Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মহারাজা তোমারে সেলাম!

সবার জীবনে সত্যজিৎ রায়ের পরশ পাবার স্মৃতি ভিন্ন। নিজের ঝাঁপি খুলে দেওয়ার দিন হোক আজ

আপডেট : ০২ মে ২০২২, ০১:০৪ পিএম

“পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র না দেখা অনেকটা চন্দ্র ও সূর্য না দেখার সমতূল্য”- আকিরা কুরোশাওয়া

১৯২১ সালের আজকের দিন অর্থাৎ ২ মে উত্তর কলকাতার গড়পার রোডের বাড়িতে সুকুমার রায় ও সুপ্রভা রায়ের একমাত্র সন্তান হিসেবে ধরায় এসেছিলেন মানিক ডাকনামের এই সত্যজিৎ রায়। তাই এ দিন শুধুমাত্র সত্যজিৎপ্রেমীদের কাছেই নয়, গোটা বাঙালি জাতি ও ভারতবর্ষের মানুষের কাছে একটি বিশেষ দিন। বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাস অপূর্ণ যাকে ছাড়া। বাঙালি ঋণী যে ঐতিহ্যবাহী রায় পরিবারের সৃষ্টির পরম্পরায়।

সত্যজিৎ রায় নিজে তার বাল্যস্মৃতি ‘‘যখন ছোট্ট ছিলাম’’ বইয়ে লিখেছেন,

“ছেলেবেলার কোন ঘটনা মনে থাকবে আর কোনটা যে চিরকালের মতো মন থেকে মুছে যাবে সেটা আগে থেকে কেউ বলতে পারে না। মনে থাকা আর না থাকা জিনিসটা কোনো নিয়ম মেনে চলে না। স্মৃতির রহস্য এখানেই।”

সবার জীবনে সত্যজিৎ রায়ের পরশ পাবার স্মৃতি ভিন্ন। নিজের ঝাঁপি খুলে দেওয়ার দিন হোক আজ।

তখন আমার অনেক ছোটবেলা। কিন্তু ঘটনাটা মনে আছে। কারণ মানুষটা ভীষণ বিখ্যাত। আমরা থাকি মিরপুর ২ নম্বরের এক রুমের বাসার সরকারি কলোনির লাল চার তলায়। তিনতলায় থাকতেন খালাম্মীরা। আমার কাজিন তুলি আপু ইত্তেফাক পত্রিকা সামনে ধরেন। একটা গাছের ছবি। বলেন, এখানে কয়টা মানুষের মুখ বলতে পারবি? আমি কিছুই বুঝি না। মনে হয় টিলো স্প্রেস খেলছিলাম। ধৈর্য্যও ছিল না পত্রিকায় মনোযোগে। তুলি আপু তখন বলেন, এটা সত্যজিৎ রায়ের আঁকা শেষ ছবি।

শেষ আঁকা ছবি দিয়ে আমার সত্যজিৎ রায় শুরু। তিনি ফিল্মমেকার তা পরে জেনেছি। সেবা প্রকাশনী অধ্যুষিত ভাইয়া মাফিক তিন গোয়েন্দা বেশি পড়তাম। কলোনির ঘরে ঘরে তখন লাইব্রেরি। কিন্তু এর বেশিরভাগ দখলে সেবার পেপারব্যাকে। কিশোর ক্লাসিক, রহস্য পত্রিকা এগুলো পড়তাম। সত্যজিৎ রায়কে ভাবতাম ‌‌‘‘ইন্ডিয়ান রাইটার’’। এ বইগুলো আসতো মহল্লার শাপলা আপা, কাজলা আপার লাইব্রেরি থেকে। নিয়ে আসতো বন্ধু রাজু। কখনও সুজা ভাই।

ফেলুদা আর প্রফেসর শঙ্কুকে দারুণ লাগতে থাকে। পথের পাঁচালি প্রথম দেখি ক্লাস ফাইভের দিকে। সম্ভবত বিটিভিতে। ব্রুস লি দেখা চোখ আর মন আমাদের তখন। ভালো লাগেনি “পথের পাঁচালি”।

