Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

আমেরিকান সেন্টার উড়িয়ে দিয়েছিল দুর্ধর্ষ গেরিলারা

মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ঢাকা ট্রিবিউনে গবেষক রা'আদ রহমানের লেখা সিরিজের দশম পর্ব এটি

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২৩, ০১:২২ পিএম

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের শেষপর্যায়ে বিভিন্ন সম্মুখ ফ্রন্টে দিশেহারা ও পর্যদুস্ত পাকিস্তানি সেনারা ঢাকায় প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হচ্ছিল গেরিলাদের রুদ্ররোষের। বিশেষত আচমকা প্রবল আক্রমণের ভয়ে পাকিস্তানি সেনারা সন্ধ্যার পরে বিভিন্ন রাস্তায় টহল দিতে ভয় পেত, তাদের মনোবল নেমে এসেছিল শূন্যের কোটায়। 

যুদ্ধের শেষপ্রান্তে ঢাকায় গেরিলাদের যে কয়টি হামলা দেশীয় পরিমণ্ডল পেরিয়ে রীতিমতো আন্তর্জাতিকভাবে তোলপাড় তুলেছিল, তার মধ্যে অন্যতম ঢাকায় আমেরিকান কালচারাল সেন্টার বা ইউসিস সেন্টারে হামলা। তৎকালীন বিশ্বমোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তানি খুনি জেনোসাইডারদের নির্লজ্জ পক্ষাবলম্বনে ইউসিসে হামলা দিয়েছিল এক প্রবল ধাক্কা!

একাত্তরের শুরু থেকেই মার্কিন সরকার তাদের ভৃত্য ইয়াহিয়া সরকারের প্রতি প্রকাশ্যে নির্লজ্জ সমর্থন ও সার্বিক সহায়তা দিয়ে আসছিল। একাত্তর পূর্ববর্তী সময়েও স্বৈরাচারী অত্যাচারী শোষক পাকিস্তানি জান্তা সরকারের অন্যতম প্রধান প্রভু আমেরিকানদের বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয় এই ইউসিস ভবনের সামনে। পোড়ানো হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তাদের দোসরদের কুশপুতুল। কিন্তু কোনো আমেরিকান স্থাপনায় সরাসরি হামলা চালানো ছিল সম্ভবত মার্কিনিদেরও চিন্তার বাইরে। 

এই হামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি কারণ হচ্ছে তৎকালীন বাংলাদেশে চলমান জেনোসাইডের অন্যতম প্রধান কুশীলব কুখ্যাত নরঘাতক জেনারেল রাও ফরমান আলি ৬ ডিসেম্বর সোমবার এক প্রেস কনফারেন্সে ঢাকার সাংবাদিকদের জানিয়েছিল, ‘‘ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাষ্ট্রবিরোধী ও দুষ্কৃতিকারীদের তৎপরতা বর্তমান প্রকৃতপক্ষে স্তব্ধ হয়ে গেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাফল্য বিশেষত ঢাকার আকাশে পাকিস্তানি বৈমানিকদের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধে জনসাধারণ মোটামুটি উৎফুল্ল হয়ে উঠেছে।’’

কী নির্লজ্জ হাস্যকর এক বাগাড়ম্বর! যেখানে পাকিস্তানি সেনারা মিত্রবাহিনীর হাতে একেবারে রুদ্ধশ্বাস নিরবিচ্ছিন্ন প্রচণ্ড মার খেয়ে পালিয়ে কুল পাচ্ছে না, সেখানে তখনো ফরমান মিডিয়ায় একেবারে উল্টো গল্প চালিয়েই যাচ্ছে! মজার ব্যাপার হচ্ছে ফরমান আলি যখন এই বাগাড়ম্বর করছিল, তখনো ঢাকার আকাশে মিত্র বাহিনীর পূর্ণ আধিপত্য, পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।

কালচারাল সেন্টার ইউসিস-এ গেরিলাদের এই অকুতোভয় হামলা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তার লেফট্যানেন্ট জেনারেল আর মেজর জেনারেলদের গালে কষে প্রচণ্ড এক চড় বসিয়ে দিয়েছিল যেন! বর্তমান জাতীয় প্রেসক্লাবের ঠিক অপজিট কর্নারে ছিল ইউসিস বিল্ডিং। বর্তমানে যেখানে সচিবালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (তখন সম্ভবত জেলা প্রশাসকের অফিস ছিল) সেখানে আর্মি ক্যাম্প ছিল। দুই বিল্ডিংয়ের ওপরে সার্বক্ষণিক মেশিনগান নিয়ে পাহারা দিত পাকিস্তান আর্মি। সুতরাং ওইস্থানে এমন টাইট সিকিউরিটির মধ্যে হামলা চালানো ছিল রীতিমতো দুঃসাহসিক। 

