সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের হাড় ও অস্থিসন্ধিতে (গিরা) পরিবর্তন হতে থাকে। এই পরিবর্তনের বৈশিষ্ট্য হলো- অস্থিসন্ধির উপরিভাগে থাকা কচি হাড় ক্ষয় হয়ে মসৃণতা কমে যাওয়া এবং চারিদিকে হাড় বেড়ে যাওয়া।
এই পরিবর্তনকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলা হয় অস্টিওআর্থ্রাইটিস। শরীরের ওজন, পেশা, দৈনন্দিন জীবনে হাঁটা-চলা, বংশের প্রভাব ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে এ পরিবর্তন কারো ক্ষেত্রে ধীরে এবং কারো দ্রুত হয় । এ পরিবর্তনের ফলে অনেকের গিরায় গিরায় ব্যথা হয়।
অস্থিসন্ধির এ পরিবর্তন হয়ে গেলে তাকে আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো পথ থাকে না। অস্টিওআর্থরাইটিসের কারণে হাঁটুতে, কোমরে লাম্বার স্পনডাইলোসিস), ঘাড়ে (সার্ভিকাল স্পনডাইলোসিস) ও একই সাথে শরীরে বিভিন্ন স্থানে (জেনারালাইজড অস্টিওআর্থরাইটিস) ব্যথা হতে পারে। আপনার ব্যাথার কারণ এই অস্টিওআর্থরাইটিস।
এটি কোনো মারাত্মক ধরনের বাত নয়। এ থেকে আপনার গিরা ছাড়া অন্য কোনো অঙ্গের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বাত শুনলেই অনেকে বাতজ্বরের কথা মনে করে ঘাবড়ে যান, কারণ অনেকেরই জানা আছে যে বাতজ্বরে হৃদপিন্ড আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
আপনার এ বাত থেকে তেমনটি হওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই।
যদিও কিছু কিছু সাবধানতা অবলম্বন না করলে ধীরে ধীরে গিরার আরও বেশি ক্ষতি হতে পারে।
চিকিৎসার বিষয়ে আপনার নিচের তথ্যগুলো জানা প্রয়োজন-
- এ রোগের চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ওজন বেশি হলে তা কমানো এবং স্বাভাবিক হলে তা বাড়তে না দেওয়া। এর জন্য চর্বিযুক্ত খাদ্য যেমন- গরু, খাসির মাংস এবং মিষ্টান্ন পরিহার করে চলা প্রয়োজন।
- নিয়মিত কিছু ব্যায়াম করা প্রয়োজন। এতে ওজন ঠিক থাকে এবং আক্রান্ত গিরায় ক্রিয়াশীল মাংস পেশীগুলোর ক্ষমতা বজায় থাকে । সাঁতার হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর ব্যায়াম। ১-২ ঘণ্টা পর পর ৫-১০ মিনিট করে হাঁটলেও উপকার হয়। তবে হাঁটাহাঁটি বা দাঁড়িয়ে থাকার ফলে হাঁটুর ওপর শরীরের ওজন পড়ে ক্ষয় ত্বরান্বিত হয়। এ কারণে একটানা দীর্ঘক্ষণ (৩০ মিনিটের বেশী হাঁটা বা দাঁড়িয়ে থাকা অস্টিওআর্থরাইটিস রোগীদের জন্য ক্ষতিকর)।
- হাঁটুর মোচড় এড়িয়ে চলবেন। দাঁড়ানো, হাঁটা ও বসা অবস্থায় আপনার হাঁটু যতদূর সম্ভব সোজা রাখবেন। পিড়ায় অথবা বিছানার ওপর পা তুলে বসলে হাঁটুতে মোচড় পড়ে, কাজেই এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। রান্নাবান্নার প্রয়োজন থাকলে চুলো উপরে রেখে টুলে বা উঁচু মোড়ায় বসে রান্নার ব্যাবস্থা করতে পারলে ভালো হয়।
- ঘন ঘন বা দীর্ঘক্ষণ হাঁটু গেড়ে বসা আপনার জন্য ক্ষতিকর। সম্ভব হলে শৌচাগারে প্যান বদলে কমোড বসাবেন ।
- হাঁটুতে অতিরিক্ত চাপ ফেলা এড়িয়ে চলবেন। চেয়ার থেকে ওঠার সময় হাতলে ভর দিয়ে উঠবেন। সিঁড়ি বেয়ে উঠানামা যতদূর সম্ভব কমাবেন ।
- ধূমপান করবেন না ।
- মনে রাখবেন, এ রোগে আমরা যে সমস্ত ওষুধ ব্যবহার করি সেগুলোর উদ্দেশ্য নিছক ব্যথা কমানো। গিরা বা অস্থিসন্ধিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার কোনো ওষুধ নেই। উপরন্তু কিছু কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ব্যথানাশক ওষুধগুলো গিরার ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে। কাজেই অল্প ব্যথাকে জীবনসঙ্গী মনে করে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। কেবল বেশি ব্যাথায় ওষুধ সেবন করবেন।
- আপনার আক্রান্ত গিরার পাশ্ববর্তী পেশীগুলোর শক্তি বজায় রাখতে পারলে গিরার ওপর চাপ কম পড়বে এবং ক্ষয়রোধ হবে। এছাড়াও মাত্রা বিশেষে অষ্টিওআর্থাইটিসে বিভিন্ন ধরনের ফিজিক্যাল চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। একজন বিএমডিসি রেজিস্টার্ড ডাক্তারেরপরামর্শ আপনার গিরার ক্ষয়রোধে সূদুরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে।
ডা. মুহম্মদ মুহিদুল ইসলাম
এমবিবিএস, এমপিএইচ (কোর্স)
চিফ মেডিকেল অফিসার, ডায়াগনস্টিক পয়েন্ট এন্ড রিসার্চ ল্যাব



