Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মিথ বনাম বাস্তবতা: পুরুষ মানেই কি নিপীড়ক?

পুরুষ শব্দের আড়ালে থাকা চেতনাশ্রয়ী মানবসত্ত্বাকে খুঁজতে ও বুঝতে গিয়ে সম্মুখীন হতে হয় অনেক প্রশ্নের

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:০৩ পিএম

আমাদের সমাজে নারী ও পুরুষদের নিয়ে যেসব মিথ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো- পুরুষরা সবসময়ই নিপীড়ক। কিন্তু, এর কতটা সত্য? চলুন, জেনে নেওয়া যাক সে সম্পর্কে-

মিথ: পুরুষরা সবসময়ই নিপীড়ক

সারসংক্ষেপ: সচরাচর চিত্রিত বিকৃত পুরুষপ্রকৃতি বা ম্যাসকুলিনিটি আর কিছুই না, বরং পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সোশ্যাল স্কুলিং এর ফল। যা পুরুষের প্রকৃতি স্বরূপকে তুলে ধরে না।

বাস্তবতা: যুগ যুগ ধরে পুরুষতান্ত্রিকতার একচ্ছত্র ক্ষমতা সমাজে পুরুষকে দিয়েছে আধিপত্যের আচারসর্বস্বতা। লিঙ্গের বিচারে নারীর বিপরীতে পুরুষকে অধিপতি প্রতিষ্ঠিত করে সৃষ্টি হয়েছে লিঙ্গ-দ্বন্দ্ব। আবার, নারীর ওপর আধিপত্যের এই মানসিকতাই ধারণ করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিখে এসেছে “পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতা হি পরমন্তপ”। ইতিহাস, কল্পকাহিনী কিংবা বাস্তবতায় — পুরুষের যেমন দেখা মিলেছে রক্ষাকর্তা, দায়িত্বশীল ও বীরবিক্রম বিচক্ষণ জীবসত্ত্বা হিসেবে, তেমনি নারীর কর্তা ও নির্যাতক হিসেবেও পুরুষের আগ্রাসনকে অতিপরিচিতি দান করা হয়েছে। এভাবে যখন ক্ষমতা ও আগ্রাসনের পুরুষীকরণ প্রত্যক্ষ করে করেই এক একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠে, তখন তাদের চিন্তা-চেতনায় পুরুষের আগ্রাসী আচরণকেই “ম্যাসকুলিনিটি” বা পৌরুষের পরিচায়ক মনে করা স্বাভাবিক। কিন্তু যেই বিষয়টি আমরা সচরাচর ভুলে যাই, এই পুরুষপ্রকৃতিই কিন্তু বৃহত্তর মানবপ্রকৃতির একটি অংশ, এবং মানবপ্রকৃতি মূলত লিঙ্গভেদে জন্মগতভাবে প্রাপ্ত মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্যসমূহ। কাজেই, বহুল প্রচলিত পুরুষের বিকৃত সংজ্ঞাকে পুরুষপ্রকৃতি মনে করা ভুল। নির্দিষ্টভাবে পুরুষপ্রকৃতি বা নারীপ্রকৃতি বলে কিছু নেই। বরং, পুরুষপ্রকৃতি ও নারীপ্রকৃতির নামে আমরা লিঙ্গভেদে যে আচরণগত পার্থক্য দেখতে পাই তা মূলত সোশ্যাল স্কুলিং বা সামাজিকীকরণের এর ফল।

ভাষাবোধের হীনচর্চায় অর্থবহতা হারাতে বসা একটি শব্দ হলো “পুরুষ”। এই পুরুষ শব্দ ও পুরুষভাবের সুলুক সন্ধান করতে গিয়ে এক ঐতিহাসিক অভিযাত্রার মুখোমুখি বরাবরই পড়তে হয়। পুরুষ শব্দের আড়ালে থাকা চেতনাশ্রয়ী মানবসত্ত্বাকে খুঁজতে ও বুঝতে গিয়ে সম্মুখীন হতে হয় অনেক প্রশ্নের। এটি কি কেবলই একটি শব্দ, যাকে লিঙ্গপরিচয় ও কিছু মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়? নাকি কোনো ঐতিহাসিক তত্ত্ব, যা সমাজ, দেশ, কালের উপর ভিত্তি করে পাল্টাতে থাকে। এটি ভালো নাকি খারাপ — এসবের নির্ধারকই বা কে। এভাবেই কালে কালে পুরুষের সত্ত্বা উদঘাটন করতে গিয়ে তা বরং নির্মাণ করা হয়েছে বহুবার।