কিন্তু সেখানেই হামলা চালিয়ে হানাদারদের দখলে থাকা ঢাকা তথা বাংলাদেশের জনগণ যেন আরেকবার প্রবল রুদ্ররোষে জানিয়ে দিল, ‘‘হানাদারদের দম্ভ আমরা বারবার এভাবেই চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে থাকব!’’

গেরিলা মুক্তিবাহিনীর ইউসিস অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিল প্রথমত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশবিরোধী মনোভাবের যথোপযুক্ত জবাব দেওয়া। দ্বিতীয়ত, রাও ফরমান আলিকে তার নোংরা মিথ্যাচারের জবাবে একটা উপযুক্ত ছবক দেওয়া। তৃতীয়ত, মুক্তিবাহিনী যে ঢাকার অব্যাহত তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরিণতি ক্রমেই ভয়াবহ দিকে যাচ্ছে অবরুদ্ধ ভীত মানুষজনের মধ্যে এই বিশ্বাস জারি রাখার রসদ যোগানো। অধিকৃত ঢাকায় এটিই ছিল মুক্তিবাহিনীর সর্বশেষ বড় অপারেশন। কারণ এই অপারেশনের সুদূরপ্রসারী ধাক্কায় মাত্র তিন ঘণ্টার মাথায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকাজুড়ে কারফিউ জারি করে।

সাড়া জাগানো এই অপারেশন ক্যারি আউট করেন চার গেরিলা। এদের মধ্যে তিনজন ছিলেন অপারেশনের মূল কাজে, অপরজন ছিলেন গাড়ি ড্রাইভিংয়ে! সবাই ছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা। তারা হলেন, স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন (বাবুল), মানু, নীলু ও জিয়াউদ্দিন। 

অপারেশনের আগে রেকির কাজ সম্পন্ন করেন বাবুল, পর পর দুইবার রেকি করেন তিনি। ৯ ডিসেম্বর তিনি বিস্ফোরক, দুটি স্টেনগান ও আটটি স্টেনগানের ম্যাগজিনসহ ঢাকায় প্রবেশ করেন। কিন্তু অদ্ভুত হলেও সত্য, তিনি তখনো জানেন না তার বাকি দুই সহযোগী কারা! হাইকমান্ড থেকে কাউকেই শুরুতে বাকিদের ব্যাপারে জানানো হয়নি!

মোবাশ্বেরের ওপর নির্দেশ ছিল ২০ ডিসেম্বর ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের আহসানউল্লাহ হলে একটি নির্দিষ্ট রুমে উপস্থিত হতে হবে। রুমটি ছিল ক্র্যাক প্লাটুনের আরেক দুর্ধষ গেরিলা শহিদ বদিউল আলমের রুম। সেখানে যাওয়ার পরেই তিনি গেরিলা মানু ও নীলুর দেখা পান। মানু এবং নীলু দুজনেই ঢাকা থেকে পালিয়ে মেলাঘরে গিয়ে পূর্ণাঙ্গ গেরিলা ট্রেনিং নিয়েছিলেন। আর এই দুজন জানতে পারেন, বিস্ফোরক বহনকারী গেরিলার নাম মোবাশ্বের। এরপরে বাবুল জানান তাদের গাড়ি চালিয়ে জায়গামত নিয়ে যাবেন যে গেরিলা তার নাম জিয়া। 

বাবুলের বন্ধু জিয়াউদ্দিনও ছিলেন স্থপতি। একটা প্রাইজবন্ডের লটারি জিতেছিলেন জিয়া,  জার্মানির তৈরী নতুন একটা ভক্সওয়াগন বিটল (সম্ভবত ১৯৭০ মডেলের) গাড়ি কেনেন তিনি।  তৎকালীন সময়ে ভক্সওয়াগন গাড়ির আমদানিকারক ছিল মডার্ন মটরস, মডেলভেদে দাম ছিল দশ থেকে বারো হাজার টাকা। জিয়াউদ্দিনের কেনা সেই ভক্সওয়াগন বিটল গাড়িটি এরপর হয়ে ওঠে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, মোবাশ্বের এবং জিয়াউদ্দিন এই গাড়িটি ব্যবহার করে পরিচালনা করেন দুর্ধষ সব অপারেশন! আমেরিকান কালচারাল সেন্টারে হামলার জন্যও মোবাশ্বের জিয়াউদ্দিন ও তার গাড়িকে বেছে নেন।

