Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ঈদকার্ডের বিবর্তন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে হারিয়ে গেছে ঈদকার্ড বিতরণের চিরায়িত রীতি

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৫, ১১:২৩ পিএম

১০ থেকে ১৫ বছর আগেও ঈদের আনন্দ মানেই ছিল নতুন জামা আর হাতে বানানো ঈদকার্ড। নিজের হাতে বানানো ঈদকার্ডে শুভেচ্ছা বার্তা লিখে বন্ধুদের “ঈদ মোবারক” জানানোর অনুভূতির সঙ্গে ডিজিটাল ম্যাসেজের কোনো তুলনা হয় না। বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে হারিয়ে গেছে ঈদকার্ড বিতরণের চিরায়িত রীতি।

আমার মনে আছে, ঈদের তিন থেকে চার দিন আগে থেকেই বানানো শুরু করতাম ঈদকার্ড। কখনও জল রঙ, কখনও ক্রেয়ন আবার কখনও চকচকে কাগজ কেটে এই ঈদকার্ডগুলো বানাতাম। চেষ্টা থাকতো বন্ধুদের থেকেও সুন্দর কার্ড বানানোর। ঈদের দিন সকালে বন্ধুদের মধ্যে আদান-প্রদান হতো এসব কার্ড। যা ঈদের আনন্দকে দ্বিগুণ করে দিতো।

কয়েক বছর পর এসব ঈদকার্ড বিক্রি শুরু হয় বিভিন্ন দোকানে। এই দোকানগুলো শহর থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা এমনকি গ্রামেও পাওয়া যাতো। অনেক ছেলে-মেয়ে নিজেই ঈদকার্ড বানিয়ে দোকান বসিয়ে বিক্রি করতো। রাত জেগে ঈদকার্ড তৈরির পর বিকেলে সেসব কার্ড বিক্রি করে অর্থ হাতে পাওয়ার পর ঈদের আনন্দ যেন দ্বিগুণ বেড়ে যেত।

এরপর আসে প্রেসে ছাপানো ঈদকার্ড। এসব ঈদকার্ডের মধ্যে শুভেচ্ছাবার্তার সঙ্গে বড় করে লেখা থাকতো “ঈদ মোবারক”। এছাড়াও থাকতো প্রাকৃতিক দৃশ্য, পাখি, মসজিদের গম্বুজ, মক্কা শরীফের ছবি ইত্যাদি। কার্ডের মধ্যে গম্বুজওয়ালা মসজিদের ওপরে থাকতো ঈদের স্মারক চাঁদ আর তারা আঁকা। অথবা এক তোড়া লাল গোলাপের মাঝখানে লেখা “ঈদ মোবারক”।

ঈদকে সামনে রেখে শহর থেকে গ্রাম সবখানেই ছিল এসব ঈদকার্ডের রমরমা ব্যবসা।

এরপর ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় হাতে বানানো ঈদ কার্ডের প্রচলন। এখন আর আগের মতো স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়েরা দল বেঁধে বন্ধু আর আত্মীয়স্বজনের জন্য ঈদকার্ড কিনতে আসে না।

তবে বর্তমানে ব্যক্তিপর্যায়ে ঈদকার্ডের আদান-প্রদানের প্রবণতা কমে গেলেও বেড়েছে গোষ্ঠীভিত্তিক ঈদকার্ডের প্রচলন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠন এখন শুভেচ্ছা জানাতে ব্যবহার করছে ঈদকার্ড।

এরপর ঈদের শুভেচ্ছাবার্তায় আসে প্রযুক্তির ছোঁয়া। ঈদ কার্ডের জায়গা দখল করে নেয় “এসএমএস” ও “এমএমএস”। চেষ্টা থাকতো যতো সুন্দর পারা যায় শুভেচ্ছাবার্তা লেখার। বাটন মোবাইল ফোনে টাইপ করে লিখতাম এসব শুভেচ্ছাবার্তা। এরপর একে একে পাঠিয়ে দিতাম বন্ধুদের মোবাইল নম্বরে। বন্ধুদের নম্বর থেকেও আসতো ভিন্ন ভিন্ন শুভেচ্ছাবার্তা। সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে শুভেচ্ছাবার্তার এসএমএস লেখার মধ্যে যে আনন্দ ছিল, তা এখন অন্য কোনোকিছুতে পাওয়া যায় না।

কষ্ট করে এসএমএস লেখার এই প্রবণতাও পরবর্তীতে কমে যায় বহুলাংশে। চলে আসে স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। অধিকাংশ মানুষ এখন ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইমেইল, ই-কার্ড, এক্স (সাবেক টুইটার), টিকটক ও হোয়াটসঅ্যাপে শুভেচ্ছা জানিয়েই দায় সারছেন। হাত দিয়ে কষ্ট করে বানানো কার্ডের জায়গায় শুভেচ্ছা জানানোর বিকল্প মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

বর্তমানে ঈদকার্ডের জন্য গড়ে উঠেছে শতাধিক অনলাইনভিত্তিক কার্ড প্রস্তুতকারী ওয়েবসাইট। এসব ওয়েবসাইটে গেলেই দেখা যায় হাজার হাজার ঈদ কার্ডের নমুনা। এসব নমুনা থেকে পছন্দমতো কার্ড বাছাই করে তাতে নিজের মতো নকশা যুক্ত করে তৈরি করা যায় ঈদকার্ড। এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস বা শুভেচ্ছাবার্তার ম্যাসেজ পাঠানোর জন্যও রয়েছে আলাদা আলাদা ওয়েবসাইট। এসব ওয়েবসাইট থেকে পছন্দমতো বার্তা কপি করে সহজেই পাঠানো যায় বন্ধুদের।

দোকানিরা জানিয়েছেন, আগে রমজান মাসে শুরু থেকে ঈদকার্ড বিক্রি করে কুলোনো যেতো না। প্রতিটি দোকানে প্রতিদিন এক থেকে পাঁচ লাখ টাকার ঈদকার্ড বিক্রি হতো। এই সময়টার জন্য অপেক্ষায় থাকতো সবাই। এখন হাতে গোনা কিছু প্রতিষ্ঠান অল্প কিছু কার্ডের অর্ডার দেয়। সেগুলো ছাড়া আর খুচরা বিক্রির জন্য কার্ড ছাপানো হয় না।

   

About

Popular Links

x