তবে কি পুরুষরা সেই রোমান আইনে প্যাট্রিয়া প্রটেস্টাসের মতো স্বৈরাচারী ক্ষমতার অনুরূপ কিছু? প্রচলিত জ্ঞানে যা অসীম শক্তিময়, আধিপত্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী; যে হিংস্র, নির্ভীক, সদাচঞ্চল এবং বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন একটি জীবসত্ত্বা। সমাজ ও কালের বিবর্তনের সাথে সাথে পুরুষরাও নানা ধরনের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন। এজন্য পুরুষদের প্রকৃতি কেমন হয় তার অনেকাংশই ঐ সময়ের সমাজব্যবস্থার উপর নির্ভর করে। বর্তমান সমাজে আমরা যাকে ‘টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি’ ট্যাগ দিয়ে বিশেষায়িত করি, সেটি বরং আর কিছু নয়, মূলত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষকে সকল শক্তি ও আধিপত্যবাদের দায় দেওয়ারই ফল। তবে একে ‘টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি’ ট্যাগ দিয়ে পুরো পুরুষ সমাজকে অভিযুক্ত করা একটি ভুল প্রচলন। তাহলে প্রকৃতপক্ষে পুরুষপ্রকৃতি কেমন? 

প্রকৃতপক্ষে, পুরুষপ্রকৃতি ও নারীপ্রকৃতি বলে কিছু নেই। স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, আমরা যে মস্তিষ্ক নিয়ে জন্মেছি, তা পুরুষও নয়, স্ত্রীও নয়। বরং এটি স্ত্রীবাচক ও পুরুষবাচক বৈশিষ্ট্যের একটা মিশেল।  পরবর্তীতে আমাদের মস্তিষ্কের প্রকৃত গড়ন পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে হরহামেশাই বদলাতে থাকে। এই পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কিছু লিঙ্গ-পার্থক্য স্থায়ী হয়। যেমন, গড়পড়তায় কিছু পুরুষেরা তুলনামূলকভাবে নারীদের চেয়ে বেশি আগ্রাসী হয়। আগ্রাসনকে তাই ম্যাসকুলিন বা পুরুষবাচক বৈশিষ্ট্য ভাবা হয়। আবার কিছু মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে বেশি মায়াবী ও আবেগপ্রবণ হয়। সুতরাং আবেগপ্রবণতাকে তাই “ফেমিনিন” বা স্ত্রীবাচক বৈশিষ্ট্য বলে ধরে নেওয়া হয়। যদিও পার্থক্যটা খুব সামান্যই। অর্থাৎ, পুরুষের স্বভাবে যেমন আগ্রাসী বৈশিষ্ট্য আছে, তেমনি আছে আবেগপ্রবণতা। একথা সত্য যে, সামাজিক বিভিন্ন নিয়ামকের প্রভাবে এবং সমাজের সাথে অভিযোজন করে চলতে গিয়ে পুরুষদের মধ্যে আগ্রাসী বৈশিষ্ট্য অধিক পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এই আগ্রাসন যেমন কাউকে দায়িত্বশীল, কর্তব্যপনিষ্ঠ, বীরত্বপূর্ণ বানাচ্ছে, তেমনি কিছু পুরুষকে বানাচ্ছে হিংস্র, সহিংস এবং নরপশু। তাহলে প্রভাব কি এখানে তবে পুরুষত্বের নাকি পারিপার্শ্বিকের?