স্কুলের বাংলার শিক্ষক শামসুন নাহার ম্যাডামও এক ক্লাসে এ ছবির কথা বলেন। বলেন, “বাংলা ভাষার শক্তিটা জানিস তোরা? আমরা চুপ। ম্যাম তখন বলেন, পথের পাঁচালির সাবটাইটেল দেখলে বুঝবি। মা ডেকেই যাচ্ছে, অপু যাস নে সোনা লক্ষ্মী শোন . . .। আর এর নিচে লেখা শুধু “অপু ডার্লিং কাম হিয়ার!”

এত কিছুর পরেও তখন পর্যন্ত “আম আঁটির ভেঁপু” বা “পথের পাঁচালি” টানেনি। আর স্যার-ম্যাডামদের মতিগতিও বুঝতাম না। তারা সেবা, হুমায়ূন আহমেদ, সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমরেশকে “অখাদ্য” বলেই যাচ্ছেন। স্কুলের লাইব্রেরিতে বাংলা চরিতাভিধান পাই। তাতে দেখি প্রায় সমস্ত গুণী মানুষ কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত। সত্যজিৎ রায় বাদে।

স্কুলবেলা শেষ হয় হয় তখন। আমরাও আঠারো আসুক নেমে বয়সের কাছাকাছি। ব্যাপকভাবে সমরেশ মজুমদার ভর করেন। গর্ভধারিণী, উত্তরাধিকার, কালবেলা, কালপুরুষ যেন বিপ্লবের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। লাস্টবেঞ্চে কোনো নকল লিখিনি। লিখতাম শুধু গর্ভধারিণীর শেষ লাইন,

“নবজাতকের সুতীব্র চিৎকার শোনা যাবে এখনই। যেকোনো মুহূর্তে।”

কাছাকাছি সময়ে “হীরক রাজার দেশে” প্রথম দেখি। চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় অন্তর ভেদ করেন। তাকে নিয়ে মূর্খতার জন্য অনুতপ্ত হই। ততদিনে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সাথে যুক্ত।  কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো পড়েছি। রাষ্ট্র ও বিপ্লব পড়েছি। গ্রামের গরিবদের প্রতিও পড়া শেষ। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস দারুণ লাগে। মনে মিলে এমন মানবীকে পড়তে দেই আহমদ ছফার পুষ্প, বৃক্ষ, বিহঙ্গ পুরাণ। পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় ভালো লাগতে থাকে বদরুদ্দীন উমরকে। কেউ শাহবাগ যাচ্ছেন শুনলে বলি ফরহাদ মজহারের নতুন কবিতার বই আনতে। কীভাবে যেন জড়িয়ে যাই বাম ছাত্র রাজনীতির সাথে।

একেই কি পাকামো বলে? কেন টানলো না অপু ট্রিলজি, ফেলুদা, গুপী গাইন বাঘা বাইন? মাথায় ভর করে শুধু গণ মানুষের দরকার। “হীরক রাজার দেশে”-কে সিনেমার ইশতেহার ভাবি। মনে হয় এই তো রাষ্ট্র! এভাবেই তো মন্ত্রণালয়গুলো সাজানো। বিজ্ঞান, যন্ত্রমন্ত্র ঘর কার স্বার্থে? মনে হতে থাকে এ ছবি হলে দেখার নয়। শ্রমিক অঞ্চলে দেখাতে হবে। এ চেষ্টা সফলও করি। মিরপুরের বাউনিয়া বাঁধ বস্তি, বসিলায় এমন কতগুলো জায়গায় হীরক রাজার দেশে দেখাই। মিরপুর ৬ নম্বরের ১৪ তলা প্রশিকা ভবন থেকে প্রজেক্টর ভাড়া আনতাম। টাকা আসতো পত্রিকা বিক্রি বা গণচাঁদা থেকে। প্রশিকার লিফটে উঠে সে অফিসের ইন্টেরিয়র দেখে নিজেরা নিজেরা এনজিও'দের খুব গালাগালি করতাম। তখন মনে হতো বিপ্লব খুব নিকটবর্তী। যদিও অনেকের সুচিন্তিত মত এমন যে, বাংলাদেশে এনজিও তৎপরতা আর বাম রাজনীতি চর্চার ভেতর বেশি পার্থক্য নেই।

