গর্ভাবস্থা যেকোনো নারীর জীবনেরসুন্দর একটা সময়। অনাগত সন্তানের সুস্থতার জন্য সব ধরনের মনোযোগ দেন একজন গর্ভবতী মা। সেজন্য তারা মেনে চলেন নানা ধরনের নিয়মকানুন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াও বাংলাদেশের বহু নারী এমন কিছু রীতিনীতি মেনে চলেন যেগুলো বংশপরম্পরায় কিংবা সামাজিকভাবে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত।
বাংলাদেশে নারীর গর্ভকালীন অবস্থার জন্য নানা ধরনের মিথ বা কল্পকথা চালু আছে। গর্ভবতী নারী কী করতে পারবেন বা কী করতে পারবেন না এনিয়ে নানা ধারণা বা বিশ্বাস প্রচলিত। আর এগুলো মেনে চলতেও গর্ভবতী নারীকে বিশেষ চাপ দেওয়া হয়।
তবে চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব ধারণা বা বিশ্বাসের সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই। চলুন জেনে নেওয়া যাক প্রচলিত সেসব ভুল বিশ্বাসগুলো সম্পর্কে-
সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের সময় কিছু করা যাবে না
গর্ভাবস্থায় সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের সময় এরকম বিধিনিষেধ মেনে চলার কথা বাংলাদেশের প্রায় সবখানে প্রচলিত। এসময় কোনো কাজ করলে বাচ্চার ওপর সরাসরি তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে; এমন বিশ্বাস থেকেই এই নিষেধাজ্ঞা।
বলা হয়ে থাকে, সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের সময় গর্ভবতী মা যদি কিছু কাটাকাটি করেন, তাহলে গর্ভস্থ সন্তান কান কাটা বা ঠোঁট কাটা অবস্থায় জন্ম নেয়। অথচ এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
চাঁদ যখন পৃথিবীর কক্ষপথে ঘোরে, তখন তার প্রদক্ষিণ পথে কখনও কখনও চাঁদ এসে পড়ে সূর্য এবং পৃথিবীর মাঝখানে। তখন তারা থেকে আলোর বিচ্ছুরণ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সূর্যের গ্রহণ ঘটে। সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের সঙ্গে অনাগত বাচ্চার ওপর প্রভাবের কোনো ধরনের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে সূর্যগ্রহণ দেখার ক্ষেত্রে চোখের সুরক্ষার জন্য বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করার উপদেশ দেওয়া হয়ে থাকে।
সন্তানের লিঙ্গভেদে সৌন্দর্যের তারতম্য
বাংলাদেশে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর আরেকটি গর্ভকালীন অবস্থায় নারীদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি বা কমে যাওয়া। মায়ের সব সৌন্দর্য নিয়ে মেয়ে সন্তানের জন্ম হয় বলে গর্ভাবস্থায় মায়েদের চেহারা খারাপ হয়ে যায় বলে একটি ধারণা প্রচলিত। তবে একই ধারণার ভিন্ন মতও শোনা যায় কোথাও কোথাও। বলা হয়, ছেলে সন্তান গর্ভে থাকার সময় মায়ের সৌন্দর্য কমে যায়।
তবে ব্রিটিশ-আমেরিকান প্রকাশনা সংস্থা ব্রিটানিকার তথ্যমতে, গর্ভকালীন সময়ে সকাল বেলার অসুস্থতা, হরমোনের মাত্রা পরিবর্তন এবং পেট বড় হওয়ার মতো বিষয়গুলো অনেক গর্ভবতী নারীকে ক্লান্ত করে তোলে। বিশেষ করে প্রথম তিন মাসে তাদের মুখে ব্রণও দেখা যায়। স্বাভাবিকভাবেই গর্ভে ছেলে থাকুক কিংবা মেয়ে, এসবের মাঝে গর্ভবতী নারীকে সুন্দর দেখাবে এমনটা প্রত্যাশা করা যায় না।
এছাড়াও পেট দেখেও অনেকে সন্তানের লিঙ্গ কী হবে তা ভেবে থাকেন। তেমনি একটি ভুল ধারণা হলো, অনাগত সন্তান ছেলে হলে পেটের উপরের দিকে উঠে আসবে আর মেয়ে সন্তান হলে তলপেটের দিকে ঝুলে যাবে।
পেটিকোট বা সালোয়ার শক্ত করে বাঁধলে বাচ্চা ওপরের দিকে উঠে যাবে না বলেও ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তবে এই ধারণারও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
খাবারে সন্তানের গায়ের রঙ নির্ধারণ
একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে, গর্ভাবস্থায় অনাগত সন্তানের বিকাশের দিক চিন্তা করে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ করা উচিত। তবে গর্ভে থাকা অবস্থায় কী ধরনের খাবার খাওয়া হচ্ছে তার ওপর সন্তানের গায়ের রঙ নির্ধারিত হবে বলে ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে।
গর্ভাবস্থায় অনাগত সন্তানের মা দুধ, দই কিংবা ডাবের পানির মতো খাবার খেলে সন্তানের গায়ের রঙ ফর্সা হয়- এমন ভুল ধারণা অনেক জায়গায় প্রচলিত। অন্যদিকে কফির মতো খাবারে পেটে থাকা সন্তান কালো হবার মতো ধারণাও আছে অনেকের। তবে এই ধরনের ধারণার কোনো ভিত্তি নেই বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. ডালিয়া রহমান ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “দুধ-দইয়ে খাদ্য উপাদান প্রোটিন থাকে, যা শরীর গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এর সঙ্গে ফর্সা হবার সঙ্গে কোনো সংযোগ নেই।”