আবার, অনেকেরই ধারণা, টেস্টোস্টেরন হরমোনজনিত (টেস্টোস্টেরন পুরুষের বৈশিষ্ট্যধর্মী প্রধান হরমোন) কারণে পুরুষরা স্বভাবত এমন। এতে পুরুষের এমন আচরণের পেছনে সরাসরি হরমোনকে দায়ী করে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু, ২০০৭ সালে সায়েন্টিফিক আমেরিকান এর একটি জার্নালে উঠে আসে যে, আগ্রাসনের সাথে টেসটোসটেরনের সম্পর্ক অতি দুর্বল এবং এটি গবেষণালব্ধ। এতে প্রমাণিত হয় যে, পুরুষরা হরমোনের না, বরং তাদের নিজ নিজ মস্তিষ্কের প্রভাবে সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এটি পুরুষদের মধ্যে তাদের মনোভাব, চিন্তাভাবনা ও ব্যবহারে ইতিবাচক পরিবর্তন ও সংস্কার আনার সক্ষমতার প্রতিও একটি ইঙ্গিত দেয়। 

তার ওপর আধুনিকতার এই যুগে এসে পুরুষতান্ত্রিকতা থেকে বের হওয়ার পরও দেখা যায় পুরুষদের নেতিবাচক এবং “ত্রুটিপূর্ণ” চিত্রগুলোই বারবার জনপ্রিয় করে তোলা হয়  গণমাধ্যম দ্বারা। অনেক বই, টেলিভিশন শো, চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পুরুষদের ব্যাপকভাবে হিংস্র এবং আক্রমণাত্মক চরিত্রে, যৌন নিপীড়ক, শ্লীলতাহানিকারী, বিকৃতকারী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন, নিজের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণে অক্ষমহিসেবে উপস্থাপিত করা হয়, যদিও বাস্তবে, তাদের কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশই এমন করে থাকে। মিডিয়া কীভাবে সমাজে নারীর ভূমিকাকে প্রভাবিত করে তা বোঝার জন্য প্রচুর কাজ নিবেদিত হলেও, মিডিয়া এবং পুরুষের চিত্রায়নের জন্য খুব সামান্যই কাজ নিবেদিত করা হয়েছে।

সুতরাং, এটি স্পষ্ট যে, আধিপত্যবাদী মানসিকতা থেকে পুরুষের জন্ম হয় না। বরং এই মানসিকতা নির্মিত হয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সর্বব্যাপী হস্তক্ষেপের ফলে। মার্কিন নারীবাদী লেখক বেল হুকস তার একটি বইয়ে লিখেন, “Learning to wear a mask (that word already embedded in the term ‘masculinity’) is the first lesson in patriarchal masculinity that a boy learns. He learns that his core feelings cannot be expressed if they do not conform to the acceptable behaviors sexism defines as male. Asked to give up the true self in order to realize the patriarchal ideal, boys learn self-betrayal early and are rewarded for these acts of soul murder.”

পুরুষতান্ত্রিকতা নির্ধারণ করে দেয় পুরুষত্ব মানেই পুরুষদের হতে হবে কঠোর এবং নিষ্ঠুর, রাগ বাদে তাদের অন্য সমস্ত আবেগকে দমন করতে হবে। তাদের মানসিক অভিব্যক্তির প্রকাশকে করা হয় নিরুৎসাহিত। এসব কঠোর নিয়মকানুনের চাপে তাদের কাছে দুঃখ ও হতাশার মতো সংবেদনশীল অনুভূতিগুলো “স্ট্রেস” হিসেবে অনুভূত হয়। পিতৃতন্ত্র সমাজে কেবল কয়েকজন পুরুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়, এবং কিন্তু ফলস্বরূপ বেশিরভাগ পুরুষের কাছ থেকেই তাদের মানবতার মূল দিকগুলো কেড়ে নেয়।

"ইউথ পলিসি ফোরাম ও অধিকার এখানে, এখনই" প্রকল্পের যৌথ প্রয়াসের মিথবাস্টার সিরিজের এটি তৃতীয় পর্ব। এই প্রকল্প নিয়ে আরও জানতে ভিজিট করুন www.ypfbd.org
এই সিরিজে প্রকাশিত কোনো বক্তব্যের জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x