 শ্রমিক এলাকায় হীরক রাজার দেশে দেখানোর অভিজ্ঞতা ভিন্ন। সবাই টের পান “হীরার খনির মজুর হয়ে কানা কড়ি নাই” গানের মর্ম। “দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান”- এই দৃশ্যে খুব হাততালি পড়ত। কিন্তু ছবি শেষে মানুষ আর রাজাকে সনাক্ত করতে পারেননা। যে যার ঘরে চলে যান। শক্তিশালী রাজনীতি ছাড়া শুধু সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট আর ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট আর কত দূর পারে!  

কিন্তু সত্যজিৎ ঠিকই হৃদমাঝারে থাকেন। সেরা সত্যজিৎ, আরো সত্যজিৎ পড়ি। বিটিভিতে সন্দীপ রায়ের ফেলুদা দেখি। “একেই বলে শুটিং” পড়ার পর অন্য মানুষ হয়ে যাই। সিনেমা দেখতে বসলে মনে হতো ছবির সেটে বসে আছি। একেই হয়তো বলে “ডিরেক্টরস আই”। তখন বুঝতে পারি সত্যজিৎ এক অন্য কারিগর। যিনি কুক্ষিগত করে রাখতে চান না শিল্প। বরং উত্তর প্রজন্মের কাছে তা বিস্তৃত করতে চান। বিলিয়ে দিতে চান নিজের জীবন নিংড়ানো অভিজ্ঞতা। “প্রসঙ্গ চলচ্চিত্র” বইয়ে এর নজির পাই।  

৩৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বাঙালির মননে এখনও অম্লান সত্যজিৎ রায়। তার বহুমুখী সৃষ্টিশীলতায় জনপদ পাল্টে যায়। কী তিনি জানেন না? সিনেমা, সাহিত্যের বাইরে টাইপোগ্রাফিতে তিনি অজর। সন্দেশ সম্পাদনায় তার শ্রেষ্ঠত্ব। বইয়ের প্রচ্ছদ তৈরিতে তিনি অদ্বিতীয়। সুকুমার পুত্র মানিক ডাকনামের এ স্রষ্টার সঙ্গীতে ডুব দিলে ফালতু মনে হবে একালের বাদ্য। অসাধারণ লিমেরিক লিখতেন তিনি। যার একটি মনে পড়ছে এখন-

“চোরের ভয়ে রামনারায়ণ খোট্টা

 ঘুমায় রাতে বন্ধ করে দোরটা।

 ইঁদুর এসে খেয়ে নিলো তার

 সাধের হ্যাট আর কোটটা।”

১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল প্রয়াত হন এই ব্যতিক্রমী বাঙালি। মৃত্যুর আগে তার হাতে দেয়া গুঁজে দেয়া পশ্চিমা অস্কার নয়, গর্ব লাগে বরং এই মহানের আদিবাড়ি আমাদের কিশোরগঞ্জে জেনে। কীর্তিময় রায় পরিবারের এই আদি ভিটে আমাদের রাষ্ট্র আদৌও সংরক্ষণ করেছে কি-না জানা নেই।

বিরলতম বাঙালি সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে মুগ্ধতা শেষের নয়। উনার টেলিপ্যাথিতে আস্থা ছিল বলে জানি। এপার থেকেই তাই অনন্তলোকের মায়েস্ত্রোকে বলি,

শুভ জন্মদিন, সত্যজিৎ রায়! মহারাজা, তোমারে সেলাম . . .

   

About

Popular Links

x