Friday, May 31, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কোনো ভবন নিরাপদ কি-না, বুঝবেন যা দেখে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা শহরের অর্ধেকের বেশি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৪, ০৩:২৪ পিএম

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই বড় বড় ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ঘটে অসংখ্য প্রাণহানিও। সর্বশেষ গত ২৯ ফেব্রুয়ারি বেইলি রোডের গ্রিন কজি কটেজ নামের একটি বাণিজ্যিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এর আগে, গত বছরও ঢাকায় একাধিক বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বঙ্গবাজার মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডে প্রায় পাঁচ হাজার দোকান পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এর কয়েক দিন পর আগুন লাগে নিউমার্কেটে। এই ঘটনার কিছুদিন আগে পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বছরের শেষ দিকে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সারাদেশে মোট ২৭,৬২৪টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে দেশে ৭৭টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে এবং তাতে কয়েকশত মানুষ আহত ও নিহত হয়েছেন।

এ তো গেল, শুধু গত বছরের কথা। এর আগে গত কয়েক বছরে বনানীর এফআর টাওয়ার, মগবাজারে একটি ভবনে বিস্ফোরণ, নিমতলী ও চুড়িহাট্টা ট্রাজেডি কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য প্রাণ। ঢাকার বাইরেও ঘটেছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা।

কোনো আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনে আগুন লাগার পর সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আলোচনায় আসে, তা হলো- আগুন নেভানোর জন্য সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না।

বেইলি রোডের গ্রিন কজি কটেজ ভবনে আগুন লাগার পরও এই প্রশ্ন সামনে এসেছে। ফায়ার সার্ভিস থেকে বলা হয়েছে, ভবনটিতে আগুন নেভানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা শহরের অর্ধেকের বেশি ভবন বিভিন্ন কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এবং আগুন নেভানোর জন্য সেসব ভবনে কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই।

তাই এসব ভবনে খাওয়া-দাওয়া বা ঘোরাঘুরির জন্য নিজে বা প্রিয়জনকে নিয়ে যাওয়ার আগে সতর্ক থাকা জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে বুঝবেন যে ভবনটি নিরাপদ কি-না?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু বিষয় দেখে সাধারণ মানুষে যেকোনো ভবনের নিরাপত্তার বিষয়টি সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন। চলুন, জেনে নেওয়া যাক সে সম্পর্কে-

প্রকাশ্যে ‘সার্টিফিকেট’ প্রদর্শন

ভবনটি কতটা নিরাপদ তা বোঝার জন্য সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে সহজ হলো, ভবনের সামনে নিরাপত্তা সনদ বা সার্টিফিকেট প্রদর্শন করা আছে কি-না, তা দেখে ঐ ভবনে প্রবেশ করা। ওই সার্টিফিকেট বা সনদ সর্বশেষ অনুমোদন কত তারিখ হয়েছে এবং পরবর্তী অনুমোদন কত তারিখের মাঝে নিতে হবে, তাও দেখে নিতে হবে।

প্রবেশদ্বারের প্রশস্ততা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো জনাকীর্ণ ভবনের প্রবেশদ্বার যদি তিন মিটারের কম হয়, তাহলে সেখানে প্রবেশ করার আগে ভাবা উচিত। জনাকীর্ণ স্থানসমূহের মধ্যে রয়েছে-রেস্টুরেন্ট, মসজিদ, গীর্জা, হাসপাতাল, এমনকি স্কুলও। এই ধরনের স্থানে একসঙ্গে অনেক মানুষ প্রবেশ করে এবং বের হয়। এছাড়া, বাণিজ্যিক ভবনে বিভিন্ন অফিস থাকায় সেসব স্থানও সবসময় লোকে লোকারণ্য থাকে। তাই, এসব ভবনের প্রবেশ দ্বার তিন মিটারের বেশি প্রশস্ত থাকা বাঞ্চনীয়।

পর্যাপ্ত সিঁড়ি ও অ্যালার্ম সিস্টেম

বিশষজ্ঞদের মতে, আগুন লাগার পর একটা মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য ভবনে মূলত দুইটা জিনিস থাকা দরকার। পর্যাপ্ত সিঁড়ি এবং অ্যালার্ম সিস্টেম।

কোনো আবাসিক ভবন যদি ছয় তলার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী সেখানে চলাচলের জন্য দু’টি সিঁড়ি থাকতে হবে। তবে যেগুলো বাণিজ্যিক ভবন বা কারখানা, সেখানে সিঁড়ি সংখ্যা আরও বেশি হবে।

