিন কাউসার বিপ্লব।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের এই অধ্যাপক জানান, অনলাইনে হয়রানির শিকার সকল বয়সীরা মারাত্মক মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। এর ফলে তারা বিষণ্ণতা ও উদ্বিগ্নতাজনিত মানসিক রোগে ভোগেন। কারো কারো ক্ষেত্রে এটি আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যায়। এসব ভুক্তভোগীরা পরবর্তী সময়ে আচরণগত বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের মধ্যে ট্রল কিংবা মিমের মতো বিষয়গুলোর প্রতি ঝোঁক বাড়ার পেছনে সৃজনশীল সাংস্কৃতিক চর্চা কমে যাওয়াকে দায়ী করে তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বলা হলেও, এগুলোর মাধ্যমে মূলত দিনদিন আমাদের পারষ্পারিক যোগাযোগ কমছে। অনলাইনে তারা দেখে দেখে প্রভাবিত হয়। সরাসরি গল্প বা আড্ডা দেওয়ার মজা তারা বোঝে না। অন্যের অধিকার রক্ষা করা যে এক ধরনের সামাজিক দক্ষতা বা সোশ্যাল স্কিল। এটি অনুভব করার দারুণ অভাব রয়েছে।”

তিনি বলেন, “একজনের কাছে যেটি নিছক বিনোদন, অন্যের কাছে সেটি বড় রকমের ক্ষতির কারণ। অনলাইনে কিছু একটা পেলেই সেটিকে শেয়ার করার মানসিকতা বাদ দিয়ে বরং সেটির প্রতিবাদ করতে হবে। তাহলে পোস্টকারী নিরুৎসাহিত হবেন। আর কোনো অপরাধ করে কেউ শাস্তি না পেলে, অন্যরাও একই ধরনের অপরাধ করতে উৎসাহিত হতে পারেন। তাই, অন্যান্য অপরাধের মতো অনলাইনে সংঘটিত অপরাধগুলোকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।”

এখনই পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই ট্রল কিংবা মিমের প্রবণতা আরও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। এজন্য পাড়া-মহল্লা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সাংস্কৃতিক চর্চা চালুর বিষয়ে জোর দেন তিনি। পাশাপাশি, ট্রল বা মিমের কারণে অন্যরা যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, সে বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। 

About

Popular Links