বছর কয়েক আগে গুগল ডুডলে একটা অসাধারণ ব্যাপার দেখা গিয়েছিল। বিখ্যাত ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা জানাতে গুগল তাদের হোমপেজে মানানসই লোগো তৈরি করে থাকে। এটাকেই বলা হয় ডুডল। এই আয়োজন থাকে গুগল সার্চের মূল পাতায়। তো কয়েক বছর আগে গুগল ডুডলে দেখা গিয়েছিল তারেক মাসুদকে। তার জন্মদিন ৬ ডিসেম্বর ডুডলের এক চমৎকার আর্টে তাকে স্মরণ করেছিল গুগল।
অসাধারণ ব্যাপারটি হচ্ছে গুগল এই ডুডলটি তৈরি করেছিল সারা পৃথিবীর সবার জন্য! অর্থাৎ প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তারেক মাসুদকে নিয়ে তৈরি এই ডুডলটা দেখা যাচ্ছিল সারা পৃথিবী থেকে। এর আগে প্রথম ভারতীয় হিসেবে সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে ডুডল তৈরি করেছিল গুগল, সে হিসেবে তারেক মাসুদ বিশ্বব্যাপী গুগল ডুডলে স্থান পাওয়া দ্বিতীয় বাঙালি!
ক্ষণজন্মা জিনিয়াস তারেক মাসুদ ছিলেন একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, লেখক এবং গীতিকার। যার জীবনের প্রতিশব্দ ছিল চলচ্চিত্র। ধ্যান-জ্ঞান, সাধনা, অধ্যাবসায় সবকিছুই ছিল চলচ্চিত্রকে ঘিরে, চলচ্চিত্রের জন্যই বেঁচেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার হিসেবে খ্যাতি পাওয়া তারেক মাসুদ মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। ভাঙ্গা ঈদগাহ মাদ্রাসা থেকে তার শিক্ষাজীবন শুরু। পরবর্তীতে ভর্তি হন ঢাকার লালবাগের একটি মাদ্রাসায়। সেখান থেকে মাওলানা পাসও করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তার মাদ্রাসা শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। মাওলানা পাস একজন ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত কিশোরের জীবন এরপরে বদলে যায় অদ্ভুত ঘটনাপ্রবাহে।
মুক্তিযুদ্ধের পর ভাঙ্গা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে অনার্স, মাস্টার্স সম্পন্ন করেন তারেক মাসুদ। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স শেষ করে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন তিনি। চলচ্চিত্রই যে তার পরবর্তী জীবনকে বদলে দেবে, তৈরি হবে দুর্দান্ত সব সৃষ্টি, তা প্রথম স্পষ্ট হয়ে ওঠে “আদম সুরত” নির্মাণের সময়। অথচ তার এই ডকুমেন্টারি বানানোর কথাই ছিল না!
চলচ্চিত্র মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যে ভারত সরকারের “পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট”-এর মেধাবৃত্তি পেয়েছিলেন তারেক। কিন্তু নানা বাধায় আর হয়ে ওঠেনি সেখানে। এরপরে নিজের চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রেও বৃত্তি পেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেখানেও পড়তে যাওয়া হলো না নানা কারণে। শেষপর্যন্ত সিনেম্যাটোগ্রাফার আনোয়ার হোসেনের পরামর্শে সিদ্ধান্ত নেন যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন না। ওই টাকা লগ্নি করবেন সুলতানকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে।
তারপর টানা সাত বছর কেটে যায় এ কাজে। নির্মিত হয় “আদম সুরত”। যার ইংরেজি টাইটেল “Inner Stregnth”.
