ষাটোর্ধ্ব ময়েজ মিঞা এসেছেন বরিশালের আগৈলঝরা থেকে, সঙ্গে তার স্ত্রী মুন্নুজান। হাতে একটা মুরগি নিয়ে হেঁটে চলেছেন সবুজে ঘেরা প্রায় ২০০ বিঘা বিস্তৃত বিশাল দিঘির সুউচ্চ পাড় ধরে। দিঘির পাড়ে থাকা একেকটি বাড়িতে ঢুকছেন আর খোঁজ নিচ্ছেন সেখানে কুমির আছে কি-না। প্রায় সবগুলো বাড়ি থেকেই “না” উত্তর পেয়ে হতাশ ময়েজ-মুন্নুজান দম্পতি। ক্লান্তিতে অসাড় হয়ে আসছে পা, মাঝে মাঝে একটু জিরিয়ে আবার হাঁটছেন। উদ্দেশ্য একটাই; কুমিরের দেখা পাওয়া। কুমিরের দেখা পেলে খেতে দেবেন সঙ্গে আনা মুরগি।
শুধু ময়েজ-মুন্নুজান নন, এমন অসংখ্য মানুষ তাদের মতোই হাঁটছেন দিঘির পাড় ধরে। সবারই আশা একবার কুমিরের দেখা পাওয়া কিংবা কুমিরকে খেতে দেওয়া। তাদের কাছে এই কুমির পবিত্রতা, ভালোবাসা, আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক।
বলছিলাম বাগেরহাট জেলার সদর উপজেলায় অবস্থিত মুসলিম সাধক হযরত খানজাহান আলী (রহ.) এর মাজারসংলগ্ন ঠাকুরদিঘির কথা । স্থানীয়দের কাছে যেটি খানজাহান আলীর নামের সঙ্গে মিল রেখে “খাঞ্জেলী দিঘি” নামে পরিচিত। খাঞ্জেলী দিঘির নামকরণ সম্পর্কে বিভিন্ন কথা প্রচলিত রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, দিঘি খননের সময় বুদ্ধ ঠাকুরের মূর্তি প্রাপ্তির জন্য এর নাম হয় “ ঠাকুরদিঘি”। কারও কারও মতে হযরত খানজাহান আলীকে স্থানীয় হিন্দুগণ ভক্তিভরে “ ঠাকুর ” বলে সম্মোধন করতেন বলেই এরুপ নামকরণ। আবার কেউ কেউ বলেন, খাজাহান আলীর প্রিয় বন্ধু ছিলেন পীর আলী মোহাম্মদ তাহের। তিনি পূর্বে ব্রাক্ষ্মণ ছিলেন, খানজাহান আলী তাকে আদর করে “ ঠাকুর ” বলে সম্বোধন করতেন। তারই স্মৃতি রক্ষার্থে তিনি এ দিঘির নাম “ঠাকুরদিঘি” রেখেছিলেন।
ইতিহাস বলছে, হযরত খানজাহান আলী (রহ.) সুলতানী শাসন আমলে খ্রিষ্টীয় ১৪ শতকের প্রথম দিকে বাগেরহাটে খলিফতাবাদ নগর রাস্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। কথিত আছে, মানব প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যশোরের বারোবাজার থেকে শুরু করে সমগ্র ভাটি অঞ্চল জুড়ে ৩৬০টি মসজিদ নির্মাণ ও ৩৬০টি দিঘি খনন করেছিলেন এই মুসলিম ধর্মপ্রচার । এ অঞ্চলের মুসলমানদের উপাসনার জন্য মসজিদগুলো এবং নোনা পানির ভাটি অঞ্চলে পানীয় জলের এ দিঘিগুলো সাধারণ মানুষের কাছে আর্শীবাদস্বরুপ। এসব দিঘির মধ্যে ঠাকুরদিঘি সবচেয়ে বড়।
স্থানীয়রা বলছেন, ১৪ শতকের প্রথম দিকে নিজের শাসনামলে হজরত খানজাহান আলী (রহ.) এই দিঘিতে “কালাপাহাড়” ও “ধলাপাহাড়” নামে দুটি মিঠা পানির প্রজাতির কুমির ছাড়েন। তিনি নিজে কুমিরদের খাবার দিতেন।
খানজাহান আলীর মৃত্যর পর তাকে এই দীঘির পাড়েই সমাধিস্থ করা হয়। প্রস্তরনির্মিত তার সমাধিসৌধটি বর্তমানে দিঘির পাড়ের সৌন্দর্যের অন্যতম অংশ।
এই ধর্ম প্রচারকের মৃত্যুর পর তার ভক্তরা নিয়মিতিই মাজারে দেখাশোনা করতে থাকেন। অন্যদিকে, ঠাকুরদিঘিতে বেড়ে উঠতে থাকে কুমির “কালাপাহাড়” ও “ধলাপাহাড়”। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে মাজারকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। করতে থাকে বংশবিস্তার। এক সময় এসব কুমিরের সঙ্গে মানুষেরও এক ধরেনর মিতালি গড়ে ওঠে। তাদের মধ্যে ছিল না তেমন হিংস্রতা।
একইসঙ্গে এই কুমিরকে ঘিরে বাড়তে থাকে লোককথা। যেহেতু খানজাহান আলী ছেড়েছিলেন এই কুমির, তাই ভক্তদের মনে কুমিরকে ঘিরে বিশ্বাস ও আস্থা বাড়তে থাকে। তারা নিজেদের মনোবাসনা পূরণের জন্য কুমিরের উদ্দেশ্যে মানত করেন। কুমিরের খাবার হিসেবে হাঁস, মুরগি, খাসি, গরু ইত্যাদি মানত করেন তারা। একইসঙ্গে খানজাহান আলীর মাজারেও বিভিন্ন মানত করেন ভক্তরা। প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত আসেন মাজারে।