এছাড়া, আগুন লাগার পর ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার উপায় হলো ভবনে ফায়ার এবং স্মোক অ্যালার্ম সিস্টেম বসানো। কারণ অ্যালার্ম সিস্টেম যদি কার্যকর থাকে, তাহলে কোথাও আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে (ধোঁয়া হলেই) এটি তা চিহ্নিত করতে পারে এবং বিকট শব্দ করে। তখন পুরো ভবনের প্রত্যেক তলার বাসিন্দারাই আগুন সম্পর্কে জানতে পারে এবং দ্রুত ভবন খালি করে নিচে নেমে আসতে পারে। এতে প্রাণহানি অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়।

তাই কোনো শপিংমল, হাসপাতাল বা রেস্টুরেন্টে পর্যাপ্ত সিঁড়ি এবং ফায়ার অ্যালার্ম না থাকলে সেখানে যাওয়াটা কিছুটা ঝঁকিপূর্ণই বলা যায়।

জরুরি বহির্গমন পথ

একটি আদর্শ ভবনে দুই ধরনের সিঁড়ি থাকে। একটি দিয়ে সবসময় চলাচল করা হয়। অন্যটি দিয়ে জরুরি অবস্থায় আত্মরক্ষার জন্য বের হওয়া যায়। সেজন্য একে বলা হয় জরুরি বহির্গমন পথ। আগুন লাগলে একে অগ্নি নির্গমন পথও বলা হয়।

জরুরি বহির্গমনের সিঁড়ির নির্মাণশৈলী সাধারণ সিঁড়ির চাইতে আলাদা হয় এবং এর অবস্থানও সাধারণ সিঁড়ির সঙ্গে না হয়ে ভিন্ন জায়গায় হয়। এই বিশেষায়িত সিঁড়ি বা জরুরি বহির্গমন পথ এমন স্থানে করা হয়, যেন ভবনে আগুন লাগলে সেখানে কোনো আগুন এবং ধোঁয়া প্রবেশ করতে না পারে। এছাড়া ভবনের যে অংশে এই সিঁড়ি থাকে, সেই অংশের দেয়ালের গঠনও অনেকটা ভিন্ন হয়।

বিশেষজ্ঞরা জানান, আবাসিক ভবন ছাড়া অন্য যেকোনো ভবনের প্রত্যেক তলায় অগ্নি নির্গমন পথ থাকতে হবে। ভবনটি কাঁচঘেরা আবদ্ধ জায়গায় হলেও তার কোনো না কোনো ধরনের উন্মুক্ত ব্যবস্থাপনা (জরুরি বহির্গমন পথ) থাকতে হবে। ভবনে এই ব্যবস্থাপনা না থাকলে সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে নিষেধ করছেন তারা।

অগ্নি চলাকালে ‘এক্সিট সাইন’

ধরা যাক, কোনো ভবনে আগুন লেগেছে এবং সেই ভবনে পর্যাপ্ত সিঁড়ি এবং আলাদা অগ্নি নির্গমন পথও রয়েছে। কিন্তু সব থাকার পরও আগুনের মাঝে পড়লে সাধারণত মানুষ দিশেহারা হয়ে যায়। তাড়াহুড়োর কারণে ঘটনাস্থল থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পায় না। সেজন্য ভবনে আগুন লাগলে (বিদ্যুৎ থাকুক বা না থাকুক) জরুরি বহির্গমনের দিকে যাওয়ার পথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলো জ্বলে ওঠার ব্যবস্থা থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

ফায়ার এক্সটিংগুইশার বা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র

আগুন নেভানো বা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যে যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, সেটিকে ফায়ার এক্সটিংগুইশার বা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বলা হয়। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলোতে উচ্চচাপে রক্ষিত তরল কার্বন ডাই-অক্সাইড থাকে। আগুন লাগলে এই যন্ত্র থেকে স্প্রে আকারে কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে আগুন নেভানো হয়। একটি নিরাপদ ভবনে অন্যান্য অনুষঙ্গের সাথে বাধ্যতামূলকভাবে অগ্নি নির্বাপন সিলিণ্ডার বা ফায়ার এক্সটিংগুইশার থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। কারণ কোনো একটি ভবনে আগুন লাগার পর সেটি ছড়িয়ে পড়তে কিছুটা হলেও সময় লাগে। আগুন লাগার পর প্রথম দুই মিনিটকে বলা হয় প্লাটিনাম আওয়ার বা সবচেয়ে মূল্যবান সময়। এই সময়ে মাথা ঠান্ডা রেখে ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যবহার করলে অনেকক্ষেত্রেই আগুন নিভিয়ে ফেলা যায় এবং আগুনকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

তাই, কোনো ভবনে প্রবেশের আগে সেই ভবনে ফায়ার এক্সটিংগুইশার বা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র আছে কি-না এবং থাকলে সেটি আদৌ কাজ করছে না, সেটি দেখে নিতে হবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

About

Popular Links