খাবারে গর্ভপাতের শঙ্কা
পেঁপে-আনারসের মতো কিছু কিছু খাবারে গর্ভপাতের শঙ্কা থাকে বলে ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তবে এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলে জানান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারস্পেশালাইজড হাসপাতালের গাইনী বিভাগের ড. রেহেনা আক্তার।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আনারস-পেঁপেতে এমন কোনো উপাদান নেই যা গর্ভপাতের কারণ হতে পারে।”
এছাড়া, লইট্টা মাছ খেলে বাচ্চার নাক দিয়ে কফ বেরোবে, গরুর নলাজাতীয় খাবার খেলে বাচ্চার কান দিয়ে পুঁজ বের হবে, ট্যাংরা মাছ খেলে বাচ্চার পেট বড় হবে,কলমি শাক বা পুঁইশাক খেলে বাচ্চার এলার্জি বাড়বে, মৃগেল মাছ খেলে সন্তানের মৃগী রোগ হয়; এমন কিছু ধারণাও প্রচলিত রয়েছে। তবে এগুলোরও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ব্যক্তিবিশেষে নির্দিষ্ট খাবারে সংবেদনশীল না হলে গর্ভাবস্থায় আলাদাভাবে এর কোনো প্রভাব পড়ার কারণ নেই।
বাড়িতে কুকুর-বেড়াল রাখা উচিত না
গর্ভাবস্থায় ঘরে কুকুর বেড়াল পোষা উচিত না বলে এক ধরনের ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। এতে করে পেটে থাকা সন্তানের ওপর প্রভাব পড়ে বলে মনে করেন অনেকেই। তবে এটিরও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তবে অনেকের পোষা প্রাণীর পশমে এলার্জি থাকে। আর মায়ের এলার্জি হলে বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে। সেক্ষেত্রে এমন কোনো সমস্যা থাকলে কুকুর-বেড়ালের থেকে দূরত্ব রাখার পরামর্শ ডা. ডালিয়া রহমানের।
এছাড়া অনেকেই পেটের সন্তান যেন সুন্দর হয় তাই ঘরের দেয়ালে ছোট শিশুদের সুন্দর ছবি টাঙিয়ে রাখেন। তেমনি অনেকেই এই সময় সাপ এড়িয়ে চলেন।
বলা হয়ে থাকে কুৎসিত কোনো প্রাণীর চেহারা দেখলে সন্তানের ওপর তার প্রভাব পড়বে। তবে আজ পর্যন্ত এই বক্তব্যের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। আর তাছাড়া শিশু মাত্রই তো সুন্দর।
সহবাস করা যাবে না
সন্তান পেটে থাকা অবস্থায় সহবাস করা যাবে না বলেও এক ধরনের ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। তবে গর্ভাবস্থার নির্দিষ্ট কিছু সময়ে বিশেষ সতর্কতা মেনে চললে সহবাসে কোনো সমস্যা নেই বলে জানান ড. রেহেনা আক্তার।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “প্রথম তিন মাস আর শেষ দুই মাস কিছুটা বিধিনিষেধ দেই। বিশেষ করে জটিলতা থাকলে এটা বলা হয়। তবে এসময় বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে সহবাস করা যায়। এছাড়া অন্য সময়ে কোন সমস্যা নেই”। এছাড়া গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক কাজ ও হালকা শরীরচর্চাও করা যেতে পারে বলে জানান তিনি।
অন্যান্য
গর্ভাবস্থায় চুল কাটলে পেটের সন্তান জন্মানোর পর চোখে কম দেখে এমন ধারণাও প্রচলিত রয়েছে। তবে এটিও ভুল।
এছাড়াও পেটের আকার দেখে ছেলে হবে না মেয়ে- এমনটিও ধারণা করেন অনেকে। তাদের মতে, পেটের আকার গোল হলে মেয়ে সন্তান হয় আর লম্বাটে হলে হয় ছেলে সন্তান।
গবেষণার জন্য বিখ্যাত জন হপকিন্স অল চিলড্রেন হাসপাতালের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, পেশীর টোন, জরায়ুর টোন, ওজন আর শিশুর অবস্থানের ওপরে পেটের আকার নির্ধারিত হয়। এর সঙ্গে লিঙ্গের কোনো সম্পর্ক নেই। আবার পেটের সন্তান ছেলে হলে বেশি নড়াচড়া করে আর মেয়ে হলে তুলনামূলক কম নড়ে- এমন ভুল ধারণাও প্রচলিত।
আরও একটি ভুল ধারণা হলো সন্তান আগমনের খবর লুকিয়ে রাখা। অন্তত প্রথম তিন মাস পরিবার বাদে কাউকে এই খবর জানাতে বারণ করেন অনেকে।বাইরের লোক জানলে অনাগত সন্তানের নজর লাগতে পারে, এমন বিশ্বাষ থেকেই খবর চেপে রাখেন অনেকে।
এছাড়া গর্ভাবস্থায় হাতে মেহেদী লাগালে সন্তানের শ্বেত রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, আগে থেকেই জামা কিংবা উপহার কিনে রাখলে অনাগত সন্তানের ক্ষতি হয় বলেও ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তবে এসব ধারণার কোনোটিরই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি।



