Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

শতবর্ষী লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার যেন পাবনার ‘মধুর ক্যান্টিন’

অনেক বরেণ্য রাজনীতিবিদের নাম জড়িয়ে আছে এই দোকানটির ইতিহাসে

আপডেট : ১৬ মে ২০২৩, ০৩:৩১ পিএম

পাবনা শহরের রায়ের বাজারে ১৯৪০ সালে ব্যবসা শুরু করে “লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার”। প্রায় ১২৩ বছর ধরে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে সুনাম কুড়িয়েছে এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি। মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তীকালে অনেকবার হামলা চালানো হয়েছে এখানে, দেওয়া হয়েছে আগুন।

মিষ্টান্ন ভাণ্ডারটির প্রতিষ্ঠাতা লক্ষ্মী নারায়ণ ঘোষ; পরে হাল ধরেন তার ছেলে নিমাই চন্দ্র ঘোষ। বর্তমান প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ভোলানাথ ঘোষ। তিন পুরুষ ধরে চলা এই দোকানটির রসগোল্লা, প্যারা মিষ্টি জেলার গণ্ডি ছাড়িয়ে সুনাম কুড়িয়েছে সারা দেশে। 

পাবনা শহরের প্রাণকেন্দ্র এই মিষ্টির দোকানটিকে বলা হয় প্রগতিশীল রাজনীতির আঁতুড়ঘর। ছাত্ররাজনীতির তুখোড় দিনগুলোতে এই দোকানেই আড্ডা দিতেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কমরেড প্রাসাদ রায়, কমরেড মনি সিংহসহ অনেক প্রখ্যাত রাজনীতিবিদের নামও জড়িয়ে আছে এই দোকানটির ইতিহাসে। 

সোমবার (১৫ মে) রাত ৮টা; হঠাৎ করেই শহরের ব্যস্ততম আব্দুল হামিদ সড়কে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দৌড়াদৌড়ি। একপর্যায়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পথচারীরাও থমকে দাঁড়ান। সড়কের দুপাশে উৎসুক জনতার দৃষ্টি একটি মিষ্টির দোকানের দিকে। 

বর্তমানে নিজ জেলা পাবনা সফরে আছেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। সফরের প্রথম দিন সোমবার রাত ৮টার দিকে হঠাৎ করেই লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে হাজির হন তিনি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তিকে পুরোনো দিনের মতো কাছে পেয়ে একই সঙ্গে অবাক ও খুশি হন দোকানের মালিক, রাষ্ট্রপতির বন্ধু, স্বজন ও অনুসারীরা। 

লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের বর্তমান স্বত্বাধিকারী ভোলানাথ ঘোষ বলেন, “রাত ৮টার দিকে রাষ্ট্রপতি হঠাৎ করেই দোকানে আসেন। তাকে দেখে আমরা খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ি। সফরের প্রথম দিনেই তিনি দোকানে আসবেন তা ভাবতেই পারিনি। এত খুশি হয়েছি যে কল্পনা করতে পারছি না।” 

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রেজাউল রহিম লাল বলেন, “রাষ্ট্রপতি তার শেকড় ভোলেননি। এই সংবাদ পাবনাবাসীর জন্য আনন্দ ও খুশির।”

পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স বলেন, “রাষ্ট্রপতি যে আমাদের মানুষ, পাবনার ছাওয়াল, এটা আবারও প্রমাণিত হলো। বিষয়টি আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।”

রাষ্ট্রপতির বাল্যবন্ধু অধ্যাপক শিবজিত নাগ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা বেবি ইসলাম বলেন, “রাষ্ট্রপতি পাবনায় প্রেসক্লাব, লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, মিডিয়া সেন্টার ও ডায়াবেটিক সমিতিতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ায় আর হয়তো এভাবে আসতে পারবেন না। তার কথা আমাদের সবসময় মনে পড়বে।”

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবন

সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ১৯৪৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এরপর একই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৭৫ সালে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা পাবনার বাসিন্দা সাহাবুদ্দিন চুপ্পু রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।

সত্তরের দশকে পাবনা জেলা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাত্রনেতা হিসেবে উত্তরাঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। এ সময় তিনি স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিমের পাশাপাশি পাবনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।

১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর নবগঠিত সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় গ্রেপ্তার হয়ে তিন বছর কারাগারে ছিলেন তিনি।

১৯৮২ সালে বিসিএস (বিচার) ক্যাডার হিসেবে যোগ দেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। সে সময় তিনি পাবনা জেলা শাখা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদকের পদেও ছিলেন।

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতা-কর্মীদের দ্বারা হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের তদন্তের জন্য গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

বিচারকের বিভিন্ন পদে ২৫ বছরের কর্মজীবন শেষে ২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর নেন তিনি।

২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সেখানে থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি ফের সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ২০২০ সালে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নিযুক্ত হন।

তিনি আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটিরও চেয়ারম্যান। ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা প্রয়াত এইচ টি ইমাম মারা গেলে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে মনোনয়ন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগের সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলে নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জেএমসি বিল্ডার্স লিমিটেডের পরিচালনা বোর্ডেও রয়েছেন। এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক লিমিটেডের উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেন তিনি।

মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ১৯৮০-১৯৮২ সাল পর্যন্ত দৈনিক বাংলার বাণীতে সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন।

   

About

Popular Links

x