মোবাশ্বের প্রথমবার যখন রেকি করতে ক্যাম্প (ঢাকার বাইরে কয়েক মাইল পূর্বে গেরিলাদের ক্যাম্প ছিল) থেকে ঢাকায় এসেছিলেন, তখন তার উদ্দেশ্য ছিল সেক্রেটারিয়েট, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ভবন ও তার আশেপাশে মিলিটারি ও পুলিশের প্রহরী অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা। এছাড়া ইউসিসে গিয়ে সেখানকার এক নারী কর্মচারীর সঙ্গেও তিনি আলাপ করেন। বলেন, উচ্চশিক্ষার্থে তিনি দেশের বাইরে যেতে চান। এ ব্যাপারে করণীয় জানাতে পারলে তিনি খুবই উপকৃত হবেন।

এভাবে দেখেশুনে কয়েকদিন পর আবার ফিরে আসেন ঢাকায় দ্বিতীয়বার রেকি করার উদ্দেশ্যে। এবারকার রেকির উদ্দেশ্য ছিল- কোন পথে গেরিলারা বিস্ফোরক নিয়ে প্রবেশ করবেন, অপারেশনের পর কোন পথে পালিয়ে যাবেন, কোথায় চার্জ ফিট করা হবে, গেরিলাদের গাড়িটা কোথায় অপেক্ষা করবে, কিভাবে লোকজন যথাসম্ভব কম হতাহত হবে, এই মার্কিন সংস্থার কর্মচারী ও অন্যান্য বহিরাগতরা কীভাবে কোন পথে পালিয়ে যেতে পারবে ইত্যাদি সবকিছুই রেকি করে হিসেব নিকেশ করে ফিরে আসেন মোবাশ্বের।  

সিদ্ধান্ত হয় ইউসিস লাইব্রেরির মাঝখানে বসানো হবে বিস্ফোরক চার্জ। মোবাশ্বের তার সাক্ষাৎকারে কারণটা সম্পর্কে জানিয়েছিলেন এভাবে- 

“আমরা একটাও নিরীহ মানুষকে মরতে দেব না। কীভাবে? আগে ইউসিস বিল্ডিং থেকে সব লোককে বের করে দিয়েই আমাদের অপারেশন করার চেষ্টা করব। মানুর বক্তব্য ছিল লোক বের করতে গেলে তো আমাদেরকেই মরতে হবে পাকিস্তানি মিলিটারির গুলিতে। সিদ্ধান্ত হলো -উই উইল টেক দ্য রিস্ক। সাধারন মানুষগুলোকে রক্ষায় অনেকটা আত্মাহুতি দেওয়ার মতো চিন্তাভাবনা।”

কর্মচারী ও অন্যান্যদের পাঠাগারের পেছনে “ফায়ার এক্সিট” দিয়ে বের করা হবে এবং গেরিলারা মূল দরজা দিয়ে প্রবেশ ও প্রস্থান করবে। ঢাকায় ফিরে যাওয়ার দিন মোবাশ্বের একটা বড় ব্রিফকেস কিনে নিয়ে যান। সেদিন রাতেই ক্যাম্পে পৌঁছে ওই ব্রিফকেসের মধ্যে সাজানো হলো বিস্ফোরক দ্রব্যাদি। ২৫ পাউন্ড পি-কে, একটি ডেটোনেটর-২৭ এবং দেড় মিনিটের ফিউজ ওয়্যার। ব্রিফকেসের দুই পাশ ফুটো করে হাতলের পাশ দিয়ে বের করে রাখা হলো ওয়্যারের মাথা। 

