হঠাৎ অনবরত চোখ পিটপিট করা, কাঁধ ঝাঁকানো কিংবা ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও গলা পরিষ্কার করার মতো শব্দ করা - অন্যদের কাছে এসব আচরণ অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু যার হয়, তার কাছে এগুলো অনিচ্ছাকৃত ও অস্বস্তিকর হতে পারে। এমন অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া বা শব্দ করাকে ‘টিক’ বলা হয়। আর মোটর ও ভোকাল - দুই ধরনের টিক দীর্ঘ সময় ধরে থাকলে সেটি ট্যুরেট সিন্ড্রোমের লক্ষণ হতে পারে।
‘ট্যুরেট সিন্ড্রোম’ কী
ট্যুরেট সিন্ড্রোম একধরনের স্নায়ুতান্ত্রিক সমস্যা। এর নামকরণ করা হয়েছে ফরাসি নিউরোলজিস্ট জিল দ্য লা ট্যুরেটের নামানুসারে। এটি একধরনের টিক ডিজঅর্ডার। টিক হলো হঠাৎ ও বারবার হওয়া এমন নড়াচড়া বা শব্দ, যা ব্যক্তি সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। কিছু মানুষ কিছু সময়ের জন্য টিক চেপে রাখতে পারলেও এতে অস্বস্তি বাড়তে পারে।
টিক দুই ধরনের -
- মোটর টিক: শরীরের নড়াচড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন - চোখ পিটপিট করা, কাঁধ ঝাঁকানো, মাথা ঝাঁকানো।
ভোকাল টিক: মুখ বা গলা থেকে অনিচ্ছাকৃত শব্দ বের হওয়া। যেমন - গলা পরিষ্কার করা, কাশি, গোঁ গোঁ বা অন্য কোনো শব্দ করা।
লক্ষণসমূহ
ট্যুরেট সিন্ড্রোমের প্রধান লক্ষণ হলো মোটর ও ভোকাল টিক। এগুলো সময়ের সঙ্গে ধরন, মাত্রা ও ঘনত্বে পরিবর্তিত হতে পারে। মানসিক চাপ, উদ্বেগ, উত্তেজনা বা ক্লান্তির সময় টিক আরও বেড়ে যেতে পারে।
মোটর টিকের মধ্যে থাকতে পারে -
চোখ পিটপিট করা
মুখ বা চোখের নড়াচড়া
কাঁধ ঝাঁকানো
মাথা ঝাঁকানো
শরীর ঝাঁকানো বা টান দেওয়া
লাফানো
ভোকাল টিকের মধ্যে থাকতে পারে -
গলা পরিষ্কার করা
কাশি বা গোঁ গোঁ শব্দ করা
গুনগুন করা
কোনো শব্দ বা বাক্য বারবার বলা
অন্যের বলা কথা পুনরাবৃত্তি করা
অশালীন শব্দ উচ্চারণও ভোকাল টিকের অংশ হতে পারে। তবে এটি তুলনামূলকভাবে বিরল। তাই ট্যুরেট সিন্ড্রোম থাকলেই এমন শব্দ উচ্চারণ করতে হবে - এমন নয়।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়
মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) এবং মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, ট্যুরেট সিন্ড্রোম শনাক্ত করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো পরীক্ষা নেই। চিকিৎসকেরা মূলত রোগীর লক্ষণ, কখন শুরু হয়েছে এবং কত দিন ধরে রয়েছে - এসব বিবেচনা করে রোগ নির্ণয় করেন।
ট্যুরেট সিন্ড্রোম নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মোটর ও ভোকাল - দুই ধরনের টিক থাকতে হয়। টিকগুলো এক বছরের বেশি সময় ধরে থাকতে হবে এবং ১৮ বছর বয়সের আগে শুরু হতে হবে। একই সঙ্গে অন্য কোনো রোগ, ওষুধ বা পদার্থের কারণে টিক হচ্ছে কি না, সেটিও চিকিৎসকেরা বিবেচনা করেন।
মূল কারণ ও ঝুঁকি
জিনগত প্রভাব: ট্যুরেট সিন্ড্রোমের সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে বংশগত বা জিনগত প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবারে ট্যুরেট সিন্ড্রোম বা অন্য কোনো টিক ডিজঅর্ডার থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
মস্তিষ্কের রাসায়নিকের ভূমিকা: মস্তিষ্কে স্নায়ুর মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে ব্যবহৃত ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটার ট্যুরেট সিন্ড্রোমের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে এর সঠিক প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
বয়স ও লিঙ্গ: লক্ষণ সাধারণত শৈশবে শুরু হয়। মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, টিক সাধারণত ২ থেকে ১৫ বছর বয়সের মধ্যে দেখা দেয় এবং গড় বয়স প্রায় ৬ বছর। NHS-এর তথ্য অনুযায়ী, লক্ষণ প্রায় ৬ বছর বয়সে শুরু হয়ে ১০ বছর বয়সের দিকে বেশি স্পষ্ট হতে পারে। মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মধ্যে ট্যুরেট সিন্ড্রোম প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি দেখা যায়।
মানসিক চাপ ও ক্লান্তি: অতিরিক্ত মানসিক চাপ, উদ্বেগ, উত্তেজনা বা ক্লান্তির সময় টিকের তীব্রতা বাড়তে পারে। তবে এগুলো ট্যুরেট সিন্ড্রোমের সরাসরি কারণ নয়।
নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা পদ্ধতি
ট্যুরেট সিন্ড্রোম পুরোপুরি নিরাময়ের নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে টিক যদি দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা, কর্মজীবন বা সামাজিক জীবনে সমস্যা তৈরি করে, তাহলে চিকিৎসার মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সিবিআইটি (CBIT) থেরাপি: ‘কম্প্রিহেনসিভ বিহেভিয়ারাল ইন্টারভেনশন ফর টিকস’ বা CBIT হলো টিক নিয়ন্ত্রণের একটি আচরণগত থেরাপি। এতে রোগীকে টিক সম্পর্কে সচেতন হতে এবং টিকের তাগিদ অনুভব করলে তার পরিবর্তে অন্য একটি প্রতিযোগী আচরণ করতে শেখানো হয়।
ওষুধ: টিক গুরুতর হলে বা দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা তৈরি করলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ দেওয়া হতে পারে। কিছু ওষুধ মস্তিষ্কের ডোপামিনের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে টিক নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। তবে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এগুলো ব্যবহার করা উচিত নয়।
ডিপ ব্রেইন স্টিমুলেশন (DBS): সাধারণ চিকিৎসা বা আচরণগত থেরাপিতে সাড়া না দেওয়া গুরুতর ক্ষেত্রে নির্বাচিত কিছু রোগীর জন্য DBS বিবেচনা করা হতে পারে। এতে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে ইলেকট্রোড বসিয়ে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দেওয়া হয়। তবে ট্যুরেট সিন্ড্রোমে এই চিকিৎসার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
সামাজিক সচেতনতা এবং পরিবার ও চারপাশের মানুষের সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি ট্যুরেট সিন্ড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনিচ্ছাকৃত টিককে ইচ্ছাকৃত আচরণ হিসেবে না দেখে বিষয়টি সম্পর্কে বোঝাপড়া তৈরি করা প্রয়োজন।



