Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

১০ বছর ধরে দোকানদার ছাড়াই চলছে কুমারখালী স্টেশনের দোকানটি

উদ্যোক্তা শিপন বলেন, আমি একজন হকার। শুধু দোকানে বসে থাকলে সংসারের খরচ জোগাড় করতে পারব না। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গামছা, তোয়ালে, রুমাল বিক্রি করি। আর এদিকে দোকানটাও চলছে

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২৩, ০৩:৪২ পিএম

সম্পদের ব্যক্তি মালিকানা শুরুর পর থেকে তা রক্ষায় নানা সময়ে নানা রকম কৌশল ও অবলম্বন খুঁজেছে মানুষ। আবিষ্কার করেছে নিত্যনতুন নিরাপত্তা সরঞ্জাম। তালা-চাবি, সুউচ্চ প্রাচীর, দুর্ভেদ্য বেষ্টনী, আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরাসহ উন্নত সব প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে আজকাল। অবিশ্বাস জেঁকে বসা এই সময়ে কেউ কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে চান না।

অবিশ্বাস আর আস্থাহীনতার এই যুগে বিশ্বাসের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী স্টেশনের প্লাটফর্মের দোকানদার হামিদুর রহমান শিপন। টানা প্রায় দশ বছর ধরে দোকানি ছাড়াই চলছে তার দোকানটি। তবে অবিশ্বাস্য হলেও সত্য সকাল থেকে রাত অবধি দোকানদারহীন এই দোকানে কখনো চুরির ঘটনা ঘটেনি।

“ভিন্ন রকম দোকান” নামের এই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানটির নেই কোনো নিরাপত্তাকর্মীও। প্রতিটি পণ্যের গায়ে দাম লেখা রয়েছে। ক্রেতারা পছন্দসই পণ্য কিনে টাকা রাখার বাক্সে দাম পরিশোধ করে চলে যান। পণ্য নিয়ে কেউ মূল্য পরিশোধ করেননি-এমন ঘটনাও ঘটেনি কখনো। দোকানি নেই জানা সত্ত্বেও সেখানে কোনো দিন চুরি হয়নি। প্রায় দশ বছর ধরে এভাবেই চলছে দোকানটি।

হামিদুর রহমানের বাড়ি কুমারখালী পৌর সভার কাজিপাড়া এলাকায়। তিনি পেশায় একজন হকার। কখনো বাসে, কখনো ট্রেনে আবার কখনো মার্কেটে ঘুরে ঘুরে গামছা, রুমাল, লুঙ্গি, শাড়ি বিক্রি করেন।

দুই মেয়ে ও এক ছেলের সংসার শিপনের। নিজে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। তার বড় মেয়ে পাংশা কলেজে স্নাতকে পড়ছেন; ছোট মেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে আর ছেলে পড়ছে সপ্তম শ্রেণিতে। দোকানের আয়েই ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার খরচ, পরিবারের ব্যয়, খাবার কেনা- সবই করেন।

জনহিতকর কাজও করেন শিপন। স্টেশনে ট্রেন যাত্রীদের বিনামূল্যে পানি পানের ব্যবস্থা করতে জমানো ১,৮০০ টাকায় কিনেছেন ফিল্টার। এছাড়া যাত্রীসেবায় নিজের টাকায় স্টেশনে লাগিয়েছেন দুটি ফ্যান। অসুস্থ ট্রেনযাত্রীদের ওঠা-নামার ব্যবস্থা করেন এবং বিনামূল্যে মৃত্যু সংবাদ প্রচার করেন।

শিপনের দোকানের সামনেই ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে রুমাল। প্রতিটি রুমালের গায়ে দাম লেখা। এছাড়া ছোট এই দোকানে থরে থরে সাজানো রয়েছে গামছা, তোয়ালে, থ্রি-পিস, শাড়ি, টি-শার্ট, ছোটদের জামা কাপড়, হাত মোজা, পা মোজাসহ বিভিন্ন পণ্য। তবে নেই কোনো দোকানি। ছোট এই দোকানটির জন্য প্রতি মাসে ৬০০ টাকা ভাড়া গুনতে হয় শিপনকে।

এই উদ্যোগের বিষয়ে হামিদুর রহমান শিপন বলেন, “আমি একজন হকার। শুধু দোকানে বসে থাকলে আমার সংসারের খরচ জোগাড় করতে পারব না। তাই বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গামছা, তোয়ালে, রুমাল বিক্রি করে বেড়াই। একইসঙ্গে দোকানও চলছে। ক্রেতারা দোকানে এসে পণ্য পছন্দ হলে সেটার মূল্য তালিকা দেখে দোকানের সামনে ঝুলিয়ে রাখা বাক্সে টাকা পরিশোধ করে চলে যান।”

দোকানে কখনো চুরি হয়েছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “চুরি হাওয়া নিয়ে আমি চিন্তা করি না। আমি মানুষকে বিশ্বাস করি। আর বিশ্বাসের ওপর দোকান করেছি। নিজেকে বিশ্বাস করি বলে মানুষের ভালোবাসা নেওয়ার জন্য আমি দ্বারে দ্বারে ঘুরি। গত প্রায় দশ বছর ধরে এভাবেই চলছে। দোকান থেকে দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় হয়। প্রতিদিন সকাল ৯টায় দোকান খুলে রাত ১১টায় বন্ধ করি।”

দোকানটিতে পণ্য কিনতে এসেছিলেন রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, “এখনকার সময় যেখানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এত এত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয় সেখানে দোকাদারহীন দোকান অবিশ্বাস্য বলা চলে। এই দোকানের একটা পণ্য কিনতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে হচ্ছে।”

   

About

Popular Links

x