এদিকে, ভক্তদের মানত করার প্রবণতাকে ঘিরে মাজারের কিছু কিছু খাদেমদের মধ্যে জন্ম নেয় ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার লিপ্সা। মাজারের খাদেমদের বসবাস দিঘির পাড় ঘিরে। আর এই সুযোগটি কাজে লাগিয়েই অনেকেই তাদের বাড়ি তথা ডেরায় দিঘির সঙ্গে সংযোগ পুকুর খনন করেন। কুমির যখন এসব পুকুরে আসে তখন দেখার জন্য এবং মানতের জিনিস দেওয়ার জন্য ভক্তরা সেখানে ভিড় করেন। কুমিরের মুখের সামনে সেসব জিনিস রাখলেই তাদের মানত পূরণ হয়ে গেছে বলে প্রচলিত রয়েছে, এরপর মানতের সেসব জিনিসের মালিকানা সংশ্লিষ্ট খাদেমদের। আর এভাবেই খাদেমদের মধ্যে বাড়তে থাকে নিজ ঘাট তথা নিজ পুকুরে কুমির রাখার প্রতিযোগিতা। যার ঘাটে যত বেশি সময় কুমির থাকবে, তার তত বেশি লাভ। আর নিজ ঘাটে কুমির আটকে রাখতে কোনো কোনো অসাধু খাদেম কুমিরকে ঘুমের ওষুধ খাওয়াতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের।

অনদিকে, দিঘিতে রয়েছে বিশাল আকৃতির মাছ। এসব মাছ ধরতে কিছু অসাধু লোক গোপনে দিঘিতে ফাঁসজাল পাতেন বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের। এসব ফাঁসজালে আটকে বিভিন্ন সময় দিঘির কুমির মারা গেছে বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। নানা কারণে মৃত্যু এবং প্রজনন ক্ষমতা কমে যাওয়ায় একসময় দিঘিতে বিলুপ্তির মুখে পড়ে মিঠাপানির প্রজাতির এই কুমির।
প্রায় সাড়ে ছয়শ’ বছর পর ধলাপাহাড় ও কালাপাহাড়েরর শেষ বংশধর কুমিরটি মারা যায় ২০১৫ সালে ৫ ফেব্রুয়ারি । এরপর মাজারের ঐতিহ্য ধরে রাখতে ২০০৫ সালে সরকার ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ফার্ম থেকে ছয়টি মিঠাপানি প্রজাতির কুমির এনে এই দিঘিতে ছাড়ে সরকার । তবে সেগুলো “কালাপাহাড়- ধলাপাহাড়“ এর মতো অতটা নিরীহ জীবন যাপনে অভ্যস্ত নয়। তাদের হিংস্রতার কারণে, কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা হয় দিঘিতে মানুষের আগের মতো অবাধ ওঠা নামায়। ধীরে ধীরে এসব কুমিরও হয়ে ওঠে এখনকার জীবনযাত্রার সঙ্গে অভ্যস্ত। তারা ভক্তদের কাছে পরিচিত পায় “কালাপাহাড়- ধলাপাহাড়“ হিসেবে। একে একে মারা যায় এদের মেধ্যে থেকে চারটি কুমির। বেঁচ ছিল “মাদ্রাজ” নামের একটি পুরুষ কুমির এবং “পিলপিল” নামের একটি স্ত্রী কুমির। পিলপিল গত কয়েকবছর ধরে নিয়মিত ডিম পারলেও সেগুলো থেকে বাচ্চা হয়নি। তাই এই দুটি কুমিরকে ঘিরেই চলে ভক্তদের বিশ্বাস ও ভালোবাসা। কিন্তু, গত সপ্তাহে হঠাৎই দিঘির পানিতে ভেসে ওঠে মাদ্রাজ নামের পুরুষ কুমিরটির মরদেহ।
সাধারণ একটি মিঠাপানির কুমির প্রায় দেড়শ’ বছর বাঁচলেও এই কুমিরটির বয়স হয়েছিল মাত্র ৩০ বছর। তাই এটি স্বাভাবিক মৃত্যু কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের অভিযোগ, এক খাদেম নিজ ঘাটে কুমিরটিকে আটকে রাখতে দীর্ঘদিন ধরে খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ প্রয়োগ করেছিলেন। তার প্রভাবেই কুমিরটির মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ। একই অভিযোগ করেছেন, মাজারের প্রধান খাদেমসহ অনেক খাদেম। তবে, স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়া গেলে কুমিরটির মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে।
এদিকে কুমিরের এই মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না ভক্তরা। কুমিরের মৃত্যুর সংবাদে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। এখন সঙ্গীহারা পিলপিলকে নিয়েই তাদের বিশ্বাস এবং ভালোবাসার খেলা। আর পিলপিল কোন ঘাটে আছে সেটি খুঁজতেই দিঘির চারপাশে ঘুরছেন ময়েজ-মুন্নুজানরা। সঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, কুমিরের সঠিক দেখভালের ব্যবস্থা না থাকার বিরুদ্ধে। জানালেন, মাজারের কুমির ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সরকারকে আরও উদ্যোগী এবং যত্নবান হওয়ার আহ্বান।