বৈঠকে ঠিকঠাক হলো, অপারেশন করা হবে একদম সকালবেলা। কারণ দিনের একমাত্র সেই সময়েই পাঠাগারে লোকজনের সংখ্যা কম থাকে। গেরিলারা চাচ্ছিলেন যতটা সম্ভব কম সিভিলিয়ান ক্যাজুয়ালিটিতে অপারেশনটা সম্পন্ন করতে। সুতরাং সকালে বোমা হামলা চালালে যদি বাইরের কোনো সিভিলিয়ান হতাহত হয়ও, কোনোক্রমেই তা এক-দুই জনের বেশি হবে না। সকালে অপারেশন চালানোর আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল সময় নিয়ে ধীরে-সুস্থে নিখুঁতভাবে কাজ সেরে ফেলা। কারণ একটা মার্কিন প্রপার্টিতে অপারেশনের তাৎপর্য হবে বিশাল, সুতরাং কোনোভাবেই ব্যর্থ হওয়া যাবে না। 

অপারেশনের দিন শুরুতেই জিয়াউদ্দিনের গাড়ির নম্বর প্লেট বদলানো হলো। সেই গল্প মোবাশ্বের তার সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন এভাবে-

“জিয়ার গাড়ির নম্বর প্লেট বদলাতে হবে। বদলাব কোথায়? সেই সময় ঢাকা শহর ঘুরে ঘুরে দেখেছি নিরাপত্তা বিবেচনায় সবাইতে দুর্বল জায়গা হচ্ছে থানার আশপাশে। থানার পাশে পুলিশ সবচাইতে কেয়ারলেস ছিল। বর্তমানে রমনা থানার যে পাশ দিয়ে রাস্তাটা যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বাড়ির দিকে গেছে, সেটি তখন ছিল দু পাশে জঙ্গলে ভরা নিরিবিলি সরু একটি রাস্তা।থানার প্রবেশ পথটি ছিল বর্তমান প্রধান সড়ক থেকে। থানার ওপাশের সরু পথের ধারে ভক্সওয়াগন গাড়িটা দাঁড় করিয়ে আমরা নম্বর প্লেট বদলালাম। ওখানে থানার পাশেই আমরা প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ ভরা ব্রিফকেস ও আর্মসগুলো ভাগ করে নিলাম। মানুষ দেখছে আমরা গাড়ি ঠিক করছি। সারা ঢাকা ঘুরে আমার কেন জানি মনে হয়েছিল এ জায়গাগুলোই হচ্ছে সবচাইতে নিরাপদ। এখানে কেউ সন্দেহ করবে না। অপারেশন শেষে একই পদ্ধতিতে ওই জায়গায় এসেই আমরা গাড়ির সঠিক নম্বর লাগিয়ে অস্ত্রগুলো একত্রিত করে নিরাপদ স্থানে রেখেছিলাম। আমাদের গায়ের কোট পরিবর্তন করেছি ওখানেই।”

মানু ও নীলুর হাতে স্টেনগান, তারা দুজন দুইপাশের দুই জানালার ধারে পজিশন নিয়ে বসেছেন, স্টেন এমনভাবে ধরা যেন বাইরে থেকে কেউ দেখলে সহজে না বোঝে। অন্যদিকে সামনের সিটে বসা মোবাশ্বেরের হাতে ব্রিফকেস। প্রত্যেকের পরনেই ফিটফাট পোশাক। সকাল ৯টার দিকে ভক্সওয়াগনটি ইউসিস বিল্ডিংয়ের সামনে এসে থামল। মোবাশ্বের ব্রিফকেস নিয়ে গাড়ি থেকে পাঠাগারের মূল দরজা অর্থাৎ তোপখানা রোডের পাশের দরজা দিকে এগিয়ে গেলেন। তার পেছন পেছন স্টেনগান ভাঁজ করে কোটের ভেতর লুকিয়ে নিয়ে একেবারেই ভদ্রলোকের ভঙ্গিতে এগিয়ে গেলেন মানু। মোবাশ্বের পাঠাগারের ভেতর ঢুকে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মানুও ঢুকে পড়লেন এবং দরজা আটকে তার ওপর পিঠ ঠেকিয়ে স্টেনগান উঁচিয়ে বললেন, “কেউ নড়বেন না। হাত তুলুন। ডোন্ট মুভ। এভ্রিবডি হ্যান্ডস আপ!”