কিংবদন্তি চিত্রকর এবং দার্শনিক এস এম সুলতানের জীবন ও কর্মের উপর ডকুমেন্টারি বানাতে গিয়ে আমূল পরিবর্তন ঘটে তারেক মাসুদের দর্শন-চিন্তা-মানসিকতায়। বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিক-খেটে খাওয়া জনগণের আবহমান জীবনধারা ও শেকড়ের শক্তি অনুপম নৈপুণ্যে তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসে তুলে আনা শক্তিমান এস এম সুলতানের সাহচার্যে পোক্ত হয় তারেক মাসুদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি। সুলতানের ইনার স্ট্রেংথ খুঁজতে গিয়ে তারেক আবিষ্কার করেন বাংলাদেশের ইনার স্ট্রেংথ। যা পাল্টে দেয় তার লক্ষ্য, তার কর্ম ও কীর্তির সোপান।
১৯৮৯ সালে মুক্তি পায় “আদম সুরত”। তার আগে নারী সমাজের অধিকার ও ভূমিকা এবং তার বিপরীতে তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলেন প্রামাণ্যচিত্র “সোনার বেড়ী”-তে। ১৯৮৫ সালে মুক্তি পাওয়া “সোনার বেড়ী”-ই তারেক মাসুদের ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় প্রথম কাজ। পেশাগত দায়িত্ব পালনে শূন্য দশকের মাঝমাঝি আমেরিকায় গিয়ে খোঁজ পান মার্কিন চলচ্চিত্রকার লেয়ার লেভিনের, যার কাছে ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একটা ভ্রাম্যমাণ গানের দলের কিছু “র” ফুটেজ।
এতটাই আলোড়িত হন মাসুদ যে, তিনি ঢাকা ফিরে লেগে পড়েন নতুন এক সিনেমা বানাতে। লেয়ার লেভিনের ক্যামেরাবন্দি ফুটেজের সাথে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংরক্ষণাগার থেকে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে যোগাড় করা দুর্লভ সব ফুটেজ জুড়ে দিয়ে নির্মাণ করেন “মুক্তির গান”। এই পুরো জার্নিতে তার সাথে ছিলেন তার সবসময়ের সহযোগী অর্ধাঙ্গিনী স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ। কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের “স্টপ জেনোসাইড”-এর পর “মুক্তির গান” পরিণত হয় মুক্তিযুদ্ধের এক দুর্লভ ডকুমেন্টারিতে।
মুক্তির গান “ফিল্ম সাউথ এশিয়া-১৯৯৭” থেকে বিশেষ সম্মাননা অর্জন করে। সারাদেশে বিকল্প পরিবেশনায় প্রদর্শিত হয় মুক্তির গান। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে বিশাল ক্যানভাসে উপস্থাপন করে মুক্তির গান। সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তারেক তৈরি করেন মুক্তি পায় একাত্তরের গ্রাম-গঞ্জে সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের অকল্পনীয় অত্যাচারকে তুলে ধরে নির্মিত তার আরেকটি চলচ্চিত্র “মুক্তির কথা”। ১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রও সাড়া ফেলে প্রভূত, বিশেষত নতুন প্রজন্ম নতুন করে মুক্তিযুদ্ধকে চিনতে ও জানতে পারে এই দুটো কালোর্ত্তীণ নির্মাণে।
কিন্তু তারেক মূলত কিংবদন্তিতে পরিণত হন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ নির্মাণ “মাটির ময়না (২০০২)”-এর জন্য। তারেক মূলত এখানে তুলে আনেন তার নিজের গল্পটাই। ছোটবেলায় মাদ্রাসায় পড়াকালীন এক ভুলতে চাওয়া শৈশব, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চেয়েও না পারার আক্ষেপ সবই তিনি তুলে আনেন এই চলচ্চিত্রে। মাদ্রাসাপড়ুয়া এক বালকের চোখে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা উঠে এসেছে এই চলচ্চিত্রে, ধর্মীয় বিধিনিষেধে যে গ্রামবাংলার আবহমানকাল পুরোনো শেকড়ের টান আলগা হওয়া সম্ভব না, বাঙালির চিরচেনা লোকজ সংস্কৃতি ও বাউলিয়ানা আমাদের অন্তরে প্রোথিত, সেটা এতো নিপুণভাবে এই চলচ্চিত্রে তুলে আনেন তারেক মাসুদ যে এই চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ২০০২-এর কান চলচ্চিত্র উৎসবে “ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট”-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেন। এটি প্রথম বাংলাদেশি বাংলা চলচ্চিত্র হিসেবে সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে একাডেমি পুরস্কারের জন্য নিবেদন করা হয়েছিল।
এরপরে ২০০৬ সালে “অন্তর্যাত্রা”, ২০০৯ সালে “নরসুন্দর” এবং ২০১০ সালে তার সর্বশেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পায় “রানওয়ে”। কীভাবে তরুণ প্রজন্মকে উগ্র ধর্মান্ধতার পথে টেনে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে, তার ওপরে একটা অসামান্য চলচ্চিত্র রানওয়ে। এসব অসামান্য অবদানের জন্য ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে।
২০১১ সালের ১৩ আগস্ট তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র “কাগজের ফুল”-এর শুটিং এলাকা পরিদর্শনের পর ঢাকায় ফেরার পথে মানিকগঞ্জে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি, তার চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরসহ আরও তিনজন নিহত হন। এভাবে অকালে চলে না গেলে হয়ত মুক্তিযুদ্ধের ওপর, জঙ্গিবাদের ভয়াবহতাকে বিষয়ক আরও অসাধারণ সব কাজ দেখতাম তার।
আফসোস! জহির রায়হান থেকে আলমগীর কবির, তার থেকে তারেক মাসুদ- আমাদের চলচ্চিত্রজগতের অন্যতম সেরা তিন কীর্তিমানকেই অকালে চলে যেতে হলো।
তারেক মাসুদের প্রতি ভালোবাসা। শুভ জন্মদিন তারেক মাসুদ!



