Tuesday, May 28, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

আব্দুল আহাদের নেতৃত্বে বুরুঙ্গা গণহত্যা

স্বজাতির পরিচিত কারও নির্ভরতার আশ্বাসে মানুষগুলো শিকার হতো পাকিস্তানি সেনাদের নির্মম নৃশংসতার। মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ঢাকা ট্রিবিউনে গবেষক রা'আদ রহমানের লেখা সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব এটি

আপডেট : ০৫ জুন ২০২৩, ০৫:১৭ পিএম

মুক্তিযুদ্ধে অনেক গণহত্যা হয়েছিল ধূর্ততার সাথে নিরীহ জনগণকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে। স্থানীয় চেনা পরিচিত যুবক কিংবা মুরুব্বিরা শান্তিকমিটির দায়িত্ব নিয়ে গ্রামের মানুষদের আশ্বস্ত করে আগে থেকে পরিকল্পিত ফাঁদে নিয়ে আসত। স্বজাতির পরিচিত কারও নির্ভরতার আশ্বাসে প্রাণে বেঁচে যাবে এমনটা ভেবে মানুষগুলো শিকার হতো পাকিস্তানি সেনাদের নির্মম নৃশংসতার।

সিলেটের বালাগঞ্জ থানার বুরুঙ্গা গ্রামে একাত্তরের ২৬ মে পৈশাচিক গণহত্যার শিকার হওয়া মানুষগুলোকেও এভাবেই ডেকে মানা হয়েছিল সেদিন।  

বুড়িবরাক নদীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুরুঙ্গা ইউনিয়নের শান্ত পল্লীগ্রাম বুরুঙ্গা অশান্ত হয়ে উঠলো একাত্তরের মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে। পাকিস্তানি সেনারা হামলা চালাতে পারে এমন এক আশংকায় আতংকিত গ্রামবাসী। তাদের আশ্বস্ত করতে এগিয়ে এলো বুরুঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইনজাদ আলী। সে এবং ইউনিয়ন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছয়েফ উদ্দিন মাস্টারের নির্দেশে ২৫ মে বিকেলে বুরুঙ্গা ও পাশের গ্রামগুলোতে ঘোষণা করা হলো ২৬ মে গ্রামবাসীর নিরাপত্তা ও এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে শান্তি কমিটি গঠিত হবে। ওই দিনই শান্তিকমিটির ইস্যু করা পরিচয়পত্র বিতরণ করা হবে। শান্তি কমিটির দেওয়া পরিচয়পত্র থাকলে কোনো সমস্যা হবে না, গ্রামবাসী নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারবে। 

আতঙ্ক এরপরেও কমছিল না। কারণ চারদিক থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংসতার যেসব খবর আসছিল, তাতে মানুষ কোনোভাবেই নিশ্চিন্ত হতে পারছিল না। তবুও প্রাণে বাঁচার তাগিদে রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যদের আশ্বাসে ভরসা করে ২৬ মে সকালে বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের শান্তি কমিটির সভায় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল শ্রেণি-পেশার প্রায় হাজারখানেক মানুষ উপস্থিত হন। সকাল ৮টার সময় শান্তি কমিটিতে যোগদানের জন্য আগ্রহীদের নামের তালিকা তৈরি করা শুরু হয়। কিন্তু সকাল ৯টার দিকে হঠাৎ করেই বদলে যায় পরিস্থিতি। 

আচমকাই করনসী গ্রামের রাজাকার কমান্ডার আব্দুল আহাদ চৌধুরী (যে সাদ মিয়া নামে পরিচিত ছিল) ও পল্লী চিকিৎসক আব্দুল খালেকের দেখানো পথে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বড় একটি দল বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এসে উপস্থিত হয়। এরপর স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্যদের কাছ থেকে তালিকা বুঝে নেয় পাকিস্তানি বাহিনী। তখনও গ্রামের অনেকেই উপস্থিত ছিল না, পাকিস্তানি সেনারা ঘরে ঘরে তল্লাশি চালিয়ে তাদের বিদ্যালয় মাঠে ধরে আনে। 

শুরু হয় ধর্মের ভিত্তিতে তালিকা ধরে বাছাই। গ্রামের নিরীহ-নিরাপরাধ মানুষগুলোকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে শান্তি কমিটিতে নাম থাকলে পরিচয়পত্র থাকলে তারা নিরাপদ থাকবে। অথচ সেই নাম তুলতে এসেই তারা আটকা পড়ে বুরুঙ্গা স্কুল মাঠে। স্থানীয় রাজাকার, পাকিস্তানি সেনা ও শান্তি কমিটির সদস্যরা হিন্দু পুরুষদের নিয়ে যায় স্কুলের অফিস কক্ষে আর মুসলমানদের নিয়ে যাওয়া একটা শ্রেণিকক্ষে। সেখানে তাদের অস্ত্রের মুখে তাদের কালিমা পড়তে ও পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত গাইতে বাধ্য করা হয়।


আরও পড়ুন- ক্র্যাক প্লাটুনের ‘অপারেশন ইন্টারকন্টিনেন্টাল'