অপারেশন নিয়ে সাক্ষাৎকারে এরপরের ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিয়েছেন মোবাশ্বের হোসেন এভাবে-

“ওই সকালেও যেয়ে দেখি ওখানে ১৫-২০ জন লোক, তারা পড়াশোনা করছে। আমরা দুজন কোট পরে ঢুকেছি। স্টেনগান কোটের ভেতরে। ঢুকেই সবাইকে হাত তুলতে বলেছি। স্টেনগান দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে সবাই হাত তুলেছে। একজন আর হাত তোলে না। তাকে গালি দিয়ে বের করা হলো। পরে জানতে পারলাম সে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের ছাত্র সামদানী (পরবর্তীতে বিদেশে দুর্ঘটনায় মারা যায়), আমাকে চিনে ফেলেছে। আমাকে দেখে সে ভয় পেয়ে ভেবেছিল, যদি আমি তাকে চিনতে পারি, তবে হয়তো তাকে আমি অন দ্য স্পট গুলি করে মেরে ফেলব। এই ভয়েই সে হাত তুলছিল না।

সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হলো, ডানে বায়ে কেউ তাকাবেন না। ঝড়ের বেগে দৌড়াতে দৌড়াতে চলে যাবেন। চলে যাবার পর ডেটোনেট কর্ডে দিয়াশলাইয়ের আগুন দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পর দেখি ডেটোনেটর কর্ডের আগুন দৃশ্যমান হচ্ছে না। আমাদের শেখানো হয়েছে একবার ডেটোনেট করার পরে দ্বিতীয়বার নেভার ট্রাই। সুপ্ত আগুনে বার্স্ট হয়ে যেতে পারে। আমার মাথায় তখন এসব ভয়ডর নেই। অপারেশন সাকসেসফুল হওয়াটাই ছিল তখন একমাত্র চিন্তা। দ্বিতীয়বার আগুন দিয়ে দুজনে বের হয়ে এসেছি। বাইরে স্টার্ট করা গাড়িতে অস্ত্র সহ বসা মুক্তিযাদ্ধা ফুলু।

ইউসিসের অডিটরিয়ামে ঢোকার পথে রিসিপশনিস্ট মেয়েটার সঙ্গে গল্প করছে বন্ধু জিয়া। অসম্ভব সাহসী ছিল জিয়া। যেকোনো উত্তেজনাকর মুহূর্তে স্বাভাবিক থাকতে পারার অসাধারণ গুণ ছিল তার।মানু ছিল সব সময় আমার পাশে পাশে। আমরা সবাই গিয়ে গাড়িতে উঠলাম। ওঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ হলো। আমি এত টেনশনে ছিলাম যে, ওই শব্দও শুনতেই পাইনি। শুধু দেখলাম দরজা-জানালার কাঁচ চারদিকে উড়ে যেতে, অসংখ্য মানুষ জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াচ্ছে চারদিকে। ওই বিল্ডিংয়ের পাশে সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং ও পাশের ভবনে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এই বিল্ডিংয়ে ছিল অডিটোরিয়াম, লাইব্রেরিসহ আমেরিকান অফিস।

অপারেশন করার পর আমরা ওখান থেকে চলে গেলাম সেই রমনা থানার পাশের রাস্তায়। অস্ত্র গোলাবারুদ একত্রিত করে নিরাপদ স্থানে রাখার ব্যবস্থা করা হলো। এরপর আমার গোপীবাগের ৫৩, রামকৃষ্ণ মিশন রোডের বাসায় চলে এলাম। বাসায় এসে আমার ছোট্ট সন্তানটিকে কোলে নিয়ে স্বাভাবিকভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়ালাম। আমাদের বাসার একটা অংশে ছিল সরকারি অফিস।
সেক্রেটারিয়েট এলাকায় দিনের বেলায় এই ঘটনা ঘটার পরিপেক্ষিতে ভীতিজনক এলাকার বাসাবাড়ি ছেড়ে সরকারি অফিসের বেশ কিছু বড় কর্তা পরিবার পরিজন সহ নিরাপদ মনে করে আশ্রয় নেয় এই সরকারি অফিসে। পাশের বাড়ির এক অবাঙালি পরিবারের কর্তা দৌড়ে এসে আমাকে জানাল- “শুনছেন, কী হয়েছে জানেন? ডেঞ্জারাস ঘটনা। ঢাকা শহরের ভেতর এত বড় বিস্ফোরণ ঘটল! তাও দিনের বেলা সকাল ৯টায়! খুব সাবধানে থাকবেন।” 

তথ্যসূত্র:

- স্বাধীনতা সংগ্রাম-ঢাকায় গেরিলা অপারেশন/ হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ

- বিশেষ সাক্ষাৎকার- গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ও স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন (বাবুল)

   

About

Popular Links

x