Wednesday, May 22, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

একটি সাদাকালো টিভি যেভাবে একত্রিত করেছিল পুরো গ্রামকে

টিভিতে আজান হলে আমরা পাঁচ মিনিটেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতাম ইফতারের জন্য। সময়ের এই তারতম্য হতো ভৌগলিক অবস্থানের কারণে। ভাবতাম, ইশ! ঢাকার মানুষজন আমাদের আগে ইফতার করতে পারে, ওরা কত ভাগ্যবান! এমন আজব ভাবনা তো শিশুমনেই উঁকি দেয়, তাই না

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০১:১৫ পিএম

’৯০ দশকের শেষদিকে আমার জন্মের পরপরই বাবা-মা ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের গ্রামের বাড়িতে চলে যান। তখনও দেশের সব এলাকায় পৌঁছায়নি বিদ্যুৎ। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, গ্রামে কেবল আমাদের বাড়িতেই একটি টেলিভিশন ছিল।

আমার বেড়ে ওঠা সেই অদ্ভুত দর্শন দূরদর্শন যন্ত্রটির সঙ্গে। ভাইয়েরা মজা করে বলতেন, সেই ১৭ ইঞ্চি টিভিটাই নাকি আমার ভাইবোন! কারণ আমার জন্মের পরপরই বাবা-মা বাড়ির জন্য যন্ত্রটি কিনেছিলেন।

নব্বই দশকের শেষভাগের আগ পর্যন্ত দেশে টেলিভিশন চ্যানেল বলতে ছিল সবেধন নীলমণি বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। কারণ তখনও বেসরকারি চ্যানেলগুলো গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছায়নি। তাই আমাদের উৎসব থেকে অবসর, সবকিছুই ছিল বিটিভি-কেন্দ্রিক।

আমার মায়ের স্মৃতিতে- রাজধানী ছেড়ে আমরা যখন দাদুবাড়িতে চলে যাই, প্রতি শুক্রবার বিকেলে এই টিভিটাকে ঘিরে আমাদের উঠোনে একটা বড়সড় জমায়েত হয়ে যেত। উঠোনে বসানো টিভি সেটকে চালানো হতো ব্যাটারি দিয়ে। গ্রামের প্রতিবেশীরা যাতে একত্রে বসে বিনোদন নিতে পারেন, সেজন্যই উঠোনে বসানো হতো যন্ত্রটিকে।

তখন বিটিভিতে দেখানো হতো হুমায়ুন আহমেদের বেশকিছু জনপ্রিয় নাটক। বিকেলে আমরা দেখতাম “আজ রবিবার”। তিতলী, কঙ্কা এবং বড় চাচার মতো চরিত্রগুলো ছিল আমাদের বিনোদনের বড় খোরাক।

নাটকের আরেক মজার চরিত্র আনিসের ডায়ালগে সবাই হো হো করে হাসত। তারা নাটকে এতই মজে থাকত যে বিজ্ঞাপনও তাদের কাছে বিরক্তির কারণ হতো না। আবার ৯০-এর সেই শৈল্পিক বিজ্ঞাপনগুলোও পছন্দ করতেন তারা।

নাটকের চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছিল আমাদের আপনজন। তাদের হাসিতে আমরা হাসতাম, তারা কাঁদলে ভিজত আমাদের চোখও।

নাটকের চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছিল আমাদের আপনজন। তাদের হাসিতে আমরা হাসতাম, তারা কাঁদলে ভিজত আমাদের চোখও।

ভিড় বেড়ে যেত ঈদের সময়টাতে। ঈদ নাটকের খণ্ডাংশে (ট্রেলার) চোখ রাখত দর্শকরা। আর জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান “ইত্যাদি”র জন্য ছিল অধীর অপেক্ষা। অনেকেই বারবার জানতে চাইত হানিফ সংকেত পরিচালিত সেই অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ। কারণ “ইত্যাদি”তে ঈদের জন্য থাকত একাধিক বিশেষ আয়োজন।

