Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বাসের পেছন সিটটায়

শহরে চলা এমন বাসে ও প্রথম প্রেমে পড়ে এক কিশোরীর। বাসেই ফোন নম্বর বিনিময়। সম্পর্ক গাঢ় হয় দিনে দিনে

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৩, ১১:৩১ এএম

“উডেন মামা, তাড়াতাড়ি যামুগা”

কন্ডাক্টরের এ ডাক বিজ্ঞাপনীয়। তাতে সাড়া দিয়ে জোটে পেছন সিটের জগৎ। অপেক্ষা দেদার। তাড়াতাড়ির দেখা নেই। 

বাসের কাঁচ লেপ্টে থাকে অনেক স্টিকারে। তাতে সমকালীন বাংলাদেশের অপ্রাপ্তির নজির। দেখা পাবেন চাকরির বিজ্ঞাপন, বিসিএস প্রস্তুতি কোচিং, দোয়া কবুলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া ওরশ মাহফিল থেকে জাদুটোনা, বান মারার মতো সব মুশকিল আসানের খোঁজ। আবার কিছু স্টিকারের নিচে লেখা- “বাসের স্টাফদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করুন।” 

ভালো ব্যবহার সবারই প্রাপ্য। শুধু নির্দিষ্ট কোনো পেশাজীবীর নয়। ন্যায্য কথা। কিন্তু বাসে এমন লেখার অর্থ অন্য। পেছনের সিট জানে শহরের পরিবহন খাত বছরের পর বছর এক মন্দ সিন্ডিকেটের রাজত্বে বন্দি। 

কখনও পরিবহন মালিকের প্রতিপক্ষ শ্রমিক। পরিবহন শ্রমিক আবার চড়াও যাত্রীর ওপর। এমনও হয় যাত্রী মারে শ্রমিককে। এমন বহুমাত্রিক প্রতিক্রিয়ার না লেখা গল্প একলা বসে মনে জমায় বাসের পেছন সিট।  

অনেকগুলো বাসে ঠাঁই হয়নি। প্রচণ্ড গরম। বর্ষণের জ্যামে রাস্তা নিশ্চল। স্রোতের ঘাম নামছে শরীর বেয়ে। চোখে-মুখে ঘরে ফেরার আঁকুতি তার। এমন নারীর এক হাতে শিশু। আরেক হাতে দুর্মূল্যের বাজার থেকে কেনা খাবারের পট। কিন্তু সে মুহূর্তেও নিস্তার নেই। ভিড় বাসে কন্ডাক্টর থেকে কত ভদ্রবেশী পুরুষের যৌনক্ষুধা কচলে দেয় এই নারীর দেহজুড়ে। ইভের জাত নিপীড়নমুক্ত কি আদৌ হবে কোনো দিন? 

আবার এই সেদিন। পেছনের সিটের স্পষ্ট দেখা অভিজ্ঞতা। প্রতাপশালী ছাত্র সংগঠনের পরিচয়ে কম ভাড়া দেন দাপুটে যুবা। কন্ডাক্টর মানেন না। নির্দিষ্ট ভাড়া চাই তার। “বাস দাঁড় করা কলেজের সামনে” - যুবক উত্তর দেয়। বাস থামে। ছাত্রনেতার সহযোদ্ধারা একত্রিত হয়। প্রকাশ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে মেরে রক্তাক্ত করা হয় কন্ডাক্টর ও ড্রাইভারকে। পেছনের সিটের অজানা নয় যে, রক্তের রং প্রত্যেকেরই লাল আর এর স্বাদ নোনা। 

লালটু নামের এক বিহারি বন্ধু ছিল পেছনের সিটের। মিরপুর বেনারসী পল্লীতে ওর নিবাস। শহরে চলা এমন বাসে ও প্রথম প্রেমে পড়ে এক কিশোরীর। বাসেই ফোন নম্বর বিনিময়। সম্পর্ক গাঢ় হয় দিনে দিনে। এরপর কী যেন কী হয়! অল্প বয়সের ভালোবাসা বড় আবেগী কাঁচা বাঁশের সাঁকো। ঘটনাচক্রে বাসেই ঘটে বিচ্ছেদ। কিশোরী বাস থেকে নেমে যায় মিরপুর ১ - এ। লালটু তখন চিৎকার করে জানালা দিয়ে সদ্য হারানো প্রেমিকাকে বলে, “মারনেকে বাদ মেরে কবর পে আনা…”  

এসব তো গেল বাস নিয়ে পেছনের সিটের বিষাদ পর্ব। আবার এই বাসেই আছে অনবদ্য আনন্দ-স্মৃতি। পেছনের সিটের স্পষ্ট মনে পড়ে প্রথম পাহাড় দেখা। বান্দরবানে কুয়াশায় ঘোলা হেডলাইট। বাহন থেকে নেমে চিরহরিৎ উচ্চতার প্রতি নত হওয়া। ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মনিপুর স্কুলের পিকনিক বাস। বাদ যাবে কেন দরিয়া? বিশালত্বের সমুদ্র যখন কক্সবাজারের কলাতলীতে ধরা দেয়, তখন পেছনের সিটের বুকে ঘুমন্ত ছিল স্নিগ্ধ বধূ।

পেছনের সিটের আছে এমন অনন্ত গল্পের খনি। শুষে নিতে চাও কি তুমি এর সবটুকু?

   

About

Popular Links

x