সেই মায়াবিনী নেই। মায়াবী মফস্বলও হারিয়েছে। কিন্তু আছে সুচিত্রা সেনের শ্যাওলাধরা স্মৃতির একতলা বাড়ি, না থাকার মতো। বিলুপ্ত না হয়ে আছে অনেকটা গুপ্ত হয়ে। এক বর্ষণমুখর বিকেল উন্মোচন করে পুরনো বেলার স্মৃতির ডাকনামের রমাকে।
মহানায়িকার বেড়ে ওঠার পৈত্রিক বাড়িটি পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার হেমসাগর লেনে। মূল সড়কের কোথাও তার ঐতিহ্য শনাক্ত করা যায় না। এলাকাবাসীকে জিজ্ঞেস করলেও চেনেন না। অথচ মহাকালী পাঠশালা আর পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন হৃদয় দোলা দেওয়া নায়িকা। শহরের নানা অনুষ্ঠানে এ কিশোরী গান গাইতেন। নাটক, থিয়েটার পাড়ায়ও তার উপস্থিতি ছিল। কিন্তু মহাতারকার এ ভিত্তিভূমি ক’জন মনে রেখেছেন? শহরে তিনি উপেক্ষিত। এডওয়ার্ড কলেজে তার নামে অবশ্য ছাত্রীনিবাস আছে। কিন্তু নিজের বিদ্যাপীঠে সুচিত্রা সেন বিলীন।
১৯৪৭-এ ভারতবর্ষ ভাগের ক’মাস আগে সুচিত্রা সেনসহ তার পুরো পরিবার পাবনার এই বাড়ি ফেলে পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমান। সুচিত্রার জীবনে এরপর আর পাবনা ‘‘কখনও আসেনি’’।
এখন তার স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে। কিন্তু মহানায়িকার স্মরণে গড়ে ওঠেনি কোনো সংগ্রহশালা বা পর্যটনকেন্দ্র। অথচ ভারত-বাংলা সাংস্কৃতিক মৈত্রীর অনবদ্য নিদর্শন হতে পারত এ জনপদ। অধিকাংশ সময় সুচিত্রার স্মৃতিধন্য বাড়িটির দুয়ারে থাকে তালা। স্মৃতিময়তায় হেঁটে বেড়ানোর ইচ্ছায় পড়ে শেকল।

সুচিত্রা সেনের বাড়ি দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে জেলা প্রশাসন সৌজন্য ছবি
১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল তিনি পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন এক স্থানীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। আর মা ইন্দিরা দেবী গৃহবধূ। রমা ছিলেন পরিবারের পঞ্চম সন্তান ও তৃতীয় কন্যা। প্রখ্যাত কবি রজনীকান্ত সেনের নাতনী তিনি।
জানা যায়, ২০০৪ সাল থেকে পাবনা শহরের সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ নানা দিবসে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে এখানে। মহানায়িকার উচ্চতা গুণে তা অতি সামান্য। অর্জন আছে শুধু বাড়িটুকু রক্ষায়। তাও বিনাবাধায় হয়নি। পাবনা শহরের সংস্কৃতিকর্মীদের অনেক আন্দোলন ও আইনি লড়াই শেষে ২০১৫ সালে বাড়িটি দখলমুক্ত হয়।
তখন প্রশ্ন জাগে, এখন তো রমা পাসপোর্ট, কাঁটাতার সীমান্তের ঊর্ধ্বে। তার কি ইচ্ছে করে না আমাদের জনপদ পাবনার এ ভিটা দেখে যেতে? বেণী দুলিয়ে এখনও সে পথে বালিকারা স্কুলে যায়। সুচিত্রা সেন হওয়ার বহু আগে এ পথেই হেঁটেছেন তিনি। স্মৃতিচিহ্ন রাষ্ট্রের সংস্কৃতি কর্তারা রাখুক বা মুছে ফেলুক এ রাঙা পথ অনন্তলোকের রমাকে ডাকবেই।
১৯৭৮ সাল থেকে তিনি সিনে পর্দায় নেই। কিন্তু তার প্রভাব বাঙালির কাছে নিঃশেষ হবেনা কোনো দিন। কত নায়িকা এলো, গেল কিন্তু সুচিত্রা সেন একজনই। বাঙালি নারীর প্রতিচ্ছবি মানে তিনি। চলচ্চিত্র তারকাদের সচারচর যাপিত স্খলিত জীবনের বাইরে শালীনতায় মোড়া সুচিত্র সেন যেন এক হৃদয় ঈশ্বরী। তিনি প্রপিতামহ জেনারেশনের ফেভারিট। পিতামহ প্রজন্ম বুঁদ ছিলেন তাকে নিয়ে। পিতা হয়ে সুচিত্রাকে ভালোবাসে আজকের তারুণ্য। নিশ্চিতভাবে অনাগতরাও তার অনুরক্ত থাকবেন।
বাঙালি পারফেক্ট জুটি বলতে এখনও বোঝে সেই উত্তম-সুচিত্রাকেই। বহমান এমন ভালোবাসার উৎস লাগে রহস্যময়। এই রহস্যময়তাই কি সুচিত্রাকে অনন্যা রাখে?
বেশিরভাগ সময় তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে থাকে বাড়িটি সৌজন্য ছবিসুচিত্রা সেন শুধু বাংলা জনপদ জয়ী ছিলেন না। তিনি প্রথম ভারতীয় অভিনয় শিল্পী যিনি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। ‘‘সাত পাকে বাঁধা’’ ছবিতে অনবদ্য অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৬৩ সালে মস্কো চলচ্চিত্র উৎসব থেকে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান তিনি। এখন বিশ্বসভায় গুরুত্ব পেতে থাকা বাংলা ছবির প্রথম মশালধারী ছিলেন সুচিত্রা সেন।
তিনি সব মিলিয়ে ৬৮টি ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত সময় জুড়ে তার ক্যারিয়ার। শত শত ছবিতে দশকের পর দশক কাজ করে অনেকে যা পান না তিনি অর্জন করেছেন কীর্তিগুণে সে খেতাব ‘‘মহানায়িকা’’।
সুচিত্রা সেনকে নিয়ে অদম্য কৌতূহল কোনো দিনই থামবে না। আমি নিজেই কত কী ভাবি! কেন সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কোনো কাজ পেলাম না সুচিত্রার? ভারত ‘‘পদ্মশ্রী’’ কেন দিল্লি গেলেন না দাদা সাহেব ফালকে পদক নিতে? সবশেষে কোটি কোটি মানুষের মতো এ ভাবনাটি আসে যে, কেন নিজেকে এমন অন্তরীণ রাখলেন জীবনের এতটা সময়? বাংলাদেশ কর্তারা একবারও কেন ভাবলেন এমন নক্ষত্রকে (যিনি এ মাটির সন্তান) সম্মাননা দেওয়ার যৌক্তিক কারণটি?
বিকেলের বর্ষণ আরও বাড়ে। মনেহয়, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব নয়; বরং যেন রমাহীনতায় হুহু করে কাঁদছে হেমসাগর লেনের আকাশ।