ইত্যাদিতে বিদেশিরা যখন অদ্ভুত উচ্চারণে বাংলা বলার চেষ্টা করত, হাসিতে ফেটে পড়ত মানুষ। নানা-নাতির উপস্থিতি তো বাড়তি হাসির রোল বইয়ে দিত দর্শকদের মাঝে।

গ্রামে কয়েক বছর থাকার পর নিকটবর্তী শহরে চলে যাই আমরা। তাই শৈশবের শেষদিকে বাড়িতে টিভি দেখার জন্য প্রতিবেশীদের ভিড় জমতে দেখিনি আর। কিন্তু সেই অদ্ভুত দর্শন ১৭ ইঞ্চি দূরদর্শন যন্ত্রটি আজও আমাদের পরিবারের সদস্য।

সাদাকালো টেলিভিশন/পেক্সেলস

রমজানে বিটিভিতে প্রচারিত হতো ধর্মীয় অনুষ্ঠান। বিশেষজ্ঞরা সেখানে দর্শকদের প্রশ্নের উত্তর দিতেন, রোজা রাখার উপকারিতা ও রমজানের ফযিলত নিয়ে আলোচনা করতেন এবং পাপের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন। আমার অবচেতন মন বুঝে নিত, এখনই শরবত বানানোর সময়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে যখন গজল শুরু হতো, বুঝে নিতাম ইফতারের আর বেশি বাকি নেই।

টিভিতে আজান হলে আমরা পাঁচ মিনিটেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতাম ইফতারের জন্য। সময়ের এই তারতম্য হতো ভৌগলিক অবস্থানের কারণে। ভাবতাম, ইশ! ঢাকার মানুষজন আমাদের আগে ইফতার করতে পারে, ওরা কত ভাগ্যবান! এমন আজব ভাবনা তো শিশুমনেই উঁকি দেয়, তাই না?

ঈদের রান্না আর ইফতার রেসিপির বিশেষ অনুষ্ঠান ছিল আমার পছন্দের। টিভিতে বাহারি খাবারের রেসিপি দেখে মায়ের কাছে বায়না ধরতাম সেগুলো বানিয়ে দেওয়ার জন্য।

টিভিতে দেখেই নতুন ফ্যাশন আইডিয়া পেতাম আমরা। তারপর কাঙ্ক্ষিত পোশাকটির জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তাম ঈদ শপিংয়ে।

সময়ের পরিক্রমায় আমরা বড় হই। বুড়ো হয় আমাদের সাদাকালো টেলিভিশন। বাড়িতে আসে রঙিন টেলিভিশন। ডিশ সংযোগের বদৌলতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সেই জেলা শহরের টিভিতে তখন ৬০টিরও বেশি চ্যানেলের সমাহার।

টিভি দেখার সেই মধুর দিনগুলো হারিয়ে গেছে। বিনোদনের খোরাক এখন মুঠোবন্দি। তবু আজও “ইত্যাদি” হবে শুনলে আমাদের বাড়িতে সবাই একত্রে বসে পড়ি টিভির সামনে।

কিছুদিন আগে মা ঢাকায় আমার বাসায় এসেছিলেন। আমার বাসায় এখনও টেলিভিশন কেনা হয়নি, তাই একত্রে ল্যাপটপে বসে “নক্ষত্রের রাত” দেখেছি আমরা। আমার বাড়ির সবাই নব্বইয়ের স্মৃতিতে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে। বিটিভির সেই স্বর্ণযুগ আজও আমাদের স্মৃতিতে ভাস্মর।

নব্বই দশকের মধুর স্মৃতিচারণ করেছেন ঢাকা ট্রিবিউন সাংবাদিক কানিজ ফাতেমা। ভাষান্তর: আহমেদ সার্জিন শরীফ।

About

Popular Links