রাজাকার কমান্ডার আব্দুল আহাদ চৌধুরী এক পাকিস্তানি সেনার সহায়তায় সবার কাছ থেকে টাকা-পয়সা সোনাদানাসহ মূল্যবান যা কিছু আছে সব লুটে নেয়। লুটপাট শেষে বেশ কিছু মুসলিম ধর্মাবলম্বীকে ছেড়ে দিলেও বাকিদের মধ্যে কয়েকজনকে বাজারে পাঠানো হয় নাইলনের দড়ি আনতে। সেই দড়িতে মুসলিমদের দিয়ে শক্ত করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাঁধতে বাধ্য করা হয়। প্রাণভয়ে হিন্দুরা চিৎকার শুরু করলে গুলি চালানো শুরু করে পাকিস্তানি সেনারা।

সেই পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যাওয়া বিদ্যালয়টির শিক্ষক প্রীতিরঞ্জন চৌধুরী পরবর্তীতে দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “২৬ তারিখ সকাল ৮টার দিকে স্কুলের মাঠে যাওয়ার কথা থাকলেও আমার একটু দেরি হয়ে যায়। আমি গিয়ে যখন পৌঁছাই,তখন হিন্দুদের সবাইকে সেই কক্ষে আটকে রাখা হয়েছে। আমাকে দেখেই ওরা ধরে সেই ক্লাসরুমে নিয়ে যায়। যখন তারা বাঁধতে যাবে, তখন সবাই ভয়ে চিৎকার শুরু করে। ক্লাসরুমের একটা জানালা কিছুটা ভাঙা ছিল, কিছুটা  ফাঁকাও ছিল। দেখলাম, প্রাণে বাঁচতে হলে আমার সামনে এটা ছাড়া আর উপায় নেই। আমি জানালাটা ধরে টান দিতেই খুলে গেল। লাফিয়ে জানালা টপকালাম, আর ওরা ব্রাশফায়ার শুরু করল। আমার পর রানু মালাকারসহ আরও কয়েকজন সেখান দিয়ে পালাতে পেরেছিলেন।”

স্কুল মাঠে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে এরপরে পাকিস্তানি সেনারা ব্রাশফায়ার শুরু করে। বাম হাতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়ে প্রাণে বেঁচে যান শ্রী নিবাস চক্রবর্তী। সন্দেহবশত তাকে লক্ষ্য করে আবার গুলি করে এক সেনা, কিন্তু গুলিটা মেরুদণ্ডের ওপর চামড়া ভেদ করে চলে যাওয়ায় তিনি বেঁচে যান। আর মৃতের মত পড়ে থাকায় তাকে আর বেয়নেট চার্জ করেনি পাকিস্তানি সেনারা। হাত-পা বাঁধা অসহায় মানুষগুলোর মৃতদেহের নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিলেন তিনি, রক্তে ডুবে গিয়েছিল চারপাশ। 

যারা প্রথম দফার গুলিবর্ষণে যারা মারা যায়নি, যন্ত্রণায় কাতর আর্তনাদ করছিল, তাদের ওপর আবার গুলি করে এবং বেয়নেটে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে পাকিস্তানিরা। এরপরে লাশের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে চলে যায়।

গণহত্যায় নিহতদের মরদেহ পৈশাচিক বর্বরতায় পোড়ানোর সময় স্কুলের বারান্দায় একটা চেয়ার বসে ছিলেন সিলেট কোর্টের আইনজীবী রাম রঞ্জন ভট্টাচার্য। অসুস্থ রাম রঞ্জনকে পাকিস্তানি সেনারা ছেড়ে দেয়, চলে যেতে বলে। যাওয়ার জন্য চেয়ার থেকে উঠতেই তার উপর এক পশলা গুলিবর্ষণ করে নরপশুরা। এ এক বড়ই আনন্দময় খেলা তাদের জন্য, নিরাপদে থাকবে কিচ্ছু হবে না, ছেড়ে দিচ্ছি ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে শিকারকে একদম আশ্বস্ত করা হয়। এরপরে তার ওপর জগতের বীভৎসতম বিভীষিকা নামিয়ে আনার এই বর্বর খেলা পুরো একাত্তর জুড়েই খেলে গেছে পাকিস্তানি সেনারা এবং তাদের এদেশীয় শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনীর নরপশুর দল। 

বুরুঙ্গা স্কুল মাঠের এই গণহত্যায় নিহত হন প্রায় শতাধিক নিরীহ মানুষ। রাজাকার কমান্ডার আব্দুল আহাদের নেতৃত্বে পুরো গ্রামে লুটপাট চালিয়ে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেয় রাজাকার সদস্যরা। সারাদিন সারারাত পুড়তে থাকা কমপক্ষে ৭৮টা লাশের দেহাবশেষ পরদিন পাকিস্তানি সেনারা ফিরে এসে পাশেই একটা গর্ত খুঁড়ে মাটিচাপা দেয়। 

সেখানেই এখন বুরুঙ্গা গণহত্যায় শহীদদের স্মৃতিস্মরণে স্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। শহীদদের পূণ্যস্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানান সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ।


তথ্যসূত্র:

১. সিলেটে গণহত্যা/ তাজুল মোহাম্মদ

২. বুরুঙ্গা গণহত্যা: মুক্তিযুদ্ধের এক নির্মম হত্যাযজ্ঞ/ দ্য ডেইলি স্টার


রা'আদ রহমান, গবেষক ও কলাম লেখক

About

Popular Links